Image description

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলোতে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শহর আক্রান্ত হয়েছে ইরানের হামলায়। এতে দুইজন বাংলাদেশি প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন। হামলার ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় অর্ধ কোটি প্রবাসী এবং দেশে থাকা তাদের পরিবার আছেন উৎকণ্ঠা এবং উদ্বেগের মধ্যে। সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৃত্যু, চাকরি হারানো এবং কাজে না ফিরতে পেরে দেশে ফিরে আসার ভয়ে এখন দিনযাপন করছেন সেসব দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা।  

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানে চালানো ধারাবাহিক ও তীব্র হামলার বিপরীতে ইরানও দমে না থেকে ইসরায়েলসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। এই সংঘাতের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে আছে হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততা। খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা শুরু করলে, লেবাননও ইসরায়েলি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

গত শনিবার শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মাত্র তিন দিনের মাথায়, অর্থাৎ সোমবারের মধ্যেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক এবং সাইপ্রাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতির এমন অবনতি হয়েছে যে, প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যই এখন যুদ্ধের কবলে, যার প্রভাব পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপরও ব্যাপকভাবে পড়ছে। সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সেখান থেকে মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্বেই অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস। খামেনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই অস্থিরতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবং দেশে থাকা তাদের পরিবার। এমনকি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে দেশে আটকে পড়া প্রবাসীরাও আছেন শঙ্কার মধ্যে। কারণ কাজে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষের পথে। তাই উৎকণ্ঠার মধ্যেই দিন পার করছেন তারা। 

মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট চলছে না, ভয় চাকরি হারানোর 

ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বেলা একটা পর্যন্ত ৩৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৪৭টি ফ্লাইট বাতিল হলো। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধসহ উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মামের ফ্লাইট চালু থাকলেও আগামী ৫ মার্চ পর্যন্ত এই অঞ্চলের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে সব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজা, সৌদি আরবের দাম্মাম, কাতারের দোহা এবং কুয়েত রুটে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।

বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আকাশপথের উত্তেজনা নিরসন ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিয়মিত বিমানের কল সেন্টার বা সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসী কর্মী আনোয়ারের সঙ্গে কথা হয় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ফ্লাইটের টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনি যেতে পারেননি। কারণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৫ মার্চ কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল কোম্পানিতে। কিন্তু ফ্লাইট না চলায় যেতে পারিনি। এখনও কোম্পানির সঙ্গে কথা হয়নি। জানি না মানবে কিনা। ফ্লাইট কবে চালু হবে সেটারও স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছি না। সেজন্য কোম্পানিকে জানাতেও পারছি না। আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘চাকরি মনে হয় থাকবে না।’

সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে গমনেচ্ছু কর্মীদের মধ্যে যাদের ফ্লাইট বাতিল ও ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানে হটলাইনে (১৬১৩৫ টোল ফ্রি) যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

উৎকণ্ঠায় দেশে থাকা পরিবার

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন প্রায় ৫০-৬০ লাখ বাংলাদেশি। এদের মধ্যে বেশিরভাগই সেখানে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং অর্ধেকের বেশি আছেন সৌদি আরবে। দেশে তাদের পরিবার-পরিজন আছে। পরিবার নিয়ে চিন্তা যেমন করছেন বিদেশে বসে, তেমনই পরিবারও উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন। সৌদি প্রবাসী মনিরুল হকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, রিয়াদে দুইদিন স্বাভাবিক ছিল কাজকর্ম। কিন্তু আজকে রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে হামলার পর এখন সবখানেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমার সঙ্গে আরও অনেক প্রবাসী থাকেন। তারা প্রতি ঘণ্টায় দেশে কথা বলতেছেন। বাড়িতেও সবাই টেনশন করছে। অনেকের পরিবার দেশে চলে যেতে বলছে। কিন্তু ফ্লাইট তো বন্ধ যাওয়ার উপায় নাই।

তিনি বলেন, এই যুদ্ধ বেশি সময় ধরে হলে আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কী করবো জানি না।

প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষ ‘সেল’ গঠন করেছে সরকার।

তিনি বলেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেক প্রবাসী সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, অনেকের ভিসার মেয়াদও শেষের পথে। আমরা একটি বিশেষ সেল গঠন করেছি। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে বা মাত্র কয়েকদিন বাকি আছে, তাদের তথ্য পাওয়ামাত্রই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করছি, আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো।” 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশগামী ও প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের ‘নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি’। আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তা, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সার্বিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।