Image description

একসময় নৌকা যে আওয়ামী লীগেরই স্থায়ী প্রতীক হবে, কিংবা ধানের শীষ বিএনপির জন্য চূড়ান্ত হয়ে যাবে—এমনটা মোটেও নিশ্চিত ছিল না।

গত বুধবার নির্বাচন অফিস নির্বিঘ্নে ১১৮টি প্রতীক চূড়ান্ত করলেও বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রতীক বণ্টনের প্রক্রিয়া সবসময় এতটা সরল ও নির্বিবাদ ছিল না।

সাম্প্রতিক সময়েও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে জটিলতা দেখা গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা প্রতীক দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলটির দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলেছে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তারা 'শাপলা কলি' প্রতীকে সম্মত হয়।

প্রথম প্রতীক বিরোধ: ১৯৭৩

বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন শুরুর আগেই প্রতীক নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)—দুই দলই নৌকা প্রতীক দাবি করে।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালের ২৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে প্রতীক সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।

বৈঠকে কমিশন একটি নীতি গ্রহণ করে—আগের নির্বাচনে যে দল যে প্রতীক ব্যবহার করেছে, পরবর্তী নির্বাচনে সেই প্রতীকের ওপর তাদের অগ্রাধিকার থাকবে। এই নীতির আলোকে নৌকা প্রতীক আওয়ামী লীগের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী ন্যাপ) পক্ষে ব্যারিস্টার আলীম-আল-রাজি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তার বক্তব্য ছিল, যেহেতু এটি বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন, তাই 'শেষ নির্বাচন' বা 'বিদ্যমান রাজনৈতিক দল'—এই ধারণাগুলো এখানে প্রযোজ্য নয়। তার মতে, সব রাজনৈতিক দলই নতুন। তাই নৌকা প্রতীক লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া উচিত।

এই দাবির পক্ষে অবস্থান নেন জাসদের প্রতিনিধি শাহজাহান সিরাজ, বাংলা জাতীয় লীগের প্রতিনিধি অলি আহাদসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।

এই দাবির পক্ষে অবস্থান নেন জাসদের প্রতিনিধি শাহজাহান সিরাজ, বাংলা জাতীয় লীগের প্রতিনিধি অলি আহাদসহ আরও কয়েকজন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের পক্ষে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠিত এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ব্যবহার করেছে। সে কারণে নৌকা প্রতীকের ওপর তাদের ন্যায্য দাবি রয়েছে।

সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দেয়, জাসদ একটি নবগঠিত দল এবং এখানে লটারির কোনো সুযোগ নেই। কমিশন নৌকা প্রতীক আওয়ামী লীগ ও তাদের মনোনীত প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাসদ হাইকোর্টে রিট করলেও আদালত তা খারিজ করে কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

একই নীতির ভিত্তিতে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয় জাতীয় আওয়ামী পার্টিকে (ভাসানী ন্যাপ)।

বিএনপির ধানের শীষ পাওয়া: ১৯৭৯

১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রায় পঞ্চাশটি রাজনৈতিক দল প্রতীকের জন্য আবেদন করে। সদ্য গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)সহ মোট ১৭টি দল ধানের শীষ প্রতীক দাবি করে।

এর আগে ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ (ভাসানী) ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করেছিল। পাশাপাশি, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ছয় দলীয় জোট 'জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট'-এর প্রার্থী হিসেবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানও এই প্রতীক ব্যবহার করেন।

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ছিল—জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল, মরহুম মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং বাংলাদেশ তফসিলি ফেডারেশন।

ধানের শীষ প্রতীক দাবিদাররা চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—বিএনপি এবং ন্যাপের (ভাসানী) চারটি ভিন্ন ধারার দল।

এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার একটি বৈঠক আহ্বান করেন।

বৈঠকে বিএনপির পক্ষে মওদুদ আহমদ বলেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন এবং ন্যাপ (ভাসানী) ছিল ওই ফ্রন্টের একটি অংশ।

তিনি আরও যুক্তি দেন, এই ন্যাপ (ভাসানী) ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ ব্যবহার করেছিল এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় প্রতীক বরাদ্দের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদনও করেছিল।

এ সময় বিতর্ক দেখা দেয়—'শেষ নির্বাচন' বলতে ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নাকি ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনকে বোঝানো হবে।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্পষ্ট করেন, যেহেতু নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি ও সংসদ—উভয় নির্বাচনই পরিচালনা করে, তাই ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকেই 'শেষ নির্বাচন' হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ন্যাপের (ভাসানী) বিভিন্ন ধারার প্রতিনিধিরা বিএনপির দাবির বিরোধিতা করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ন্যাপ (ভাসানী) বিএনপিতে একীভূত হয়ে বিলুপ্ত হয়েছে এবং তারাই মূল উত্তরাধিকারী।

তবে নির্বাচন কমিশন জানায়, মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ (ভাসানী) ছাড়া অন্য কোনো ধারা নিবন্ধিত দল হিসেবে স্বীকৃত ছিল না এবং এই দলটিই জিয়াউর রহমানকে সমর্থন করেছিল।

সব দিক বিবেচনায় নিয়ে এবং 'পূর্ব ব্যবহারের নীতি' অনুসরণ করে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীক বিএনপির জন্য বরাদ্দ দেয়।

লাঙল ও নৌকা বিতর্ক: ১৯৮৬

১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রতীকের জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ আটটি দল লাঙল প্রতীক দাবি করে। একই সময়ে তিনটি দল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আবেদন জানায়।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)—উভয় দলই নৌকা প্রতীকের জন্য আবেদন করে।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয় জামায়াতে ইসলামীকে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম দলটি নিজ নামে নির্বাচনে অংশ নেয়।

লাঙল প্রতীক নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা দাঁড়ায় জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় লীগের মধ্যে। জাতীয় পার্টির পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়—বাংলাদেশ জাতীয় লীগ একীভূত হয়ে জনদলে পরিণত হয় এবং পরে সেই জনদল থেকেই জাতীয় পার্টির জন্ম হয়। নির্বাচন কমিশন এই যুক্তি গ্রহণ করে লাঙল প্রতীক জাতীয় পার্টির জন্য বরাদ্দ দেয়।

স্থায়ী প্রতীক ব্যবস্থা

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতীক বণ্টন চূড়ান্ত হয়। সে অনুযায়ী, নৌকা আওয়ামী লীগ, ধানের শীষ বিএনপি, লাঙল জাতীয় পার্টি এবং দাঁড়িপাল্লা জামায়াতে ইসলামীর স্থায়ী প্রতীক হিসেবে নির্ধারিত হয়।

পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও এই প্রতীক বণ্টন ব্যবস্থা বহাল থাকে। পরে ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রথা চালু হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এসব প্রতীক সংরক্ষণ করে।