শীতের সকাল। কাঁচাবাজারে ভিড় আছে, সবজির ঝুড়ি ভরা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শিম, গাজর—সবই চোখে পড়ে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, শীতের বাজার বুঝি স্বস্তিই ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু দাম জিজ্ঞেস করতেই সেই স্বস্তি মিলিয়ে যায়। শীত এলেও সবজির দামে ফিরেনি গত বছরের মতো স্বস্তি।
প্রতি বছর শীত মৌসুম মানেই সবজির প্রাচুর্য। মাঠে ফলন বাড়ে, সরবরাহ বাড়ে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে। কিন্তু এবার সেই চেনা চিত্র পুরোপুরি মিলছে না। দাম কিছুটা কমেছে ঠিকই, তবে তা ক্রেতাদের প্রত্যাশার ধারেকাছেও নেই।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী ঘুরে দেখা গেছে, আগের মাসের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কম। বাজারে এখন ফুলকপি প্রতিটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, শিম কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, লাউ প্রতিটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং বেগুন কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি আছে, সরবরাহেও ঘাটতি নেই। কিন্তু দাম শুনে অনেকেই থমকে যাচ্ছেন। কারণ এই সময়টাতে দাম আরও নিচে নামার কথা ছিল—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের।
গত বছরের সঙ্গে দামের ফারাক স্পষ্ট : ক্রেতারা বলছেন, ঠিক এক বছর আগেও একই সবজি আরও কম দামে পাওয়া যেত। এবার শীতকালীন সবজির ভরা মৌসুমেও কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।
রামপুরা বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী শেফালী আক্তার বলেন, শীত এলেই ভাবি সবজির দামে একটু স্বস্তি পাব। কিন্তু এবার সেটা হচ্ছে না। বাজারে সবজি আছে, কিন্তু দামের কারণে ইচ্ছামতো কেনা যাচ্ছে না।
উৎপাদন খরচ বাড়ায় দামে চাপ : বিক্রেতারা বলছেন, দামের এই স্থবিরতার পেছনে মূল কারণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা শামসুল আলম বলেন, মাঠে সবজি আছে, কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু কৃষকের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত বাজারে এসে পড়ে।
পরিবহন ও আড়ত খরচে প্রভাব : শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন ও আড়ত খরচও দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। শ্রমিক মজুরি, ট্রাক ভাড়া এবং আড়তের কমিশন—সব মিলিয়ে সবজির দাম নিচে নামতে বাধা পাচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
মাঠে ফলন ভালো, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট : কৃষি বিপণন সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা শুধু খরচ নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও বড় ফ্যাক্টর। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ফলন ভালো হলেও সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে মাঠপর্যায়ে কম দামের সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায় না। তিনি বলেন, কৃষক কম দামে বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে এসে দাম অনেক বেড়ে যায়। এতে করে শীত মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত দরপতন দেখা যায় না।
বাজার নজরদারির ঘাটতিতে ভোক্তার হতাশা : ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ক্রেতারা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না।
সব মিলিয়ে শীতের মৌসুমে বাজারে সবজির রঙ-বেরঙের উপস্থিতি চোখে পড়লেও দামের হিসেবে স্বস্তি এখনও অধরা। শীতের সবজি যেন শুধু দেখার, কিনতে গেলে হিসাব কষতেই হচ্ছে বেশি। ফলে শীত এলেও সবজির বাজারে স্বস্তির অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আমরা এখন খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি। সরকার এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগী।
তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেশি। শীতেও সবজির বাজারে প্রত্যাশিত দাম কমেনি। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। ব্যবসায়ীরা সৎ না হলে ক্রেতারা ঠকতেই থাকবে।