মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হুমকিতে পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। যুদ্ধে অচল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ ইরানের হরমুজ প্রণালি। হামলায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে কাতার। ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো দেশটির সবচেয়ে বড় শোধনাগার রাস তানুরা সতর্কতার অংশ হিসেবে বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের পুরোটাই আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। আর এলএনজির বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সংকটে যাতে পড়তে না হয় এজন্য সরকারের জ্বালানি বিভাগ এরই মধ্যে বিকল্প জ্বালানি উৎসের খোঁজ শুরু করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। এরই মধ্যে বিকল্প উৎস হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, এঙ্গোলা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির চিন্তা করা হচ্ছে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আফ্রিকার দু-একটি দেশ থেকে এলপিজি আমদানির জন্য চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করি। পাইপলাইনে থাকা ৬টি কার্গোর মধ্যে ৪টি কার্গো এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। দুটি নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে সরবরাহকারী যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আছে তাদের অনুরোধ করেছি ভিন্ন কোনো উৎস থেকে আমাদের এলএনজি সরবরাহ করতে। সেটি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, এঙ্গোলা ও যুক্তরাষ্ট্র হতে পারে। এ জন্য তাদের মেইল দিয়েছি। তারা যদি ব্যর্থ হয় তখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার প্রস্তুতি আছে।
মহেশখালীতে যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) আছে সেটি আমাদের এলএনজির সংরক্ষণের একমাত্র উপায়। সেখানে একটি জাহাজের বেশি এলএনজি সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা নেই। এজন্য কয়েক দিন পর পর বছরজুড়ে এলএনজিবাহী জাহাজের শিডিউল করা থাকে। আমরা এখন ১৫ ও ১৮ তারিখের জাহাজ নিয়ে চিন্তিত। অন্যগুলো আরেক উৎস থেকে আসবে। এগুলো নিয়ে চিন্তিত না। যে চারটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে সেগুলো ঠিকমতো আসলে মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমাদের এলএনজি নিয়ে চিন্তা নেই। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনব।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, আমরা এরই মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করেছি। ক্রুড ওয়েলের জন্য পরিশোধিত তেল আমদানি করার চিন্তা চলছে। আর এলপিজির জন্য আফ্রিকার দুই-একটি দেশ থেকে আমদানির চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, আমরা ক্রুড ওয়েল মূলত আনি সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে। সৌদি আরব থেকে আমদানিকৃত তেলের একটি বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। কাতারের গ্যাসের ৮০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি থেকে। আগামী দুই-তিন মাসে কাতার থেকে কমপক্ষে ২৪-২৫টি এলএনজিবাহী কার্গো আসার কথা। এগুলো আমদানি এখন সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে গিয়েছে। বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব দেশে রিফাইনারি আছে সে দেশগুলো থেকে আমাদের ডিজেল আসে। ভারত ও সিঙ্গাপুরে বড় রিফাইনারি হাব আছে। আবার ভারতের ৫০ শতাংশ তেল আসে আরব দেশগুলো থেকে। সুতরাং রিফাইনারি থাকলেই যে আমরা পরিশোধিত তেল পাব এমন না। সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ায় ভারত ও সিঙ্গাপুরও ক্রুড পাচ্ছে না। নতুন চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে একটি কার্গো আসার কথা। বিকল্প হিসেবে আমাদের অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আপৎকালীন জ্বালানি উৎস হিসেবে এলএনজি আমদানি করতে হবে। কিন্তু পথের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এর আমদানি ও পরিবহন মূল্য বৃদ্ধি পাবে। সরকারকে এখন গুরুত্ব দিয়ে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সপ্তাহখানেক পরই জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে দেখতে হবে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখলে এবং গুপ্ত হামলা চালালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির ওপর প্রভাব পড়বে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবশ্যই বিকল্প জ্বালানি উৎসের খোঁজ করতে হবে। আর বিকল্পে গেলে প্রথমেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবে। যেহেতু বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী মূল্যে কাতার থেকে এলএনজি আনে কিন্তু এখন তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনা যেতে পারে। আবার স্পট মার্কেটের ক্ষেত্রে কার্গো কোথা থেকে আসবে এটি স্পষ্ট না। কিন্তু স্পট মার্কেটে দাম যদি ১৫ ডলারে চলে যায় তখন বাংলাদেশ চাপে পড়বে। তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেহেতু পরিশোধিত তেল কেনে, তাই যেখানে রিফাইনারি আছে সেখান থেকে আনতে হবে।