আবূসামীহা সিরাজুল-ইসলাম
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম নাগরিকের রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের আহ্বানটি কেবল একটি ধর্মনিরপেক্ষ দায়িত্ব নয়; এটি ঈমানের এক গভীর প্রকাশ। ভোটদান এবং নাগরিক জীবনে সক্রিয়তা হলো ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ – ভালো কাজের আদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
এই প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সক্রিয় নাগরিকত্ব এবং ভোটদানের ইসলামি দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
ভোটের ফিকাহ: মাসলাহা (জনস্বার্থ) এবং মাফাসিদ (ক্ষতি) পরিমাপ
একজন সচেতন মুসলিম নাগরিকের প্রথম পদক্ষেপ হলো গণতন্ত্রের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকাহ) বোঝা। যদিও কিছু আলেম কঠোরভাবে মনে করেন যে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ ‘হাকিমিয়াহ’ (সার্বভৌমত্ব) কেবল আল্লাহর—এই নীতির লঙ্ঘন করে, তবে সমসাময়িক মূলধারার আলেমদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হলো—বিশেষ করে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে—অংশগ্রহণ অনুমোদিত এবং প্রায়শই বাধ্যতামূলক।
এই বাস্তবিক সিদ্ধান্তটি জনস্বার্থ (মাসলাহা) রক্ষার সর্বোচ্চ আইনি নীতির ওপর ভিত্তি করে এবং বৃহত্তর ক্ষতি (মাফাসিদ) রোধের প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে।
মাসলাহা (Maslaha): জনস্বার্থের সংরক্ষণ
মাসলাহা বা জনস্বার্থকে ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর শাব্দিক অর্থ হলো কল্যাণ, ভালো বা সুবিধা, আর পারিভাষিক অর্থে এটি এমন কাজকে বোঝায় যা জনগণের জন্য উপকারী ফলাফল নিয়ে আসে এবং তাদের ওপর থেকে ক্ষতি দূর করে।
ʿউলামাদের মতে ইসলামি আইন (শরীয়ত) মূলত পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদ আশ-শরীʿআহ) পূরণের জন্য এসেছে। এগুলো হল: ধর্মের সুরক্ষা (হিফজুদ্দীন), জীবনের সুরক্ষা (হিফজুন-নফস), বুদ্ধির সুরক্ষা (হিফজুল-ʿআকল), বংশের সুরক্ষা (হিফজুন-নসল), ও সম্পদের সুরক্ষা (হিফজুল-মাল)।
নির্বাচনে মাসলাহার প্রয়োগ:
নির্বাচনে ভোট দেওয়া মাসলাহা মুরসালা (অনির্দিষ্ট জনস্বার্থ)-এর একটি ক্ষেত্র। এর অর্থ হলো, ভোটদান এমন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে সরাসরি শরীয়ত কর্তৃক আদেশ না থাকা সত্ত্বেও, উপরে উল্লেখিত মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো নিশ্চিত করা যায়।
- ক্ষতি কমানো (দরউল মাফাসিদ): রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে দুষ্ট ও অযোগ্য লোকরাই ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে, যা বৃহত্তর সামাজিক ক্ষতি (যেমন দুর্নীতি, জুলুম) নিয়ে আসে। ভোট দিয়ে 'দুই খারাপের মধ্যে কম খারাপ' কাউকে বেছে নেওয়া হলো বৃহত্তর ক্ষতি রোধে মাসলাহার ব্যবহার।
- কল্যাণ নিশ্চিত করা (জলবুল মাসালিহ): ভোটদানের মাধ্যমে এমন নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনা যায়, যারা দুর্নীতি দমন করবে, সকল নাগরিকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং জনকল্যাণমূলক নীতি প্রণয়ন করবে। এটি সরাসরি কোরআনের নির্দেশ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অটল থাকো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা নিসা ৪:১৩৫)।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিস্থিতিতে, যেখানে নির্বাচন বর্জন করার আহ্বান আসে, সেখানে ইসলামি বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার নয়, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়, বিশেষ করে যখন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্যাচনের মোটামুটি একটা নিশ্চয়তা আছে। ভোট দেওয়া হলো নাগরিকত্বের আমানত রক্ষা করা এবং জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম নেতৃত্ব নির্বাচন করা।
আমানত (Amanah): নেতৃত্বের বিশ্বস্ততা
