Image description

বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন ছিল তরুণ ফাহাদের। পরিবারের আশা ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে মামাদের মতো ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে সে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ শেষ হলো মৃত্যুর অন্ধকারে। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় পরিবার পেল এক হৃদয়বিদারক খবর—ফাহাদ আর নেই।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের নগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ। তিনি প্রায় ৯ লাখ টাকা ঋণ করে দালালের মাধ্যমে ছেলে মো. ফাহাদকে (১৮) দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠান। সেখানে পৌঁছেই মৃত্যু হয় তার।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা নুর মোহাম্মদ।

তিনি বলেন, আমার ছেলেকে কখনো কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম বাবা পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। বাবা হয়ে না করতে পারিনি।
এখন আমার ফাহাদ আর নেই।

 

নুর মোহাম্মদের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন মেজো। স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল ফাহাদ। চলতি বছর তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল সে।

 

পরিবার জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা দুই মামার ব্যবসা ও আয় দেখে ফাহাদের মনে হয়েছিল, বিদেশে গেলে জীবন বদলে যাবে।

একটি বেসরকারি বীমা কম্পানিতে কর্মরত ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ জানান, ছেলের জেদ আর স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা ঋণ নিই। প্রথমে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলাম। পরে ব্যাংকের মাধ্যমে আরো সাত লাখ পাঠাই। পৌঁছানোর পর আরো দেড় লাখ দেওয়ার কথা ছিল।

 

ফাহাদ গত ৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হয়। কথা ছিল, ইথিওপিয়া হয়ে বিমানে জিম্বাবুয়ে এবং সেখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছে দেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তবে দালালচক্র তাকে ইথিওপিয়া থেকে দুর্গম জঙ্গলের পথে হাঁটিয়ে একাধিক দেশ ঘুরিয়ে সড়কপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যায়।

পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা এবং চিকিৎসার অভাবেই মৃত্যু হয়েছে ফাহাদের। যাওয়ার সময় ফাহাদকে ২০০ ডলার দেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাগে শুকনা খাবারও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে ছিনতাইকারীরা সব কেড়ে নেয়। এ কারণে চরম কষ্টের মধ্যে পড়ে যায় তরুণটি।

১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা ছোট মামা মোহাম্মদ ফয়সাল ফোন করে জানান, ফাহাদ মুসিনা শহরে পৌঁছেছে এবং একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছে। খবরটি শুনে পরিবার স্বস্তি পেলেও তা স্থায়ী হয়নি। সেই রাতেই অপরিচিত একজন ফোন করে বলেন, আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন, সে মারা গেছে। ফাহাদের পাসপোর্টে থাকা ঠিকানা দেখে ওই ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এদিকে, ছেলের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ বাবা নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, আমি শুধু শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে চাই। তিভাবে থাকব ওকে ছাড়া, এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।

অপরদিকে, ফাহাদের মৃত্যুর পর দালালচক্র টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। তবে একটি প্রাণ হারানোর ক্ষত কোনো অর্থে পূরণ হয় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চন্দনাইশ-পটিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে একটি সক্রিয় দালালচক্র অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর নামে তরুণদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। তবে পরিবারগুলোকে সচেতন হতে হবে।

ফাহাদের মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল, অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা কতটা ভয়ংকর। স্বপ্ন দেখিয়ে দালালচক্র যে কত সহজে জীবন কেড়ে নিতে পারে, এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ।