Image description

২৯ ব‍্যাচের এক কর্মকর্তা একটি জেলার নতুন জেলাপ্রশাসক, আরেকজন সিনিয়রকে প্রশ্ন করেছে, “আলম স্যার প্রশাসনের জন্য এমন কি করেছেন যে আমাদের ওনার কথা মনে রাখতে হবে?” এর জবাবে দ্বিতীয় কর্মকর্তা বললেন, “শোনো বাছা, সার্ভিসে তোমার জন্ম হওয়ার আগে প্রশাসনের জন‍্য আলম স‍্যার যা যা করেছেন, হয়ত সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে আর কেউ কখনও করেনি। ওটা ভেঙেই সব সার্ভিস খাচ্ছে এখন! এমনকি তুমি যে পদোন্নতি পেয়ে উপ-সচিব হয়েছ, তাও আলম স‍্যারের কল‍্যাণে। এসব কাহিনী তোমার জানার কথা নয়। আমরা সিনিয়ররা জানি”। বিষয়টি ঘুরেফিরে যখন আমার কানে এলো, তখন ১৫ ব‍্যাচের তিন অফিসার এ সংক্রান্ত আলোচনাটা নতুন করে তুললেন। ওরা অনেকটাই জানে। তারপরেও বিস্তারিত বলা প্রয়োজন।

বিভিন্ন ক‍্যাডার সার্ভিসে তোমরা যারা আজকাল বিভিন্ন টায়ারে টাইমলি বা দ্রুতই পদোন্নতি পেয়ে তর তর করে ওপরে উঠে যাচ্ছ, তারা কি একটিবারও জানার চেষ্টা করেছ, এই পদ ছাড়া পদোন্নতি (মানে সুপারনিউমারি পদোন্নতি) কোত্থেকে এলো - কার জন‍্যে পাচ্ছ?

নিশ্চয় জানো না। এটি সৃষ্টি করেছিলাম আমি শামসুল আলম ২০০৬ সালে। তারপরে সেই যে সুপারনিউমারী প্রমোশন এবং ইনসিটু পোস্টিংয়ের ট্রেন চলতে লাগলো, এখনও চলছে তো চলছেই। যদিও শুরুর সময় কথা ছিল তিন বছরে সব এডজাস্ট করা হবে। কিন্তু অদ‍্যাবধি বন্ধ হয়নি সুপারনিউমারির বিজনেস।

পদ ছাড়া পদোন্নতি: এর দায় এবং দোষ সবই আমার, তোমরা শুধু পদোন্নতি ভোগ করো

গতকাল ১১৮ জন এবং বিদেশে থাকা আরও কয়েকজনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে অধস্তন আদালতের বিচারকদের মেগা পদোন্নতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, তিন পদে ৮২৬ জন, এতে জেলা জজই হয়েছেন ২৫০ জন। এর কয়েকদিন পরে কথা হচ্ছিল এক জেলা জজের সাথে, তিনি জানালেন, তাঁর চার এডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জাজ সবাই পদোন্নতি পেয়ে জেলা জজ হয়েছেন, এখন তাদের বসার জায়গা নেই। অর্থাৎ বেশিরভাগই অনুমোদিত শূন্য পদ ছাড়াই পদোন্নতি পেয়েছেন।

একইভাবে প্রশাসনে উপসচিব পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ২০২৫ সালে ২৬৮জন, ২০২৪ সালে ২৪৮ জন, ২০২৩ ‍সালে ৪৬১, ২০২২ সালে ৪৫৫ জন। যুগ্মসচিব পদেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ২০২৫ সালে ২৬৮, ২০২৪ সালে ২০১, ২০২৩ ‍সালে ২১৩ জন। এই সকল পদোন্নতির বেশিরভাগই দেয়া হয়েছে শূন‍্য পদ ছাড়াই।

এখন প্রশাসন, পুলিশ, বিচার, কৃষিসহ সব ক‍্যাডার, সার্ভিসে পদোন্নতি হয় সুপারনিউমারি পদে (সংখ‍্যা অতিরিক্ত)। মানে ক‍্যাডার কম্পোজিশনের বাইরে গিয়ে ইচ্ছেমত সংখ‍্যায় পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। দু’তিন মাস আগে পুলিশে ৩৩ জন ডিআইজি পদোন্নতি দেয়া হয়েছে, এটাও মূলত অনুমোদিত পদের অতিরিক্ত। এভাবে সকল সার্ভিস, বিচার বিভাগ, ডিপার্টমেন্টে পর্যন্ত শূন্যপদ ছাড়াই অবাধে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন টায়ারে। কিন্তু কি করে হলো?

