Image description

ঢাকার শহীদ মিনারে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট যখন নাহিদ ইসলাম মাইক্রোফোনে ঘোষণা দেন ‘হাসিনাকে যেতে হবে’ তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এর কয়েক সপ্তাহ আগেই ছাত্রদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। যেখানে লোভনীয় সরকারি সিভিল-সার্ভিস পদে চাকুরীর জন্য একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ কোটাধারীদের জন্য, এর ফলে সকলের জন্য মেধা-ভিত্তিক সুযোগ খুব কম ছিল।

 

পরবর্তীতে যখন বিক্ষোভকারীদের দমন করার জন্য তৎকালীন হাসিনা সরকার প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো তীব্র। তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ দেশব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়, আর এর কয়েক দিনের মধ্যেই হাসিনার শাসনের পতন ঘটে।

বাংলাদেশের এই বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ছাত্র নাহিদ ইসলাম। সাধারণ শার্ট পরা এক তরুণ সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার্থী, মাথায় বাঁধা বাংলাদেশের সবুজ-লাল পতাকা—তিনি কথা বলতেন ক্ষমতার কাঠামো থেকে বঞ্চিত প্রজন্মের পক্ষে । পরবর্তীতে তিনি নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে স্বল্প সময়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

আর এখন তিনি ২৭ বছর বয়সে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যা দেশের সংবিধান অনুসারে নির্ধারিত সংসদ প্রার্থীদের সর্বনিম্ন বয়স ২৫ বছরের খুব একটা বেশি নয়।

তিনি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতা হিসেবে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। এই রাজনৈতিক দলটির জন্ম হয়েছে হাসিনা বিরোধী বিক্ষোভের মধ্য থেকে। এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজপথের জয়ের উপর ঝুলে থাকা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে এই দল গঠন। যেখানে ‘পুরাতন রাজনীতির’ একই ক্যারোসেলের হাতে ক্ষমতা না দিলে কী হবে?

অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিল ‘কে হবে বিকল্প?’ এই ছিল,

এই তো ছিল তার উত্তর। এনসিপিই সেই বিকল্প—একটি মধ্যপন্থী শক্তি, যার প্রতিশ্রুতি ছিল ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত-এর’।

বাংলাদেশের দুই বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক মেরুতে ক্লান্ত দেশের নাগরিক। একদিকে, ২০২৪ সালে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটানো রক্তাক্ত দমন-পীড়নে ভূমিকার কারণে এই নির্বাচনে নিষিদ্ধ হাসিনার আওয়ামী লীগ; এবং আর রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাই নাহিদ ইসলাম ও তার সহকর্মীরা কিছু সময়ের জন্য পুরোনো রাজনৈতিক আকর্ষণবলয় থেকে বেরিয়ে আসার একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন।

তবে সেই আশায় ভাটা পড়তে শুরু করে, যখন দলটি জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার কারণে যে দলটি এখনো অনেকের স্মৃতিতে বিতর্কিত, এবং যার সামাজিক অবস্থান নিয়ে সমাজকর্মী ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

এই জোট দলটির ভেতরেও বিভাজন তৈরি করেছে। জোটের রূপরেখা স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এনসিপি তাদের উদারপন্থী অংশের অনেক সদস্যকে হারায়—যাদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও নারী নেত্রীও। তাদের অভিযোগ, দলটি “প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকার থেকে সরে যাচ্ছে।”

কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তকে ইসলাম সমর্থন করেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এটি আদর্শগত নয় বরং নির্বাচনি জোট। কিছু সাধারণ ইস্যুতে আমাদের মিল আছে—সংস্কার, দুর্নীতি দমন, সুশাসন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আধিপত্যবাদের বিরোধিতা।’

জোটের আসন সমঝোতা অনুযায়ী এনসিপি ৩০০টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে ৩০টিতে প্রার্থী দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোট হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত পাচ্ছে ২২২টি আসন, আর বাকি আসনগুলো ভাগ হয়েছে আরো নয়টি শরিক দলের মধ্যে।

পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি, বাংলাদেশিরা একটি জাতীয় গণভোটেও অংশ নেবেন। এতে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ইউনূসের উদ্যোগে আন্দোলনের পর শুরু হওয়া ঐকমত্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রণীত সংস্কার প্যাকেজের ওপর ভোট দেওয়া হবে।

জনমত জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই প্রধান জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে: বিএনপি এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট।

গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) প্রকাশিত এক জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ দেখানো হয়, যেখানে জামায়াত খুব কাছাকাছি ২৯ শতাংশে অবস্থান করে এবং এনসিপির পক্ষে ৬ শতাংশ সমর্থনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। আরেকটি বড় জরিপ—প্রজেকশন বিডি, ন্যারাটিভ, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং জাগরণ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত—বিএনপির সমর্থন ৩৪.৭ শতাংশ এবং জামায়াতের ৩৩.৬ শতাংশ দেখায়। তারা একে পরিসংখ্যানগতভাবে ‘খুব কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বলে উল্লেখ করেছে।

এমন টানটান প্রতিযোগিতায় বিশ্লেষকদের মতে, একটি ছোট দল কৌশলগতভাবে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেটি জাতীয় ভোটের বড় অংশ জিতে নয়, বরং ভারী রাজনৈতিক বোঝা বহনকারী কোনো শরিক দলকে ভোটারদের কাছে, বিশেষ করে দোদুল্যমান ও উদারপন্থী ভোটারদের কাছে, আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করে। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সংস্কার নিয়ে দরকষাকষিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারে ওই ছোট দলটি।

‘উইন-উইন পরিস্থিতি’

গত সপ্তাহের আলজাজিরার সঙ্গে ভিডিও কলে নাহিদ ইসলামকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি জানান, সারাদিন রাস্তায় ঘুরেছেন—বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং যে এলাকাগুলো থেকে সংসদ সদস্য হতে চান, সেসব মহল্লা চষে বেড়িয়েছেন। ভোটাররা তাকে কী বলছেন, সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।

‘তখন মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল; এখনও চায়,” তিনি বলেন। ‘তারা চায় না বাংলাদেশ আগের মতো করে পরিচালিত হোক।’

তিনি আরো বলেন, মানুষ তাদের ‘প্রতিদিনের সমস্যার সমাধান’ চায় এবং চায় তাদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব।

নাহিদ ঢাকা-১১ আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—যা আগে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি ছিল এবং যার অন্তর্ভুক্ত বাড্ডা, ভাটারা ও রামপুরা এলাকা। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানেই। তবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী এম এ কায়ুম—দলের দীর্ঘদিনের নেতা এবং সাবেক স্থানীয় কমিশনার, যার এলাকায় দৃঢ় ভিত্তি রয়েছে।

তবু নাহিদ বলেন, প্রচারকালে তিনি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের সাড়া দৃশ্যমান… তারা আমাকে তাদেরই একজন হিসেবে বিশ্বাস করে। তারা যেন আমাকে নিয়ে গর্বিত… অসীম ভালোবাসা রয়েছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, বিএনপির প্রার্থীর বিপক্ষে নাহিদের পথ মোটেও সহজ নয়। তবে তার মতে, নির্বাচনের দিনে নাহিদকে এগিয়ে দিতে পারে এমন দুটি সুবিধা রয়েছে।

শাহান বলেন, ‘নাহিদ জুলাই অভ্যুত্থানের মুখ।’ তিনি আরো বলেন, বাড্ডা ও আশপাশের এলাকাগুলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল ছিল।

এছাড়া, তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলাম জামায়াতের তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তির সুবিধা পাবেন। “তার এলাকায় জামায়াতের সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে; তিনি তাদের কর্মীবাহিনী এবং পূর্ণ ভোটব্যাংকের সমর্থন পাচ্ছেন।”

