আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (৪ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় একটি হোটেলে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
জামায়াতে ২৬ দফা ইশতেহার হলো-
১. ‘জাতীয় স্বার্থ আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন,
২. বৈষম্যহীন, দায় ও ইনসাফহিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন,
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া,
৪ নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন,
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাখাদে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্তে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ,
৬. সকল পর্যায়ে সব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন,
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন,
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টর ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিত নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ,
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যাবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ,
১০ সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা,
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা,
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে,
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা,
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং 'তিন শূনা ডিশন' (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ' গড়া,
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি,
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা,
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা,
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়: বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা,
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রাম বিনামূলো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা,
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা,
২১. দ্রব্যমূলা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা,
২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা,
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা,
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা,
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন মেনুফেস্টোতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাঁচটি মূল নীতিকে ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে—সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে দলটি স্পষ্টভাবে ‘না’ বলেছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যার বিরুদ্ধে।
মেনুফেস্টোতে বলা হয়, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সর্বস্তরে সততা নিশ্চিত করা হবে এবং দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দলটির মতে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাই এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, বিভাজন ও আধিপত্যবাদী রাজনীতির পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে তারা কাজ করবে। ফ্যাসিবাদী শাসন ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মেনুফেস্টোতে বলা হয়েছে, আইনের শাসন ও মানবিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে সমাজে বৈষম্য কমানো হবে। বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরির কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত জানিয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হবে। তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত মেনুফেস্টোতে ‘হ্যাঁ’ বলা হয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে; আর স্পষ্টভাবে ‘না’ জানানো হয়েছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী অনুশীলনে।
তাছাড়া আটটি ভাগে বিভক্ত এই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম পৃষ্ঠায় পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে জুলাই বিপ্লবের শহীদ আবু সাঈদ, শরীফ ওসমান বিন হাদি (ওসমান হাদি) এবং আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের শহীদ বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ছবি।
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে দেখা গেছে, আটটি ভাগে বিভক্ত ইশতেহারের প্রথম অংশের নাম দেওয়া হয়েছে— ‘জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ’।
এতে আরও ১০টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো-
১. শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, ২. রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, ৩. কার্যকর জাতীয় সংসদ, ৪. নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, ৫. সুশাসন নিশ্চিতে জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন, ৬. স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, ৭. দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, ৮. স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়ন, ৯. আইন ও বিচারব্যবস্থা এবং ১০. তথ্য ও গণমাধ্যম।
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত নির্বাচন মেনিফেস্টোতে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছে। দলটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও নীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।
মেনিফেস্টো অনুযায়ী, বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি নাগরিকদের মর্যাদা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জামায়াত পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী ও নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথাও মেনিফেস্টোতে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরদারের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলোতে শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসংক্রান্ত ইস্যুতে সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। সার্ক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংস্থায় বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় এই সংকটের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তারা কাজ করবে। এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বৈধ ও স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথাও মেনিফেস্টোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি, ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টেকসই হতে পারে না—এই দর্শনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা নীতি তুলে ধরেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও আধুনিক যুদ্ধ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