সুপারনিউমারি পদোন্নতির ইতিহাস:

২০০১ সালে বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতায় বসে, তখন প্রশাসনের পিরামিডটি ছিল পেট মোটা কলসের মত। তখন ৫টি ব‍্যাচে ১৯৫০ জন অফিসার উপসচিব হওয়ার জন‍্য অপেক্ষমান। আবার সরকারও অফিসার শূন্যতায় ভুগছে। এই নিয়ে আমি এবং আমার অফিসারদল সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলতে থাকি। পাওয়ারফুল ৫ মন্ত্রীর সাথে অফিসে বাসায় বহু বার দেখা সাক্ষাৎ করি, সচিব পর্যায়েও সাক্ষাৎ করি। পেপার সাবমিশন করি। সব চেষ্টার ফলে ২০০২ সালে পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করে সরকার। উচ্চস্তরের কিছু পদোন্নতি দেয়া শুরু হয়। কিন্তু বড় আকারের পদোন্নতি সম্ভব হয়নি। সবচেষ্টা শেষে তারপরে আমি সাক্ষ‍াৎ করি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাঁচ সিনিয়র মন্ত্রী সর্বজনাব সাইফুর রহমান, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, এম কে আনোয়ার, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমিনুল হক, এবং রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী। সবার সামনে আমলাতন্ত্রের ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটা প্রেজেন্টেশন দিই ৪২ মিনিটের। একাই কথা বলি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিলেন। জট খুলে গেলো পদোন্নতির। ৮২ বিশেষ ব‍্যাচ উপসচিব হয় ২০০৩ সালে এবং ৮৪ ব‍্যাচের পদোন্নতি হয়ে যায় ২০০৪ সালে, পরের বছর ৮৫ ব‍্যাচ।

সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত বাকি রইলাম আমরা ৮ম এবং নবম ব্যাচ। আবার দেখা করা শুরু করলাম কেবিনেট সচিবের সাথে। সব মিলিয়ে ৩-৪ জন কেবিনেট সচিব সর্বজনাব সাদাত হোসাইন, আব্দুল হালিম, এবং সোলায়মান চৌধুরী এদের সাথে আমার দেন দরবার করতে হয়েছে। সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে- সেনাকুঞ্জে। সেখানে সংস্থাপন সচিব মনিরুজ্জামান স্যারের সাথে কথা হল সাইডলাইনে। স্যার বললেন আমি তো প্রমোশন দিতে চাই, কিন্তু আমার হাতে তো শূন‍্যপদ নাই। আমি বললাম, রাস্তা দেখিয়ে দেবো স‍্যার। তিনি বললেন, কালকে চলে আসো আমার অফিসে। পরের দিন সকাল বেলা চলে গেলাম সমস্ত সংস্থাপন সচিবের অফিসে। সেখানে সচিব মনিরুজ্জামান স‍্যার, জয়েন্ট সেক্রেটারী এপিডি হাফিজুর রহমান ভুইয়া, এবং আমি তিনজনে বসলাম। তখন সচিব সাহেবকে পরামর্শ দিলাম, এলিজিবল সবাইকে প্রমোশন দিয়ে দিন। তো কিভাবে দিব জানতে চাইলেন। আমি বললাম সুপারনিউমারি প্রমোশন দিন। বললেন, এটা আবার কি? বললাম, অনুমোদিত পদের অতিরিক্ত যা লাগে অস্থায়ী পদ সৃষ্টি করে নিব। তিন বছরে পদগুলো এডজাস্ট হয়ে যাবে। উনি বললেন, এত অফিসার পোস্টিং দিব কোথায়? আমি বললাম, ইনসিটু থাকবে। স‍্যার বললেন, এইটা আবার কি? বললাম, যে যেখানে আছে, সে সেখানেই থাকবে, কেবল নেমপ্লেটটা চেঞ্জ হয়ে যাবে। তারপরে পদ শূন‍্য হলে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে পোস্টিং হবে। স‍্যার বলেন, এটা কি সম্ভব? আমি বললাম হ‍্যাঁ সম্ভব, আপনি প্রস্তাব নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান আশা করি আপনি সফল হবেন। হয়েছিল তাই। এরপর ৮ম এবং নবম ব্যাচের আংশিক পদোন্নতি দেয়া হলো। সুপারনিমারি পদোন্নতি এবং ইনসিটু পোস্টিং-এর ধারা চলতে থাকে চলতেই থাকল- সব ক্যাডারে এবং সার্ভিসে। তবে এর মাঝে এডমিন ক‍্যাডার কম্পোজিশন রিভাইজ করে অনেক সুপারনিউমারি পদকে একোমোডেট করা হয়েছে।

লেখক: সরকারের সিনিয়র সচিব, পিআরএল