ভোটের ক্ষেত্রে ইসলামি ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে আমানত (Trust or Reliability)। নেতৃত্ব একটি আমানত যা নির্বাচিত ব্যক্তিকে জনগণের পক্ষ থেকে অর্পণ করা হয়। এই আমানতের গুরুত্ব ইসলামে অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত।
হাদিসে এসেছে, যখন আল্লাহ্র রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কিয়ামত কখন হবে, তখন তিনি বললেন, "যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করো।" জিজ্ঞেস করা হলো: "আমানত কীভাবে নষ্ট হবে?" তিনি বললেন: "যখন অযোগ্য লোককে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করো।" (সহীহ বুখারী, ৬৪৯৬)।
নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমানত:
মুসলিম ভোটারের উচিত শুধু প্রার্থীর বাহ্যিক ধার্মিকতা বা ধর্মীয় স্লোগান দেখে প্রভাবিত না হয়ে তাদের যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা, এবং সকল মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেখে মূল্যায়ন করা।
- সততা ও স্বচ্ছতা: একজন প্রার্থীকে অবশ্যই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে স্বচ্ছতা ও সততার প্রমাণ দিতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস—এগুলো আমানতের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
- দক্ষতা ও যোগ্যতা: আমানতের অংশ হিসেবে প্রার্থীর অবশ্যই দেশের অর্থনীতি, আইন প্রণয়ন, এবং প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হবে।
- জনগণের অধিকার: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমানত হলো জনগণের অধিকার রক্ষা করা। যিনি জনগণের অধিকারকে পদদলিত করেন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, অথবা জুলুম করেন, তিনি আমানতদার নন।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের মুসলিম নাগরিকের দায়িত্ব হলো, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যিনি কেবল মুসলিমদের নয়, দেশের সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সক্ষম এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ব্যালট বাক্সের বাইরে নাগরিক অংশগ্রহণ
মুসলিম নাগরিকের দায়িত্ব কেবল নির্বাচনের দিনে শুরু বা শেষ হয় না। নাগরিক অংশগ্রহণ হলো একটি ধারাবাহিক দায়িত্ব—যা বিশ্বাসকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে অনুবাদ করে। হাদিসে "জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা শ্রেষ্ঠ জিহাদ"—বলে ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য বলার গুরুত্বকে ইবাদতের স্তরে উন্নীত করা হয়েছে।
- নেতৃত্বের জবাবদিহিতা (আল-হিসবাহ): ইসলামি নীতি অনুযায়ী, নাগরিকদের কর্তৃপক্ষের কাজের ওপর নজরদারি করা এবং তা পরীক্ষা করা আবশ্যক। গণতন্ত্রে এর অর্থ হলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা, স্বচ্ছতার দাবি করা এবং আইনি উপায়ে দুর্নীতি ও অন্যায়ের সমালোচনা করা। বাংলাদেশের নাগরিকদের তাদের প্রতিনিধিদের কাজের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করা কর্তব্য।
- আদল (Justice) প্রতিষ্ঠা: ইসলামি মূল্যবোধ, যেমন তাকাফুল (পারস্পরিক সংহতি) এবং আদল (ন্যায়বিচার), সামাজিক বিষয়ে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার দাবি করে। এর মধ্যে রয়েছে অরাজনৈতিক নাগরিক সমাজ গোষ্ঠীতে যোগদান করা, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়া, এবং সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায় তা নিশ্চিত করা।
আন্তরিক নিয়ত (Niyyah)-এর সঙ্গে যখন ভোট দেওয়া হয়, আমানত রক্ষা করা ও ন্যায়বিচার (আদল) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে—তখন একটি ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক দায়িত্ব ইবাদতের (Ibadah) কাজে রূপান্তরিত হয়।
বাংলাদেশের মুসলিম ভোটারদের কাঁধে এই গুরুতর দায়িত্ব অর্পিত: এমন নেতা নির্বাচন করা যারা ন্যায়বিচার, সততা এবং জনসেবার সর্বোচ্চ ইসলামি আদর্শের মূর্ত প্রতীক এবং পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এটাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুসলিম নাগরিকের সত্যিকারের ম্যান্ডেট।