সম্প্রতি জনতা ব্যাংক থেকে ২২ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ সুবিধা পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সহোদর ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন। এ বিষয়ে গত শনিবার ‘অস্বাভাবিক গতিতে আবেদন নিষ্পত্তি/মির্জা ফখরুলের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে ২২ কোটি টাকা মওকুফ জনতা ব্যাংকের’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, মির্জা ফয়সল আমিন ঋণ মওকুফের এই সুবিধা পাওয়ার জন্য মূল ঋণ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এই টাকা পরিশোধের আগে এক দিনে তিন জেলার তিন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা এসেছে মির্জা ফয়সালের অ্যাকাউন্টে। জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি এসব টাকা নেন নিজ মালিকানাধীন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে। আর এ টাকা থেকে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ নবায়ন ও সুদ মওকুফ সুবিধা নিতে এককালীন জমা করা হয়েছে।
তিন জেলায় অবস্থিত টাকা পাঠানো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— ঠাকুরগাঁওয়ের সামিহা অটো রাইস মিল, নারায়ণগঞ্জের ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও রংপুরের এরিস্ট্রোকেট অ্যাগ্রো লিমিটেড। এ ছাড়া মেহেদি ও সবুজ নামে অজ্ঞাত দুজন অ্যাকাউন্টটিতে ২০ লাখ ও ১৮ লাখ টাকা জমা করেন।
এসব লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা জমা হয়েছে, তাদের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এক দিনে (৯ নভেম্বর) তিন ব্যবসায়ী গ্রুপ নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চলতি অ্যাকাউন্টে এক কোটি ৫২ লাখ টাকা জমা করে। এর মধ্যে সামিহা অটো রাইস মিল জমা করে ৩০ লাখ টাকা। এর মালিক ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আ. সামাদ। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি।
একই দিন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে ৭২ লাখ টাকা জমা করে ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এটি নারায়ণগঞ্জের ডিআর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন শীর্ষস্থানীয় মেঘনা গ্রুপ এটি পরিচালনা করে। এ ছাড়াও এদিন রংপুরের এরিস্ট্রোকেট অ্যাগ্রো লিমিটেড জমা করে ৫০ লাখ টাকা। এটি দ্য এরিস্ট্রোকেট গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান, অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের একটি।
পরদিন ১০ নভেম্বর নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে জনৈক মেহেদি ২০ লাখ টাকা জমা করেন। ব্যাংকটির গুলশান শাখার মাধ্যমে তিনি এ টাকা জমা দেন। পরে ১২ নভেম্বর আরেক জনৈক ব্যক্তি সবুজ ঠাকুরগাঁও শাখার মাধ্যমে জমা দেন ১৮ লাখ টাকা। একই দিন অ্যাকাউন্টটিতে ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ জমা দেয় আরও ১২ লাখ টাকা।
বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারখানা বন্ধ থাকায় এ দীর্ঘ সময় জনতা ব্যাংকের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর কোনো লেনদেন হয়নি। কিন্তু গত বছরের ৯ নভেম্বর সুদ মওকুফের প্রথম আবেদন জমা দেন মির্জা ফয়সাল আমিন। সেদিন থেকেই কয়েক দফায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৯ নভেম্বরে প্রথম আবেদন জমার দিনে দুটি আলাদা কিস্তিতে ৫৬ লাখ ও ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে পরিশোধ করা হয় আরও ৫০ লাখ টাকা। এরপর ২৭ নভেম্বর ঋণ মওকুফের জন্য দ্বিতীয় আবেদন করেন মির্জা ফয়সাল।
নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠান চেনেন না জানিয়ে সামিহা অটো রাইস মিলের মালিক আ. সামাদ বলেন, কীসের এগ্রো, কী এটা, কোথায় সেটা? আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, মির্জা ফয়সাল আমিন কিংবা তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই, তাকে কোনো টাকা পাঠাইনি।
কথার এক পর্যায়ে এশিয়া পোস্টের কাছে আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ আছে জানালে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেন তিনি ।
এ বিষয়ে জানতে মির্জা ফয়সাল আমিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি।
পরে তার পিএস মো. সবুজের মোবাইল ফোনে কল করা হলে এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্যার (মির্জা ফয়সাল আমিন) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত। এখন কথা বলা সম্ভব না।
এশিয়া পোস্ট