Image description

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচন ঘিরে চলছে নজিরবিহীন মেরুকরণ। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তিনটি রাজনৈতিক ধারা। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত জেলার সর্ববৃহৎ এই পেশাজীবী সংগঠনের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি রাজনৈতিক প্যানেল এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দুটি প্যানেল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত। একই সঙ্গে মাঠে নেমেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলও। এ নিয়ে উত্তাপ বাড়ছে জেলার আইনাঙ্গনে। আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের ভোটে অংশগ্রহণ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের অন্যান্য জেলার মতো কক্সবাজারেও কোণঠাসা হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে তাদের সমর্থিত পেশাজীবীরাও। প্রতিকূল প্রেক্ষাপটের কারণে ২০২৫ সালে কক্সবাজার বারের নির্বাচনে অংশ নেয়নি তারা। কিন্তু এবার পূর্ণাঙ্গ প্যানেল নিয়ে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

 

এদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে নানা তৎপরতা শুরু করেছেন। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার আইনজীবী সমিতি ভবনে তিন আইনজীবীর ব্যক্তিগত চেম্বারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানানো হয়। এ সময় আওয়ামীপন্থী আরও কয়েকজন আইনজীবী ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমিতির ১৭টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫০ জন। এর মধ্যে মাত্র একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, বাকি ৪৯ জন তিন প্যানেলের। ২০২৫ সালের আগে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিতরা মিলে একটি প্যানেল হয়ে ভোটে অংশ নিতেন। এই প্যানেলের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের। কিন্তু এবারই প্রথম বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ তিনটি আলাদা প্যানেল নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছে।

 

বিএনপি সমর্থিত ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম’
বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ও সমমনা আইনজীবীদের প্যানেলে সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মন্নান এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছলিমুল মোস্তফা।

 

এ ছাড়া প্যানেলে রয়েছেন সিনিয়র সহসভাপতি পদে মোহাম্মদ আবু তাহের, সহসভাপতি পদে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সহ-সাধারণ সম্পাদক (সাধারণ) পদে নুরু রশিদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক (হিসাব) পদে মো. মনজুর আলম, পাঠাগার ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক পদে শওকত আলম, আপ্যায়ন সম্পাদক পদে রবিউল আরাফাত (বাপ্পা), ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ইফতেখার মাহমুদ, সিনিয়র নির্বাহী সদস্য পদে মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইউনুছ, মোহাম্মদ তাওহীদুল আনোয়ার ও মোহাম্মদ আবদুর রশিদ এবং নির্বাহী সদস্য পদে কামরুল হাসান, আবদুর রহিম, মো. শহিদুল ইসলাম ও আজিজুল করিম।

 

 

বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের প্যানেল
বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের প্যানেল

 

 

জামায়াত সমর্থিত ‘বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আমির হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আখতার উদ্দিন হেলালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

 

এই প্যানেলের সিনিয়র সহসভাপতি পদে আবদুল বারী, সহসভাপতি পদে আবদুর রহমান, সহ-সাধারণ সম্পাদক (সাধারণ) পদে জিয়াউদ্দিন মাহমুদ (তমাল), সহ-সাধারণ সম্পাদক (হিসাব) পদে আবদুর রহিম, পাঠাগার ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক পদে নুর মোহাম্মদ, আপ্যায়ন সম্পাদক পদে মোহাম্মদ ইসহাক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মো. শওকত আলম, সিনিয়র নির্বাহী সদস্য পদে এ কে এম শাহজালাল চৌধুরী, নুরুল মোর্শেদ আমিন, মোহাম্মদ নেজামুল হক ও নাজিম উদ্দিন এবং নির্বাহী সদস্য পদে তাহের আহমদ সিকদার, এস এম জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ হানিফ ও মো. আবদুল খালেক লড়ছেন।

 

 

জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের প্যানেল
জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের প্যানেল

 

 

আওয়ামী লীগপন্থী ‘সাধারণ আইনজীবী পরিষদ’
আওয়ামী লীগপন্থী সাধারণ আইনজীবী পরিষদ ১৭টির মধ্যে ১৫টি পদে প্রার্থী দিয়েছে। এ প্যানেলে সভাপতি পদে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বদিউল আলম সিকদার এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুল হুদা।

 

আওয়ামী লীগপন্থী প্যানেলে সিনিয়র সহসভাপতি পদে মোহাম্মদ সেলিম নেওয়াজ, সহ-সাধারণ সম্পাদক (সাধারণ) পদে মনিরুল ইসলাম, সহ-সাধারণ সম্পাদক (হিসাব) পদে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, পাঠাগার ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক পদে জসিম উদ্দিন, আপ্যায়ন সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রিদুয়ান আলী, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে নাহিদা খানম কক্সী, সিনিয়র নির্বাহী সদস্য পদে মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন, ইকবালুর রশিদ আমিন ও জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং নির্বাহী সদস্য পদে মোহাম্মদ রাশেল, পারভীন সুলতানা পিয়া, এস এম হোসাইন মাহমুদ মোশাররফ ও সেকাব উদ্দিন লড়াই করেছেন।

 

 

আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের প্যানেল
আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের প্যানেল

 

 

এর বাইরে সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন অ্যাডভোকেট নাছির উদ্দিন।

 

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের ৩১৩ জন ভোটার আছেন। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’

 

আওয়ামী লীগপন্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচনে কে অংশ নেবে-না নেবে, এটা জাতীয়ভাবে নির্ধারণ করা হবে। এখানে আমাদের নিজস্ব কোনো মতামত নেই। কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবেও অংশ নিচ্ছে, এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।’

 

তবে বিএনপি প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছলিমুল মোস্তফা বলেন, ‘আইনগতভাবে আওয়ামী লীগপন্থীদের নির্বাচন করার অধিকার নেই। তারা নিষিদ্ধ দলে পরিণত হয়েছে। তবে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে একটি প্যানেল ঘোষণা করেছে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই তারা আবির্ভূত হয়েছে, যা আশঙ্কার বিষয়।’

 

এদিকে আওয়ামী লীগপন্থী সাধারণ আইনজীবী পরিষদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী কেউ-ই নির্বাচন নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে এই প্যানেলের আপ্যায়ন সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ রিদুয়ান আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, মূলত আমরা আওয়ামী লীগের ব্যানারে নয়, সাধারণ আইনজীবী পরিষদের ব্যানারে পূর্ণ প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। বলতে পারেন, এটি ‘ছায়া আওয়ামী লীগ’। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্যানেল ভোটারদের কাছ থেকে প্রচুর সাড়া পাচ্ছে। জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।

 

এদিকে গুঞ্জন উঠেছিল, এই প্যানেলের সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সেলিম নেওয়াজ পদত্যাগ করেছেন। তবে বিষয়টি খোলাসা করে রিদুয়ান আলী বলেন, তিনি সভাপতি পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। তবে সবার মতামতের ভিত্তিতে সিনিয়র সহসভাপতি পদে প্যানেলে রাখা হয়েছে। পদত্যাগের বিষয়ে মৌখিকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, লিখিতভাবে কিছু জানাননি।