তবে সমর্থকদের মতে, এই প্রচারণা শুধু নাহিদকে ঘিরে নয়। এটি আরো বড় প্রশ্ন—অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে গড়ে ওঠা একটি দল প্রথমবারের মতো নির্বাচনী বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকতে পারবে কি না, এবং তাদের কৌশলগত জোট তাদের রক্ষা করবে, নাকি গ্রাস করবে।

নাহিদ বলেন, জামায়াতের সঙ্গে অংশীদারত্ব মূলত এনসিপির সাংগঠনিক দুর্বলতার ওপর একটি বাস্তবসম্মত সেতুবন্ধন।

তিনি বলেন, ‘এই একত্র হওয়া মূলত নির্বাচনের জন্য, আসনভিত্তিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ।’ তার যুক্তি, এনসিপি ‘অল্প সময়ের মধ্যে … নির্বাচনি রাজনীতির জন্য প্রস্তুত ছিল না, এবং একটি অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করা ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার মূল্য।

তিনি বলেন, ‘একাই যদি করা যেত,তবে সেটাই হতো সবচেয়ে ভালো, যেহেতু তা সম্ভব ছিল না, আমরা মনে করি জোট সবার জন্যই ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।’

নাহিদ বলেন, এর বিনিময়ে, এনসিপি পাচ্ছে নির্বাচনি অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক সহায়তা এবং জামায়াতের ভোটব্যাংকে প্রবেশাধিকার; আর জামায়াত উপকৃত হচ্ছে এনসিপির জনসমর্থন থেকে। তিনি বলেন, জামায়াতের যে ভোটব্যাংক আছে, তা এনসিপির সঙ্গে ভাগাভাগি হচ্ছে, এবং এনসিপির ভোটও জামায়াত পাবে।’

তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, ১১-দলীয় এই জোটের ফলে জোটের জন-চরিত্র বদলে গেছে; যা আগে তুলনামূলকভাবে প্রকাশ্য ইসলামপন্থী জোট ছিল, তা এখন বিস্তৃত হয়েছে।

নাহিদ বলেন, ‘আগে এই জোট পুরোপুরি একটি ইসলামি জোট ছিল, কিন্তু এখন এটি পুরোপুরি ইসলামি ব্লক নয়। এখানে ইসলামপন্থীদের পাশাপাশি তরুণ ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক শক্তি কিছু অভিন্ন বিষয়ে একত্র হয়েছে।’

তবে সমালোচকদের কাছে, বিষয়টি ঠিক এখানেই—এবং এখানেই নিহিত রয়েছে তাদের আশঙ্কা।

‘তারা ট্রফির সমতুল্য’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজকর্মী সামিনা লুৎফা বলেন, জামায়াত–এনসিপি সমঝোতাকে তিনি পারস্পরিকভাবে লাভজনক হিসেবে দেখেন না।

তিনি বলেন, ‘এতে জামায়াত এগিয়ে যায়, কিন্তু এনসিপি ততটা লাভবান হয় না। তিনি আরো বলেন, ‘আন্দোলনের সামনের সারির মুখগুলোকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে জামায়াত পুরো অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব দাবি করছে—এতে জামায়াতেরই লাভ হচ্ছে, এনসিপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটি এমন একটি ধারণা বিক্রি করার চেষ্টা যে কেবল তারাই জুলাই আন্দোলনের মালিক। কিন্তু এটি জামায়াত বা নাহিদ ইসলামের আন্দোলন ছিল না। হাজারো সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল এবং রক্ত দিয়েছিল।’

লুৎফার মতে, নাহিদ যখন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের পাশে বসেন, তখন তা জামায়াতকে বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা দেয়। ‘কিন্তু তিনি যোগ করেন, এটি এনসিপির জন্য বা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে না। কেননা তারা হচ্ছে ট্রফি।

লুৎফা আরো বলেন, এনসিপির পরিচয় এখনো অনেকাংশে “প্রতিক্রিয়াশীল”—একটি সুসংহত কর্মসূচির চেয়ে বরং “ঘটনা ও ক্ষমতার কৌশলের তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়ায়” গড়ে উঠেছে। “মানুষ এখন আর বুঝতে পারছে না তাদের ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছিল,” তিনি বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক শাহানও অনুরূপ যুক্তি দেন, তবে তিনি বিষয়টি দেখেন নির্বাচনি অঙ্কের দৃষ্টিকোণ থেকে।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জরিপ থেকে আমার ধারণা, সারা দেশে এনসিপির ভোট ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে, সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হতে পারে।’ তবে এক বছরেরও কম সময় আগে গড়ে ওঠা একটি দলের জন্য এটিকে তিনি “একেবারে কম নয়” বলেও মন্তব্য করেন।

কিন্তু তার মতে, এনসিপির সঙ্গে জোট করার ক্ষেত্রে জামায়াতের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: নিজেদের ভাবমূর্তি নরম করা এবং অভ্যুত্থানের ‘পূর্ণ ব্র্যান্ড ভ্যালু দাবি করা। কারণ জামায়াতের অনেক কর্মী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও “সামনের সারির সব মুখই এনসিপিতে।”

শাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের ‘সংস্কারপন্থী শক্তি, যারা জুলাইয়ের মালিক’ হিসেবে তুলে ধরছে; আর তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে দেখাচ্ছে “সংস্কারবিরোধী” হিসেবে।

বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই জাতীয় সনদ গণভোট নিয়ে বিএনপি দীর্ঘদিন সংশয়ী ছিল, কখনো কখনো ‘না’ ভোটের ইঙ্গিতও দিয়েছিল। পরে ৩০ জানুয়ারি দলটির প্রধান তারেক রহমান প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থন জানান।

নাহিদ আলজাজিরাকে বলেন, তার দল বিএনপির সঙ্গেও জোটের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছিল, কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘সংস্কার ইস্যুতে আমরা বিএনপিকে ততটা আন্তরিক পাইনি, আর আসন ভাগাভাগির বিষয়ও ছিল।’

জামায়াতের সামাজিক অবস্থান ও দ্বিধা

জামায়াত–এনসিপি অংশীদারত্ব সবচেয়ে সরাসরি ধাক্কা খায় নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে।

যদিও খালেদা জিয়া তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার সময় বিএনপির সঙ্গে জোটে জামায়াত ছিল অংশীদার এবং অতীতে তারা নারী নেত্রীদের সঙ্গেও কাজ করেছে।

তবে সম্প্রতি আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলের আমির শফিকুর রহমানকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো নারী কি দলটির নেতৃত্ব দিতে পারেন?

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে স্বতন্ত্র প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ সন্তান ধারণ বা স্তন্যদান করতে পারে না। শারীরিক কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যা অস্বীকার করা যায় না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন তিনি কীভাবে এসব দায়িত্ব পালন করবেন? তা সম্ভব নয়।’

এর জবাবে নাহিদ আলজাজিরাকে বলেন, ‘এটি জামায়াতের দলীয় অবস্থান, আমাদের জোটের অবস্থান নয়।’

সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে নাহিদ আরো দাবি করেন, এনসিপির কাঠামো ঐতিহ্যবাহী মূলধারার দলগুলোর তুলনায় নারীনেতৃত্বের জন্য বেশি উন্মুক্ত।

তিনি বলেন, ‘এনসিপিতে কোনো নারীর সর্বোচ্চ দলীয় পদে আসার সুযোগ সবচেয়ে বেশি।’ তার যুক্তি, পুরোনো দলগুলোতে নারীরা ঐতিহাসিকভাবে পারিবারিক বংশানুক্রমের সূত্রে নেতৃত্বে এসেছেন—যা অনিবার্যভাবে ইঙ্গিত করে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা এবং জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার দিকে।

রোববার ঢাকার এক সমাবেশে জামায়াতের শফিকুর রহমান বলেছেন, তাদের জোট সরকার গঠন করলে নাহিদকে ‘নিশ্চিতভাবেই’ মন্ত্রী করা হবে।

আর নাহিদ বলেন, কিছু সীমারেখা আছে যা এনসিপি অতিক্রম করবে না। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু ইস্যুতে আমাদের মূল অবস্থান যদি ক্ষুণ্ন হয়,তাহলে জোট টিকবে না।

নাহিদ বলেন, ‘জোট সরকার গঠিত হলে কোনো একক দলের আদর্শ দিয়ে নীতিনির্ধারণ হবে না; বরং শরিক দলগুলোর ঐক্যের ভিত্তিতে কাজ হবে।’

‘ভালো ছেলে’, কিন্তু শক্তিশালী নেতা?

নাহিদ ইসলাম বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভেতরে তার সংক্ষিপ্ত সময় তাকে ক্ষমতার বাস্তবতা সম্পর্কে সব ধরনের বিভ্রম থেকে মুক্ত করেছে।

তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সংস্কার গণভোট প্রক্রিয়া শুরু করার কৃতিত্ব দেন, তবে ব্যর্থতার সমালোচনাও করেন। তার ভাষায়, সরকার “অর্থনীতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও জনআকাঙ্ক্ষা সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে।”

সরকারে থাকার সময় তিনি যে বাধার মুখে পড়েছিলেন, তা শুধু বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং প্রতিদিনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধেও ছিল বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম, সংবিধান পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম… বড় বড় বিষয়, আবার আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের মতো ছোট বিষয়েও অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি ।’

সরকারি কাঠামো নিয়ে তার হতাশা এতটাই ছিল যে, একসময় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ক্ষমতায় থাকার চেয়ে রাজপথে থাকা বেশি কার্যকর হতে পারে। এখন তিনি বলেন, সেটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল। তার মতে, শাসনক্ষমতায় থাকলেই দলগুলো অর্থবহভাবে দেশের জন্য কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করে।’

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, ক্ষমতায় থাকলে কাজ করা সহজ হয়। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে পাঁচ বছরে অনেক কিছু করা সম্ভব।’

নাহিদের সবচেয়ে কঠোর ভাষা সংরক্ষিত থাকে দুটি ইস্যুর জন্য: ভারত এবং আওয়ামী লীগ।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, এবং এখন পর্যন্ত ভারত তাকে প্রত্যর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তবে নাহিদ মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তা হওয়া উচিত জাতীয় মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। তিনি অভিযোগের তালিকাও তুলে ধরেন: “সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন বিরোধ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।”

তিনি বলেন, ‘ভারতকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে হবে । হাসিনা আমলের মতো উষ্ণ সম্পর্ক এই প্রজন্ম মেনে নেবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আওয়ামী লীগ—যা আসন্ন নির্বাচনে নিষিদ্ধ—নিয়ে তার অবস্থান আরও অনড়।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই। তবে দলটির সমর্থকদের জন্য তিনি পুনর্মিলন ও নাগরিক অধিকার চান, কিন্তু আওয়ামী লীগের ব্যানারে নয়।

কখনো কখনো তার দলের সদস্যরা শান্তস্বভাবের নাহিদকে ‘গণতন্ত্রের ইমাম’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রবীণ সাংবাদিক ও ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ কিছু জনপরিচিত ব্যক্তিত্বও তাকে একদিন এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে তার সেই আভা নির্বাচনী বাস্তবতার পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে কি না।

নাহিদ নিজে ১০ বছরের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এক দশকের মধ্যে যদি এনসিপি সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তবে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।

এখন আলজাজিরারসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, তবে এটিকে তিনি ‘একটি লক্ষ্য এবং চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেন—যা তার মতে, এনসিপির জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হওয়া উচিত।