Image description

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের প্রভাব কমে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর বিপরীতে, চীন দ্রুততার সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়ে ঢাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টায় চীনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে ভারত।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জাপানভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘দ্যা জাপান টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং প্রত্যর্পণ না করাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যস্থান পূরণে দ্রুত এগিয়ে এসেছে চীন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল বেইজিংয়ে, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়, যার আওতায় ভারতের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ড্রোন উৎপাদন স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলান্টজিক বলেন, বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর-কেন্দ্রিক চীনের কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। তার মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এদিকে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আশ্রয় ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রকাশ্য বক্তব্যের লড়াই চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ঢাকার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অতিরঞ্জিত বলে দাবি করা হয়েছে।

এর মধ্যেও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা সফর করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার ছেলে বর্তমান বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের প্রতি সমবেদনা জানান। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত।

তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এর জেরে ভারত আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।

অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছে বাংলাদেশ। এক দশকের বেশি সময় পর জানুয়ারিতে ঢাকা-ইসলামাবাদ সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়েছে।

বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে—ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবারও স্থিতিশীল হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখনো সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার সুযোগ দেয় না। বাংলাদেশ ভারতের বিদ্যুৎ ও গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, আবার ভারতও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রাভীন দোন্থির মতে, চীন বাংলাদেশের জন্য বড় অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহায়তা দিতে পারছে, যা ভারত সহজে দিতে পারছে না। তবে ভারত এমন কিছু বাস্তব সুবিধা দেয়, যা বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন করে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যদি স্থিতিশীল ও বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় চীনের দ্রুত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারত যে চাপে পড়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন শেষে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীনের উত্থান ও ভারতের প্রভাব ধরে রাখার লড়াই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে—যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ঢাকা।