ইশতেহার অনুযায়ী, জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে দেশের সকল প্রতিরক্ষা অংশীজনের সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করা হবে। এই নীতির আলোকে বিদ্যমান ভিশন ২০৩০ আধুনিকায়ন করে ভিশন ২০৪০ নামে একটি নতুন সামরিক ডকট্রিন তৈরি করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি জাতীয় সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অর্জন, দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং কৌশলগত আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে গবেষণা ও সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
জামায়াতের ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিকাশে প্রতিরক্ষা বাজেট পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—২০৪০ সালের মধ্যে দেশের প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা।
রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নিরাপত্তা জোরদারে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের কথাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে ধাপে ধাপে সেনাসদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণ সমাজকে শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের জন্য ৬ থেকে ১২ মাসের স্বেচ্ছাসেবী সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া সীমান্তে মাদক চোরাচালানসহ সব ধরনের অবৈধ ও অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের মতে, এই প্রতিরক্ষা নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, নিরাপদ ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিতকরণকে কেন্দ্রে রেখে জামায়াত তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ওঠানামার প্রভাব কমাতে দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ইশতেহারের মূল প্রস্তাবনাগুলো অনুযায়ী:
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও সম্প্রসারণ: আমদানি-নির্ভরতা কমাতে অনশোর ও অফশোর উভয় ক্ষেত্রেই দ্রুত এবং স্বচ্ছ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো: পিডিবির সক্ষমতা বাড়িয়ে সিস্টেম লস হ্রাস ও বিদ্যুতের দাম কমানো হবে।
সৌর বিদ্যুতের দিকে দ্রুত রূপান্তর: ২০৩০ সালের মধ্যে বড় সোলার পার্ক নির্মাণ, ছাদের উপর সোলার প্যানেল প্রণোদনা এবং নেট মিটারিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দশগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিকল্প: এলপিজি ও এলএনজি ব্যবহার বাড়িয়ে এগুলিকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানির বিকল্প হিসেবে উন্নীত করা হবে।
পরমাণু শক্তি ব্যবহার: আন্তর্জাতিক আইন মেনে পরমাণু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে।
কোয়লার ব্যবহার সীমিতকরণ: পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশের কয়লার ব্যবহার সীমিত করা হবে এবং বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (BERC) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
দুর্নীতি ও অপচয় হ্রাস: কুইক রেন্টালসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সকল স্তরে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা হবে।
দেশীয় তেল শোধনাগার: দক্ষ ও উন্নত তেল শোধনাগার স্থাপন করে জ্বালানির দাম কমানো এবং স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করা হবে।
জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত করবে।
বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশকে ২০তম স্থানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার পাঠ করেন। ১৩তম জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত এই ইশতেহারের শিরোনাম— ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করে ধাপে ধাপে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও পদ্ধতিগত জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ইনভেস্টমেন্ট বন্ড মার্কেট গঠনের পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
রাজস্ব খাতে সংস্কারের মাধ্যমে করের আওতা সম্প্রসারণ করে রাজস্ব আহরণ জিডিপির ১৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর কথা বলা হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগসহ মোট ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং বাজেট ঘাটতি কোনোভাবেই জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করবে না—এমন অঙ্গীকারও রয়েছে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা সহজ করতে করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। করপোরেট কর পর্যায়ক্রমে ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে বর্ধিত রাজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, গৃহায়ণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো ও পরিবহন খাতে ব্যয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতা দূর করে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে একটি আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আস্থাহীনতা দূর করে বাজারকে গতিশীল করা এবং শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে জামায়াত।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে অ্যাডভান্সড টেক্সটাইল, চামড়া, পাট, ফ্রিল্যান্সিংসহ আইটি সার্ভিস এবং এগ্রো-প্রসেসিং খাত আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পাশাপাশি অলাভজনক শিল্পের পরিবর্তে নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করে রেমিট্যান্স আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে Employment and Entrepreneur Ecosystem গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক জেলায় জেলা কর্মসংস্থান অফিস এবং মহানগর ও থানায় স্থানীয় কর্মসংস্থান অফিস স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য ভাতা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো ও এমপ্লয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স চালু, এসএমই খাতে বিশেষ প্রণোদনা, সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন, ইসলামী ব্যাংক ও বীমা খাতের বিকাশ, কমার্শিয়াল কোর্ট স্থাপন এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কারের কথাও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলেন, এই ইশতেহার বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও টেকসই অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে।
বিদেশে প্রতি বছর ৫০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে দলটি জানায়, বিদেশে গমনেচ্ছু বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মবাজার অনুসন্ধান, প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কম খরচে বিদেশ যাত্রার জন্য আন্তঃসরকার চুক্তি করবে। পাশাপাশি আগ্রহী প্রার্থীদের সহায়তা প্রদান এবং সহজ পদ্ধতিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া ইশতেহারে দেশের প্রতিটি জেলায় দক্ষতা উন্নয়নের জন্য হিউম্যান স্কিল ডেভেলপমেন্ট জোন (এসডিজেড) গঠনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি শিল্পখাতে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদেশি রেমিট্যান্স বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করেছে।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবেদন ফি বাতিল, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে শ্রম আইন সংস্কারের কথাও ইশতেহারে রয়েছে।
