Image description
 

বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংসদ বহাল না থাকায় আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের কে শপথ পাঠ করাবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা (এমপি) সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কাছে শপথ নিলেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতির কারণে এবার তা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, এবার নির্বাচিত নতুন সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি হিসেবে প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতে পারেন। এ ছাড়া নির্বাচিত হওয়ার তিন দিন পার হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ পড়াতে পারেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অন্যদিকে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াতে পারবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। গতকাল নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কার্যত শূন্য থাকায় সংবিধানের বিশেষ ধারা অনুযায়ী সিইসিই শপথ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে নতুন সংসদ ও সরকার গঠন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল জানিয়েছেন, সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর (হ্যান্ডওভার) হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তিন দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তা হতে পারে। আমার মনে হয় না এটি ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির বেশি সময় নেবে।

গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। তার আগে আগস্ট মাসে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হন।

 

গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নতুন যারা সংসদ সদস্য হবেন, তাদের শপথ গ্রহণ করানোর কথা হচ্ছে স্পিকারের। স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকারের। তারা না থাকলে অন্য বিধানও আছে। এখন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের মধ্যে একজন নিখোঁজ, আরেকজন কারাগারে আছেন। আইন উপদেষ্টা বলেন, তাদের (স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার) বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু মামলা আছে এবং তারা পদত্যাগও করেছেন, বিশেষ করে স্পিকার। ফলে এই অবস্থায় তাদের দিয়ে শপথ গ্রহণ করার কোনো রকম সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করেন না। আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমাদের আইনে আছে উনারা (স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার) যদি শপথ গ্রহণ করাতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত অর্থাৎ প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাবেন। দুই হচ্ছে, তিন দিনের মধ্যে যদি এই শপথ না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ গ্রহণ করাতে পারবেন।’

 
 

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন এটা (নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ) সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এখন আপনাদের চূড়ান্ত কিছু বলতে পারব না। তবে আমাদের সামনে দুটি অপশন আছে। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’

 

এখন বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের সঙ্গে আলোচনা হবে জানিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, তার (জ্যেষ্ঠ সচিব) সঙ্গে কথা বলা হবে, আইন দেখা হবে। তারপর চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টাকে অভিমত জানানো হবে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমান মাছউদ স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কার্যত শূন্য থাকায় সংবিধানের বিশেষ ধারা অনুযায়ী সিইসিই শপথ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করবেন।

সংবিধানের ১৪৮(১) ও ১৪৮(২) অনুচ্ছেদে স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর কথা বলা হলেও, বর্তমান অবস্থায় প্রযোজ্য হচ্ছে ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ। এতে বলা আছে, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত কেউ শপথ পড়াতে না পারলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাতে পারবেন। এ ছাড়া সংবিধানের তপশিল-৩ অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই দায়িত্বে না থাকলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়ানোর ক্ষমতা রাখেন।

‘ক্ষমতা হস্তান্তর’: নতুন সংসদ ও সরকার গঠন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, এমপিরা শপথ নেওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত পরবর্তী সরকারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ভূমিকা থাকবে না। নির্বাচনের পরপরই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর তাদের প্রতিনিধির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশে আগে নাটক করে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং) ঘটানো হতো, এখন তেমন একটি ঘটনাও ঘটছে না। যারা অতীতে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে এবং বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। আমাদের বড় একটি দায়িত্ব হলো নির্বাচনের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা।

রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একটি ভালো সংস্কারের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘জুলাই চার্টার’ তৈরি করা হয়েছে। জুলাই চার্টার এখন গণভোটে (রেফারেন্ডাম) এসেছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জনগণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর ফল জানাবে।

শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি আগে দুই-তিনজন লোকের হাতে কুক্ষিগত ছিল। সেখানে এখন একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আমাদের মেয়াদ যখন শেষ হয়ে আসবে, অর্থাৎ সরকার ছাড়ার আগ মুহূর্তে উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন।