দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার। কিন্তু হঠাৎ কেন তারা সরে দাঁড়ালেন এ নিয়ে চারদিকে জমজমাট আলোচনা। অল্প সময়ে পুরো কমিশনের এমন বিদায় অনেকটা নজিরবিহীন। মানবজমিন অনুসন্ধান বলছে, একটি ইফতার পার্টিতে দুদক চেয়ারম্যানের যোগ দেয়ার কারণেই তাকেসহ পুরো কমিশনকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পরই দুর্নীতি দমন কমিশনে পরিবর্তনের কোনো আলোচনা ছিল না। কিন্তু ওই ইফতার পার্টি ঘিরেই দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।
দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন। এ কারণে তার প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক ধরনের সহানুভূতি ছিল। কিন্তু ড. মোমেন সরকারের অনুমতি ছাড়াই সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের আমন্ত্রণে ইফতার পার্টিতে যোগ দেন। মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত ওই ইফতার পার্টিতে সদ্য বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিদায়ী অনেক উপদেষ্টা অংশ নেন। আলোচনা আছে নির্বাচন বিলম্বিত করতে যে কয়জন উপদেষ্টা চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফাওজুল কবির খান। এ প্রক্রিয়ায় জড়িত উপদেষ্টাদের গতিবিধি নিয়ে সরকারেও এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। এমন অবস্থায় সাবেক উপদেষ্টার বাসায় এমন ইফতার পার্টি নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ওই ইফতার পার্টিতে সরকারের আরও কয়েকজন কর্মকর্তাও হাজির ছিলেন। যদিও তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। ঘরোয়া ওই ইফতার পার্টির তথ্য ও ছবি প্রথম ফেসবুকে শেয়ার করেন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এরপরই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ইফতার পার্টির পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কমিশনকে আচমকাই সরে দাঁড়াতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী এক মাস সময় নিয়ে দায়িত্ব ছাড়ার আবেদন করেন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা। তবে সরকারের তরফে বলা হয়, এক মাস সময় নেয়ার প্রয়োজন নেই। তাৎক্ষণিক পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে। তবে এক মাসের বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে।
ইফতার পার্টিতে অংশ নেয়া ছাড়াও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে গত বছরের ৯ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের এক অনুষ্ঠানে ড. আবদুল মোমেনের একটি বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করলে দেশে দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে। নির্বাচনের আগে জামায়াত-এনসিপি জোটও এ ধরনের বক্তব্য দেয় নির্বাচনী সভা সমাবেশে। নির্বাচনের আগে দুদক চেয়ারম্যানের এই রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
দায়িত্ব ছাড়ার পর অবশ্য ড. আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, কোনো চাপ ছাড়াই তারা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। ড. মোমেনসহ দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে দুদক কার্যালয়ে ড. মোমেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পদত্যাগের বিশেষ কোনো কারণ নেই। একটি নতুন সরকার এসেছে, সেই সরকারেরও প্রত্যাশা রয়েছে। সরকার তার সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিশ্চয় আমাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য কমিশন গঠন করবেন।
উল্লেখ্য, ড. মোমেন দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর দায়িত্ব পান। তার আগ পর্যন্ত তিনি চুক্তিতে সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৩ই ডিসেম্বর আলি আকবার আজিজী ও এর তিনদিন পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. হাফিজ আহসান ফরিদ দুদকে যোগ দেন।
বিদায়ী দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন একজন লেখক হিসেবেও পরিচিত। তিনি আন্দালিব রাশ্দী নামে লেখালেখি করেন।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যাদের নাম আলোচনায়: ওদিকে দুদকের পুরো কমিশন দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর এখন নতুন কমিশনে কারা আসছেন তা নিয়ে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনের নাম বেশি আলোচনায়। মোতাহার হোসেন একজন সৎ এবং সাহসী বিচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের জমানায় তথাকথিত দুর্নীতির মামলার রায়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে খালাস দিয়ে দেশছাড়া হতে বাধ্য হয়েছিলেন এই বিচারক। এছাড়া সাবেক সচিব এবিএম শাহজাহানের নামও আলোচনায় আছে। কর্মজীবনে তিনিও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া কমিশনার হিসেবে আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় আছে।
যে প্রক্রিয়ায় কমিশন নিয়োগ: সর্বশেষ দুদক সংশোধনী আইন অনুযায়ী সরকার মনোনীত একটি বাছাই কমিটি কমিশন চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নামের তালিকা প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেবে। প্রেসিডেন্ট এই কমিটি থেকে কমিশন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের নাম অনুমোদন দেবেন। সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী কমিশনের সদস্য সংখ্যা ৫ জন করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন নারী সদস্য রাখার বিধান আছে। চার কমিশনারের মধ্যে প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন একজকে রাখার বিষয়ও উল্লেখ আছে।