Image description

ডলার সংকটসহ নানা কারণে বিলাসী পণ্য হিসেবে ব্যক্তিগত নতুন কিংবা রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানি নিরুৎসাহিত করে আসছিল সরকার। আমদানি করা গড়িতে ট্যাক্স পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েক দফা। ফলে গত চার-পাঁচ বছর ধরে মন্দাভাব চলছিল গাড়ির বাজারে। অবশেষে সব প্রতিবন্ধকতা ছাড়িয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে গাড়ির বাজার। গত ছয় মাসে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরেই গাড়ি এসেছে সাত হাজারেরও বেশি। এর মধ্য থেকে ছয় হাজার ৬৫১টি ছাড় করিয়ে নিয়েছে আমদানিকারকরা। শুধু গাড়ির খাতে রাজস্ব এসেছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এত অল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ গাড়ি আমদানি ও ছাড় করানোর ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

গাড়ি ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাইক্রো, হায়েচ প্রভৃতি গাড়ি বিক্রি বেশি হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী দেশে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করবেÑএ প্রত্যাশায় ব্যক্তিগত গাড়ি কিনেছেন অনেকে। সব মিলিয়ে গত তিন-চার বছরের মন্দাভাব কাটতে শুরু করেছে।

গত মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেডের সামনে ডেলিভারির অপেক্ষায় থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ির সারি চোখে পড়ে। সেখানকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীরা জানান, গত তিন-চার মাস ধরে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি ব্যক্তিগত গাড়ি ডেলিভারি হচ্ছে। এর আগে ডেলিভারি গাড়ির সংখ্যা ছিল দৈনিক আট থেকে ১০টি। বন্দরের কার শেড থেকে গাড়ি ডেলিভারির সংখ্যা এখন ঊর্ধ্বমুখী।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের শুরুর মাসে (গত জুলাই) চট্টগ্রাম বন্দরে দিয়ে মাত্র ৪৩৯ ইউনিট গাড়ি আমদানি হয়। এক মাসের ব্যবধানে আগস্ট মাসে আমদানি করা গাড়ির সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫০৫টি। এরপর থেকে প্রতিমাসে এক হাজারের বেশি গাড়ি আসছে চট্টগ্রাম বন্দরে। সবশেষ গত ডিসেম্বসে এসেছে এক হাজার ৫৮টি গাড়ি। সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে ১৬টি বিশেষায়িত রো রো জাহাজে করে ৮৪১টি ব্র্যান্ড নিউ এবং ছয় হাজার ২২৫টি রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানি করেছেন ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, বন্দরের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো গাড়ি বন্দর জেটিতে নামার পর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারককে ডেলিভারি নিতে হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে গাড়িটি নিলামের জন্য বাই পেপার কাস্টমসকে হস্তান্তর করা হয়। আমদানিকারকরা নির্ধারিত সময়ের বাইরে গাড়ি ডেলিভারি নিতে চাইলে কাস্টমসের সঙ্গে কিছু আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অতীতে আমদানি করা গাড়ির বড় একটি অংশ নির্ধারিত সময়ের পর আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জরিমানা দিয়ে আমদানিকারকরা ছাড় করাতেন; কিন্তু গত ছয় মাসে নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারির সংখ্যা বেড়েছে। সাত হাজার গাড়ির মধ্যে মাত্র ১০৩টি নির্ধারিত সময়ের পর কাস্টমসকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের এক হাজার ২৫০টি গাড়ি ধারণক্ষমতার দুটি কার শেডে ডেলিভারির অপেক্ষায় গাড়ি রয়েছে মাত্র ৪৭১টি। অথচ কয়েক মাস আগেও ডেলিভারিতে ধীরগতির কারণে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা দেড় হাজার পেরিয়ে যেত।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ আল আমিন জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ছয় হাজার ৬৫১টি গাড়ি ছাড় করার মাধ্যমে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস রাজস্ব পেয়েছে এক হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের এ সময়ের তুলনায় সংখ্যার হিসাবে এক হাজার ৩৪টি গাড়ি বেশি ডেলিভারি হয়েছে। আগের ছয় মাসের তুলনায় এ বছর একই সময়ে ১২৪ কোটি টাকা রাজস্ব বাড়তি আদায় করা হয়েছে।

আগ্রাবাদের নিঝুম অটোমোবাইল শো-রুমের ম্যানেজার শাহনেওয়াজ জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জিপ, মাইক্রো ও হায়েচ গাড়ির বিক্রি বেড়েছে। এছাড়া গত তিন-চার মাস ধরে ব্যক্তিগত গাড়ির বিক্রিও বেড়েছে। ক্রেতারা তাদের জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেকেই বছরখানেক ধরে গাড়ি কেনেননি। তারাও এখন গাড়ি কিনতে শুরু করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও লট ধরে গাড়ি কেনা শুরু করেছে বছরখানেক গ্যাপ রেখে। ফলে একসঙ্গে বড় একটি চাপ পড়েছে তাদের ওপরও।

রিকন্ডিশনড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান জানান, গাড়ি বিক্রি খুব একটা বাড়েনি। মূলত কিছুদিন আগে হঠাৎ করে মোংলা বন্দরে গাড়ি ডেলিভারি নিতে ৪০ দিন পার হলে প্রতি ইউনিট গাড়িতে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করা শুরু হয়েছে। এ কারণেই চট্টগ্রাম ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দরের পরিবর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে গাড়ি আমদানি করছে। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে স্টোর রেন্ট একটু বেশি। এ কারণে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে ডিউটি দিয়ে গাড়ি ডেলিভারি নিয়ে শো-রুমে ফেলে রাখছেন। এসব কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে; কিন্তু বাজারে বিক্রি খুব একটা বাড়েনি।