কথায় বলে, সব ভালো তার, শেষ ভালো যার। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এটা খুবই প্রযোজ্য। কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পরাপারে চলে গেলেও ইতিহাস এবং মানুষের হৃদয়ে তিনি থাকবেন জীবিত, এক কিংবদন্তী হিসাবে।
আমি তিনটা ঘটনাতে মরহুমার কিছু মূল্যায়ন তুলে ধরবো:
১.
১৯৯১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় আমি যশোর বোর্ডের মানবিক বিভাগের সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। সেই সময় খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আমার স্কুল চৌগাছা শাহাদাৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঠিকানায় তিনি আমার জন্য পাঠালেন এক বান্ডিল বই। প্রধান শিক্ষক এ কে শফিউদ্দিন স্যার আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপহারটা আমার হাতে তুলে দেন। জ্ঞান, মেধা, শিক্ষা, বই--এগুলোর উপর খালেদা জিয়ার যে অগাধ আগ্রহ ছিলো, সেটা আমি ঐ সময়ে টের পেয়েছিলাম।
বইগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ "আমার রাজনীতি"ও ছিলো। জিয়া এবং খালেদা জিয়ার অনেক পলিসি জানারও সুযোগ হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্রদলের ক্যাডারগিরি, অস্ত্রবাজী, ছাত্র নির্যাতন, ফাও খাওয়া, হলের সীট বিজনেস সহ অনেক অপকর্মের কারণে বিএনপির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
২.
১৯৯৫ সালের প্রথম দিক। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শাহবাগ মোড়ে বিএনপির এক জনসভায় খালেদা জিয়া এলেন। ঐ দিনই উনাকে সরাসরি প্রথম দেখার সুযোগ হয়। উনার বক্তব্যে দেশ গড়ার অনেক উদ্যোগের কথায় সাথে সাথে নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরকে শাসিয়েও বেশ কিছু কথা বললেন। বুঝতে পারলাম, নিজ দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে তার মনে এক অব্যক্ত কষ্ট এবং বেদনা কাজ করছে। তিনি তাদের প্রতি তাদের কার্যকলাপে খুব একটা খুশি নন। বুঝতে আমার খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় নাই; ঢাবির দিকে তাকিয়েই মিলিয়ে ফেললাম।
৩.
২০০৩ সালের ঘটনা সম্ভবত। আমি তখন কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক। এক ঘরোয়া পরিবেশে দেখা হলো জামায়াতের এক শীর্ষ নেতার সাথে (যাকে পরবর্তীতে আওয়ামী সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে)। সেখানে জানতে পারলাম, তারেক জিয়া, বিএনপির দূর্ণীতিবাজ মন্ত্রী এবং নেতাকর্মীর জন্য খালেদা জিয়া খুবই বীতশ্রদ্ধ। একজন প্রশ্ন করলেন: এ অবস্থায় আপনারা (মানে জামায়াত) কিভাবে জোটে আছেন? জবাবে তিনি বললেন, "আমাদের অবস্থা অনেকটা শাপের মুখে চুমা দিয়ে কোন রকম শাপকে থামিয়ে রাখার মতো।"
[সম্ভবত এসব কারণেই সে সময় প্রথম আলো তারেক রহমানকে "টেন পার্সেন্ট" এবং "খাম্বা তারেক" খেতাব দেয়। সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনও দেখি একই উপাধি আরোপ করে লিখেছে। প্রথম আলো এবং টাইম ম্যাগাজিনকে আমি এজন্য নিন্দা জানাই।]
খালেদা জিয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে জামায়াত নেতা তার ইন্টিগ্রিটির অনেক প্রশংসা করলেন। "জামায়াতকে খালেদা জিয়া কিভাবে মূল্যায়ন করেন?" এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একটা ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে চার-দলীয় জোটের একটা প্রোগ্রামের ব্যাপারে খালেদা জিয়ার কিছুটা পেরেশানি এবং দুশ্চিন্তা ধরা পড়ে। এটা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে খালেদা জিয়া জামায়াত নেতাকে বলেন: "আমার পেরেশানি এবং দুশ্চিন্তার বিষয়টা আপনি বুঝবেন না, কারণ আপনারা থাকেন ফেরেশতাদের সাথে, আর আমাকে চলতে হয় শয়তানদের নিয়ে।"
জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির আন্ত:কোন্দলে এ পর্যন্ত জীবন হারিয়েছে ২৩৬ জন। ধর্ষণেও সেঞ্চুরি পার করেছে। এই ধরনের একটা বেয়াড়া, বেয়াদব, উশৃংখল, এবং দূর্ণীতিবাজ নেতা ও কর্মী বাহিনীকে বেগম খালেদা জিয়া কিভাবে ম্যানেজ করতেন, এবং তাদেরকে নিয়ে ক্ষমতায় ছিলেন, সেটা একটা বিশাল গবেষণার বিষয়।
এদেরকে ম্যানেজ করতে তারেক রহমানও আজ চরম হিমশিম খাচ্ছেন।