Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকাসহ বেশকিছু জেলা-উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কোনো কোনো এলাকায় কার্যালয় খুলতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখেও পড়েছেন তারা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেড় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাজনীতিতে কোণঠাসা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলটি।

 

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, সার্বিকভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে থাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে।

 

মামলার চাপ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দেশে অবস্থানকারী নেতাকর্মীরা ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামার সুযোগ না পেলেও ঝটিকা কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু নেতারা দেশে না থাকায় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। বিচ্ছিন্নভাবে যেসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারে নির্দেশনা আসছে কোথা থেকে তা নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ কীভাবে কী করতে চাইছে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও।

 

যদিও এমনটি মানতে নারাজ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। ভারতে আত্মগোপনে থাকা এই নেতা এশিয়া পোস্টকে বলেন, আওয়ামী লীগ কোন পথে যাচ্ছে, তা নেতারা জানেন না—এ কথা সঠিক নয়। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন।

 
 

 

আস্থার সংকটে বিভ্রান্ত তৃণমূল
৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত দেড় বছরে বিভিন্ন ইস্যুতে তার কয়েকটি অডিও বক্তব্য শোনা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কোনো দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলে এখনও শোনা যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গণে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, শেখ হাসিনা বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

 

আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার এমন নির্দেশনা বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করলেও কোথায় কবে কীভাবে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি কেউ।

 

একইভাবে দলীয় কার্যালয় খোলার নির্দেশনার কথা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে এসেছে বলা হলেও কবে কখন এবং কী কারণে তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছেন, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও দলটির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সেখানেই তিনি কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা কোন পরিকল্পনা থেকে এ নির্দেশ দিয়েছেন জানতে চাইলে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘এখানে নির্দেশনা বা সমঝোতার কিছু নেই। কর্মী-সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ইউনূসের অবৈধ সরকারের বিদায়ের পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবার জন্য উন্মুক্ত হবে এটা আশা করে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছে বা যেতে চাইছে।’

 

মাঠপর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারলেও সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা নিয়ে তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। দল কী কৌশলে এগোবে—আন্দোলনে যাবে নাকি সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জোর দেবে সে বিষয়েও সুস্পষ্ট বার্তা নেই। তাই মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বিভ্রান্ত।

 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাজনীতির ময়দানে দিকনির্দেশনা ও আস্থা—এই দুটি উপাদানই একটি দলের মূল শক্তি। এই দুইয়ের ঘাটতি দেখা দিলে সংগঠন দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। দেশে আত্মগোপনে থাকা এসব নেতারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র থেকে তারা সুস্পষ্ট রোডম্যাপ চান। সুসংহত রাজনৈতিক কৌশল ঘোষণা করে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং নিয়মিত মাঠভিত্তিক কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারেও গুরুত্বরোপ করেন তারা।

 

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত না এলে বিভ্রান্তি বাড়বে। তবে সময়মতো সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া গেলে সংগঠন আবার চাঙা হতে পারে।

 

অনেক চ্যালেঞ্জ, জটিল সমীকরণ
নেতাকর্মীদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক ঐক্য ফিরিয়ে আনা। দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ভর করছে নেতৃত্ব কত দ্রুত সুস্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে তার ওপর।

 

এজন্য শুরুতেই দল পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্ব সামনে নিয়ে আসার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন বেশির ভাগ নেতা। তাদের মতে, সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় দলের অভ্যন্তরে এখন নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। ভবিষ্যতে কমিটি পুনর্গঠন হলে কারা নেতৃত্বে আসবেন, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। পুরোনো অনেক নেতা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। একইভাবে তৃণমূলে সক্রিয় নেতাকর্মীরা নতুন সমীকরণে মূল্যায়িত হবেন, নাকি উপেক্ষিত হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যেও বিভ্রান্তি রয়েছে। সব মিলিয়ে সাংগঠনিক গতি শ্লথ হচ্ছে।

 

এদিকে আওয়ামী লীগের অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। সদস্য সংগ্রহ অভিযান ও সম্মেলন কার্যত বন্ধ। দ্রুত নতুন নেতৃত্ব আনা না হলে স্থবিরতা আরও বাড়বে।

 

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরতে আগ্রহী নন অনেকে
৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে যাওয়া নেতাদের মধ্যে অনেকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া দেশে ফিরতে আগ্রহী নন। দলের সভানেত্রী দেশে ফিরতে বলেছেন—এমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর তারা নানাভাবে নিজেদের অনাগ্রহের জানান দিয়েছেন।

 

দলটির কয়েকজন জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সহনশীল পরিস্থিতির নিশ্চয়তা ছাড়া দেশে ফেরা মানে বর্তমান অনিশ্চয়তা থেকে অজানা ঝুঁকিতে ঝাঁপ দেওয়া। এক্ষেত্রে তিনটি কারণকে সামনে আনছেন তারা—আইনি ঝুঁকি, নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়। এসব বিষয় মীমাংসার আগে কজন নেতা দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

 

সঠিক নেতৃত্বে এগোবে আওয়ামী লীগ, বলছেন নাছিম
হোয়াটসঅ্যাপে ভারত থেকে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দল আওয়ামী লীগ। এই দলের কেউ কেউ ভুল করছেন এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সঠিক সময় সঠিক নেতৃত্বে দল এগিয়ে যাবে। একসময় আবার দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে। সেজন্য সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনা হবে।’

 

শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি তৃণমূলের আস্থার সংকট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। লাখো নেতাকর্মীর এ দল নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলবে। সব কথা সঠিক নয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় রাজনৈতিক যে সংকটে পড়েছিল আওয়ামী লীগ, সেখান থেকে অনেক দূর এগিয়ে এসে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে দলটি।’

 

আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি নাছিম বলেন, ‘আগামী দিনে আওয়ামী লীগ কোন পথে হাঁটবে এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে কীভাবে দল সুসংগঠিত হবে—সে কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকবেন শেখ হাসিনা। আগামী দিনে নবীন-প্রবীণদের নিয়ে দল সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। দলের সভানেত্রী সেভাবে দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কোন পথে আওয়ামী লীগ যাবে তা নেতারা জনেন না এ কথা সঠিক নয়।’

 

আশা দেখছেন বিশ্লেষকরা
দলের নেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি-আস্থাহীনতা এবং অনিশ্চয়তা দেখা গেলেও আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আশার আলো দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত সরকার (অন্তর্বর্তী সরকার) আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। কিন্তু তার মানে এই না যে দলটি সবসময় নিষিদ্ধ থাকবে। আবার আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তী সরকারকে গ্রহণ করেনি, কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তারা প্রত্যাখ্যানও করেনি। তাছাড়া বিভিন্ন দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার উদাহরণ বিএনপির আগেও আছে।’

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন অধ্যাপক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমার মনে হয় নির্বাচিত সরকার এসেছে এবং এখন তাদের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্ব পাবে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলা বা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পেলে তা ইতিবাচকই হবে।’