আনলাকি থার্টিন। সংখ্যাটি অশুভ মনে করেন অনেকে। ইতিহাস বলছে, কথাটি এসেছে বাইবেলে বর্ণিত ‘লাস্ট সাপার’ বা ‘শেষ নৈশভোজের’ পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে ১৩ সংখ্যাকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ আছে। ১৩ হচ্ছে প্রাইম নাম্বার। এটি শুধু ১ ও নিজের দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য।
আনলাকি থেকে লাকি। ভাগ্যবিড়ম্বনা থেকে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। কথাটির প্রাসঙ্গিকতা এখানে সঙ্গতকারণে। একদিন আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এক ডজন সংসদের ইতিহাস রয়েছে কার্যবিবরণীতে। যার বেশির ভাগই ছিল বিবর্ণ। বিতর্কিত। একতরফা। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু এবার স্বপ্ন নিয়ে আমজনতা রায় দিয়েছেন ১২ই ফেব্রুয়ারি। ‘সবার আগে দেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করেছে কোটি কোটি মানুষের ব্যালট।
চব্বিশের জুলাই নতুন এক তাগিদ তৈরি করেছে লাল সবুজের এই জমিনে। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগে নতুন প্রেক্ষাপট রচিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নানা সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে সিরিজ প্রস্তাবনা শেষে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়েও শেষতক ছিল দ্বিধা। কী হবে না হবে? তবে বাস্তবতা হচ্ছে কোনোরকম রক্তপাত, হানাহানি ছাড়াই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অনন্য নজির। নিঃসন্দেহে এই ভোট উৎসবের জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন ইউনূস প্রশাসন এবং নাসির কমিশন। এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। যা দেশের নির্বাচনের ইতিহাসেও ভিন্ন দৃষ্টান্ত। এবারের নির্বাচনে লক্ষণীয় ছিল একইসঙ্গে দু’টি ব্যালট। একটি গণভোট, অন্যটি জাতীয় নির্বাচন।
ভোটের ব্যালটে লক্ষণীয় ছিল তারুণ্যের জোয়ার। দলমতনির্বিশেষে প্রত্যাশিত জনরায় দিয়েছে বিএনপি জোটকে। আর সেই জয়ের নায়ক একজনই- তারেক রহমান। ডানপিটে, অবাধ্যতার খোলস ছাড়িয়ে যিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। নিয়ে গেছেন সাধারণের কাতারে। অগুনতি মানুষের হৃদস্পন্দন আর অনুভূতিকে ধারণ করে জয় পেয়েছেন লাইনচ্যুত ট্রেনকে ট্র্যাকে তোলার। হুইসেল বাজাবার। এগিয়ে যাবার। এই জয় এসেছে একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পক্ষে।
অথচ মাত্র দেড় মাস আগেও যিনি দেশে ফিরতে পারবেন কিনা- তা নিয়ে ছিল সংশয় আর দ্বিধা। ছিল এক গুচ্ছ শঙ্কা। নিরাপত্তার ছিল তীব্র ঝুঁকি। সতের বছরের নির্বাসনের ক্লান্তি ছিল আপাদমস্তক। ফেরার পরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনতার প্রতি অবিচল আস্থা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া দিনের প্রখর তাপ মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করে রাতের হিমেল কুয়াশাতেও অদম্য ছিলেন পথে প্রান্তরে, নির্বাচনের ময়দানে।
প্রচারের ময়দানে প্রায় দু’ডজনের বেশি বড় জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। প্রচারণায় তিনি মানুষকে যুক্ত করেছেন, কাছে টেনেছেন দরদ দিয়ে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ধর্মীয় কার্ডের বিপরীতে তিনি সকল মানুষের অনুভূতিকে সম্বল করেছেন। একটি দলমতনির্বিশেষে সকলের জন্য দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। প্রচারণা চলাকালে ২৭শে জানুয়ারি তারেক রহমান ময়মনসিংহের পথে। ভালুকার সিডস্টোর এলাকায় এক কিশোরী সন্ধ্যার নিভু নিভু আলোতে হাত দেখালে তারেক রহমান গাড়ি থামিয়ে তার কথা শুনেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সংবলিত বাসে কিশোরী তারেক রহমানকে খালেদা জিয়ার একটি ছবি উপহার দিয়ে নতুন দেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন। অথবা মৌলভীবাজারের সেই বৃদ্ধার কথা। যাকে তারেক রহমান বসিয়েছেন নিজের আসনে।
নির্বাচনের বৈতরণী সাফল্যের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছেন তারেক রহমান। কথার পৃষ্ঠে কথা আর যুক্তহীনতার বিপক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে মানুষের রায় নিজের পক্ষে নিয়েছেন। হাসিনার তিন টার্মের শাসন, জুলাই আন্দোলনের পরে তৈরি হওয়া নতুন প্রেক্ষাপটে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে তারেক রহমানকে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলেও জুলাই আন্দোলনের রাজপথের সারথীরাই বসছে বিরোধী দলে। এরপর আলোচনায় আছে একগুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচি। উচ্চকক্ষ আর নিম্নকক্ষ। এর বাইরে দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, দুর্নীতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠার বাইরে নানান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই।