দলটি বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও যুবসমাজের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার আশা ব্যক্ত করেছে।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবেদন ফি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের ১৮ নম্বর দফার আওতায় শ্রম ও কর্মসংস্থান খাতসংক্রান্ত ঘোষণায় এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে জামায়াতে ইসলামী জানায়, সরকারি চাকরির আবেদনে ফি নেওয়ার ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হন। এ বৈষম্য দূর করতে আবেদন ফি বাতিল করা হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করা হবে।
এছাড়া বেকারত্ব দূর করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে দেশের প্রতিটি জেলায় হিউম্যান স্কিল ডেভেলপমেন্ট জোন (SDZ) গঠনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
ইশতেহারে নতুন শিল্প স্থাপন, অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ এবং দেশীয় শিল্প বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, গিগ ইকোনমি ও অনলাইনভিত্তিক কাজের সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে দলটি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অধিকার রক্ষায় শ্রম আইন সংস্কারের কথাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী আরও জানায়, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে শ্রমখাতে স্থিতিশীলতা আনা হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে সহায়ক হিসেবে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান ডেটাবেস ও ওয়েবভিত্তিক ড্যাশবোর্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দলটির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক শ্রমবাজার গড়ে উঠবে।
জামায়াতে ইসলামী আগামী পাঁচ বছরে দেশের রপ্তানি ও বাণিজ্য খাতকে শক্তিশালী করতে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর জন্য একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈচিত্র্যময়, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা হবে।
ইশতেহারে বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে পাঁচটি মূল উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো-
১. রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উন্নয়ন: পাঁচ বছরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গার্মেন্টস ছাড়াও চামড়া, পাটশিল্প, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
২. বাণিজ্য নীতিমালা সংস্কার ও আধুনিকায়ন: পাঁচ বছরে বিশ্বমানের আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৩. ই-কমার্স ও ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামো: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্রডব্যান্ড ও 5G নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে। ২১টি চ্যানেলের নগদবিহীন (cashless) লেনদেনের সুযোগ বৃদ্ধি করে মোবাইল ও ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে।
৪. ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা ও ন্যায্য বাণিজ্য: ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য ভোক্তা ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে প্রতারক ব্যবসায়ীদের দ্রুত বিচার ও দণ্ড নিশ্চিত করা হবে।
৫. আমদানির বিকল্প ও দেশীয় উৎপাদন: প্রধান আমদানিজাত পণ্যের ওপর নির্ভরতা ৩০ শতাংশ হ্রাস করে দেশীয় উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করা হবে।
সরকারি চাকরিতে দক্ষতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্যাডারের জন্য পৃথক নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামী। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের ১৮ নম্বর দফার আওতায় এই পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে দলের পক্ষ থেকে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। ১৩তম জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত ইশতেহারের শিরোনাম—“একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার”।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, একক পরীক্ষার মাধ্যমে সব ক্যাডারে নিয়োগ দিলে সংশ্লিষ্ট পদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তাই প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আলাদা ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগ পরীক্ষা চালু করা হবে, যাতে যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিশ্চিতভাবে নিয়োগ পায়।
এর পাশাপাশি, সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করা এবং আর্থিক বাধা দূর করে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দলটি বেকারত্ব দূর করতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। এর জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় হিউম্যান স্কিল ডেভেলপমেন্ট জোন (এসডিজেড) গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নতুন শিল্প স্থাপন ও অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং ও গিগ ইকোনমি খাতে তরুণদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার রক্ষায় শ্রম আইন সংস্কার করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
জামায়াতের মতে, ক্যাডারভিত্তিক পৃথক নিয়োগ পরীক্ষাসহ এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিতে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারের পঁচিশতম পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ রাখা হয়েছে, যা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ইশতেহার অনুযায়ী, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এছাড়া স্নাতক পর্যায়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে ইডেন মহিলা কলেজ, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্তি চুক্তি করে শিক্ষার্থীদের ঝামেলাহীনভাবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাদরাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে কারিকুলাম আধুনিকায়ন, কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, যোগ্য ইসলামী স্কলার তৈরির জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা, এবং ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
কওমি শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে কওমি শিক্ষার নিজস্ব কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে সিলেবাস পরিমার্জন ও শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা হবে। অন্যান্য ধর্মীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা শিক্ষাবৃত্তি ও সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হবে।
শুধু শিক্ষার মান নয়, চাকরির প্রস্তুতির বিষয়েও নজর দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, আরবি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষা বিনামূল্যে শেখার সুযোগ দেওয়া হবে। চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি রোধ ও স্বচ্ছতা