রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেছেন মেহেদী হাসান। শখ ছিল ভিডিওগ্রাফি ও ফটোগ্রাফির। ড্রোন, ক্যামেরা ও পূর্ণাঙ্গ সেটআপ নিয়ে নিজের স্টুডিও ছিল তার। জনপ্রিয় কমেডি শো ‘মীরাক্কেল’ ও ‘হাসো’র সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু মায়ের ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার পর মেহেদীর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
মায়ের চিকিৎসার এক পর্যায়ে শখের স্টুডিও, ড্রোনসহ সব সরঞ্জাম বিক্রি করে দেন মেহেদী হাসান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে দুই বছর আগে তার মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও দমে যাননি মেহেদী। রংপুর নগরের লালকুঠির বাসিন্দা মেহেদী ইউটিউব ঘেঁটে মাশরুম চাষ শুরু করেন। এখন কাঁচা মাশরুম, বীজ ও মাশরুমের বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করে মেহেদীর মাসে আয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। নিজে যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন অন্তত ৩৫ নারীর।
মেহেদী এই মাশরুম চাষ করছেন তার শ্বশুরবাড়ি রংপুর নগরের আমাশু কুকরুল এলাকায়। মেহেদী জানান, গত বছরের জানুয়ারিতে তাকে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা দেয়া হয়। এই টাকা দিয়ে তিনি মাশরুম চাষ উপযোগী ঘর করেছেন। শ্বশুরবাড়িতে মাশরুমের বীজ উৎপাদনের ল্যাব স্থাপন করেছেন।
মেহেদী হাসান জানান, ২০২২ সালের অক্টোবরে মাত্র ২০০ টাকার স্পন (বীজ) নিয়ে একটি ড্রামে মাশরুম চাষ শুরু করেন তিনি। ইউটিউব দেখে করা সেই শুরুর প্রচেষ্টায় ১০০টি সিলিন্ডারের (খড়ের প্যাকেট) সব কটিই নষ্ট হয়ে যায়। তবু দমে যাননি তিনি। যোগাযোগ করেন রংপুরের বুড়িরহাট হর্টিকালচার সেন্টারের সঙ্গে। এক পর্যায়ে ঢাকার সাভারের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে ১০ দিনের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করেন মাশরুম চাষ।
শুধু কাঁচা মাশরুমে সীমাবদ্ধ থাকেননি মেহেদী। তিনি তৈরি করছেন মাশরুমের স্যুপ মিক্স, শুকনা মাশরুম, পাউডার, আচার, চপ ও চিপস। এমনকি মেলাগুলোয়ও তার স্টল বেশ সাড়া ফেলেছে। তিনি জানান, কাঁচা মাশরুম, স্পন ও মাশরুমের তৈরি খাবার বিক্রি করে তার মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা মুনাফা হয়।
মাশরুম চাষ করে মেহেদী হাসান নিজে যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন অন্তত ৩৫ নারীর।
তার দেখাদেখি আমাশু কুকরুল এলাকার ৩৫ নারী মাশরুম চাষ করছেন। এই নারীরা হর্টিকালচার সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ ও বীজ নিয়ে মাশরুম উৎপাদন করে মেহেদীর কাছে বিক্রি করেন।
মাশরুমচাষি ববিতা খাতুন জানান, সংসারের কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষ করে এখন মাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন। এখন স্বামীরাও উৎসাহ দিচ্ছেন।
আরেক চাষি ইয়াসমিন বেগম জানান, আগে তাদের সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল। কিন্তু এক বছর ধরে মাশরুম চাষ করে এখন তারা ভালো আছেন। তিনি বলেন, ‘মেহেদী আমাদের বীজ দেয়, ড্রাম ও সিলিন্ডার পদ্ধতির সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছে। আমাদের উৎপাদিত মাশরুম ওর কাছে বিক্রি করি, ফলে বিক্রির কোনো চিন্তা থাকে না।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মেহেদী হাসান জানান, তিনি মাশরুম চাষকে একটি বড় শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। তার স্বপ্ন, এমন একটি ব্র্যান্ড তৈরি করা, যা তার অনুপস্থিতিতেও মানুষের কর্মসংস্থান ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে যাবে।
এ বিষয়ে রংপুরের বুড়িরহাট হর্টিকালচার সেন্টারের সদ্য বদলি হওয়া উপপরিচালক (ডিডি) আবু সায়েম বলেন, মেহেদী মাশরুম উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন ও মাশরুম দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে সফল হয়েছেন। তিনি নিজে একজন শুধু উদ্যোক্তা নন, অন্য বেশ কিছু পরিবারের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।