ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করেছে বিএনপি। তবে নতুন সরকার গঠন হবে কীভাবে বা তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, এই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বা নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। তবে এই শপথের প্রক্রিয়া নিয়েও এবার তৈরি হয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা।
শপথ কত দিনের মধ্যে নিতে হয়?
উত্তরটা হচ্ছে, সাধারণত নিবাচনের ফল ঘোষণার তিনদিনের মধ্যে শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। সাধারণভাবে নির্বাচন কমিশন থেকে যে বেসরকারি ফল যাওয়া যায় একদিন বা দুইদিনের মধ্যে, সেটা কিন্তু আনুষ্ঠানিক ফলাফল হিসেবে গণ্য হয় না। মানে সেই ফলাফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ নিতে হবে এমনটা নয়।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হতে হবে এবং এরপর ‘তিন দিনের মধ্যে’ নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর প্রজ্ঞাপন হতে আরও কয়েক দিন বাড়তি সময় লাগতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গণমাধ্যকে ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, তার মতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ১৮ই ফেব্রুয়ারির পরে যাবে না। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক ব্রিফিংয়ে প্রেসসচিব বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত সময়ে (ক্ষমতা) হস্তান্তর হবে।এটা তিন দিনের মধ্যে হয়ে যেতে পারে। ১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে। আমার মনে হয় না এটি ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে।’
সেক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে, সব ঠিক থাকলে নির্বাচনের পরে ছয় দিনের মধ্যেই নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
নির্বাচিত সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন?
শপথ কে পড়াবেন এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী অতীতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন মূলত জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে।
তাহলে উপায় কী আছে?
এক্ষেত্রে আবারো যেতে হবে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’
এই অনুচ্ছেদে মূলত দুটি উপায় বলা হয়েছে।
এক. রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীতি করতে পারেন।
দুই. যদি তিন দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ করাতে না পারেন তাহলে তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত পাঁচই ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। সেসময় তিনি জানান, নির্বাচনের পর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। আমাদের সামনে দুটি অপশন আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করা পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’
শপথের পর ক্ষমতা কে, কীভাবে পাবেন?
শপথের বিষয়টির সমাধান হয়ে গেলেও আরো কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ক্ষমতা কে, কীভাবে পাবেন, অর্থাৎ সরকার গঠন কে করবেন?
এখানে এই প্রক্রিয়াটি হবে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে। তিনি যে দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে, অর্থাৎ ১৫১টি বা তার বেশি আসনে জয়ী হয়েছে, তাকেই সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন। এখানে দলকে আমন্ত্রণ জানানো মানে দলের নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো।
তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন হিসেবে প্রথমে সংসদ নেতা হবেন এবং এরপর আমন্ত্রণ পেয়ে নতুন সরকার গঠন করবেন। তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ এবং নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বিষয়টা বর্ণনা করা আছে এভাবে "যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন"।
মূলত, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসভার সদস্যরা শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ওই পদগুলোর ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়ে যাবেন। এরমধ্য দিয়েই আগের সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়ে গঠিত হয়ে যাবে নতুন সরকার। সংবিধান অনুযায়ী শপথগ্রহণ হয়ে গেলেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বলে গণ্য হবে।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথগ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথগ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’