ইতিমধ্যেই সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছোট আকারের একটি মন্ত্রিসভা দিয়েই তারেক রহমান শুরু করতে চান নতুন বাংলাদেশের সূচনা। এর মধ্যদিয়ে তিনি বেশ কিছু রেকর্ডও গড়েছেন। পিতা ছিলেন প্রয়াত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার হলেও রাজনীতির পিচ্ছিল ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে একজন পরিণত তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশের।
মাত্র দেড় মাসের আগের ঘটনা। ২৫শে ডিসেম্বর। সতেরো বছরের নির্বাসন শেষে বিমানবন্দরে নেমেই ছুয়েছিলেন মাটি। পূর্বাচলে লাখ লাখ জনতার ক্যানভাসে নিজের স্বপ্ন। মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিমের’ কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। বাংলার মানুষ তারেক রহমানের হাতে দেশ পরিচালনার স্টিয়ারিং তুলে দিয়েছেন। প্রত্যাশা তিনি সেই জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিদান দেবেন দেশ গড়ার মধ্যদিয়ে।
ফুটবলের মাঠে যিনি দেড় মাস আগেও ছিলেন ডি- বক্সে। কিন্তু বল পায়ে নিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়েছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে করেছেন বাজিমাত। আদায় করেছেন চোখ ধাঁধানো গোল।
নির্বাসন থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এক/এগারোর জমানায়। ২০০৭ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর। মামলার ভারে অথৈ অবস্থা হয়েছিল হাসিনার জমানায়। দেশে ফিরলেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো, এমন অসংখ্য পরোয়ানা লেখাই ছিল। তবু তিনি দমেননি। সতেরো বছর ভার্চ্যুয়ালি বক্তৃতা করেছেন, দলকে দুর্যোগ ও দুর্বিপাক থেকে বাঁচাতে নীতি ও কৌশল নিয়ে মাঠ তাতিয়েছেন। নিজেকে কেবলই ভাঙা-গড়ায় শানিত করেছেন। রাজনীতির স্কুলিং নিয়ে বিএনপি’র তৃণমূল থেকে নানা স্তরে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন। রাজনীতিতে শেষ বলে কথা নেই- এই আপ্ত বাক্যের নজির গড়েছেন।
২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল। লম্বা নির্বাসনে যাওয়ার আগে তারেক রহমান দলের তৃণমূল চষে বেড়িয়েছেন। মাঠের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন বিএনপি’র উদীয়মান নেতা হিসেবেও। এ সময় তরুণদের মাঝেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। বেশ কিছু ইস্যুতে বিতর্কিতও হয়েছিলেন। নিজেকে আমুল বদলেছেন লম্বা সময়ে প্রবাসে থাকার সময়ই।
রাজনীতির মাঠে জল গড়ায় অনেকদূর। সেনাসমর্থিত সরকারের সময় বিরাজনীতিকরণ নিয়েও তুমুল বিতর্ক চলে। দু’বছরের মধ্যেই ফের খোলনলচে বদলে যায়। মইন-ফখরুদ্দীনের বিদায়ে শেখ হাসিনা মসনদে বসেন। এরপর একের পর এক বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচনে গণতন্ত্র ব্রাকেট বন্দি হয়ে পড়ে। বিনা ভোট, রাতের ভোট, ডামি ভোট বিতর্ক উত্তাপ ছড়াতে থাকে।
প্রেক্ষাপট বদলায়। ২০২৪ সাল নিয়ে আসে এক অভূত পরিবর্তন। শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত হাসিনার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাইতে গণ-আন্দোলনের ঢেউ ভাসিয়ে নেয় হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে। ৫ই আগস্টের পরিবর্তনে সূচিত হয় নতুন আকাঙ্ক্ষা। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে আসেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
টানা সতেরো বছর লন্ডনে নির্বাসনে থেকেও রাজনীতির টালমাটাল ঘটনাপ্রবাহে তারেক রহমান ছিলেন বিএনপি’র প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য কারিগর। এ সময়কালে বেগম খালেদা জিয়ার বন্দি থাকা এবং তীব্র শারীরিক অবস্থার অবনতি, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু, তীব্র মানসিক চাপেও দলের ভেতরে বাইরে নানামুখী তৎপরতা সামলান দক্ষভাবে। দলের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে সরব ছিলেন। সঙ্গত কারণেই চব্বিশের ৫ই আগস্টের পর তার দেশে ফেরা নিয়ে চাপ বাড়ে। দলের নেতাকর্মীদের অপেক্ষার প্রহর বাড়তে থাকে। প্রত্যাশা তৈরি হয় আকাশচুম্বী।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তারেক রহমান
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতায়, বাংলাদেশে নতুন এক নেতার উত্থান। গার্ডিয়ান লিখেছে, হাসিনাকে উৎখাতের পর প্রথম ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপির জয়। ভোট ছিল ব্যাপকভাবে শান্তিপূর্ণ। অনেক বছরের রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতির পর এই নির্বাচনকে দেখা হয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য পরীক্ষা হিসেবে। সিএনএন লিখেছে, জেন-জির অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। মালয় মেইল লিখেছে, বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।