Image description
প্রতিদিন ৫-৭টি আবেদন পাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জমা পাওয়া অস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ ফেরত দেওয়া হয়েছিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। নির্বাচনের আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করছেন প্রার্থীরা। আর জেলা প্রশাসকরা তা প্রতিদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখায় মতামতের জন্য পাঠাচ্ছেন।

একদিকে নতুন প্রার্থীরা শটগানের লাইসেন্স পেতে শুরু করেছেন, রিভলবার ও পিস্তলের লাইসেন্সও পাবেন শিগগিরই।

অন্যদিকে প্রার্থী ছাড়া অন্যদের কাছে থাকা বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে ইস্যু করা এবং থানা থেকে লুট হওয়া হাজার হাজার অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দাপট বেশি, সেই সব এলাকার প্রার্থীরাই নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকায় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছেন। আবার কোনো কোনো জেলা থেকে কোনো প্রার্থীই এখন পর্যন্ত আবেদন করেননি।

যেমন : শেরপুর  জেলার তিনটি আসনে ১৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কেউ আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য আবেদন করেননি। গতকাল বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) তরফদার মাহমুদুর রহমান।

গত ১৪ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা-২০২৫ জারি করা হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকেই প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি আগ্নেয়াস্ত্রের আবেদনের ফাইল জেলা প্রশাসকদের দপ্তর থেকে মতামতের জন্য মন্ত্রণালয়ে আসছে।

এর মধ্যেই অর্ধশতাধিক আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর একের পর এক আবেদন আসছে। তারা নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। আমরা আবেদনগুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই করছি এবং যোগ্যদের অনুকূলে ইতিবাচক মতামত দিচ্ছি।

নীতিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীরা পিস্তল বা রিভলবারের জন্য আবেদন করতে পারলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে শটগানের লাইসেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রার্থী তা হাতে পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, পিস্তল বা রিভলবারের লাইসেন্স পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও শটগান বা অন্যান্য অস্ত্রের ক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসি অফিস নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে নির্বাচনের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় এখন প্রায় সব আবেদনই মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পজিটিভ রিপোর্ট পেলেই লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে।

আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাট-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম ও বাগেরহাট-২  আসনের বিএনপি প্রার্থী শেখ জাকির হোসেন আবেদন করেছেন। এ ছাড়া বিএনপির নেতা গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এস এম জিলানী, ঢাকা-৪ আসনের তানভীর আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনের হাসান জাফির তুহিন এবং মেহেরপুর-১ আসনের মাসুদ অরুণ। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুস আহম্মেদ শেখ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইন হিরুসহ আরো অনেকে গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন।

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, আমি শটগানের লাইসেন্স পেয়েছি। তবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য একজন গানম্যানের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি। এ জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি, আশা করছি দ্রুতই সমাধান হবে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার এখানে দুজন প্রার্থী আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য আবেদন করেছেন। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে (২০০৯-২০২৪) ১৭ হাজার ২০০টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ আছে, ওই সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলীয় ক্যাডার এবং এমনকি হত্যা মামলার আসামিদেরও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইস্যু করা সব লাইসেন্স স্থগিত করে দেয়। নির্দেশ দেওয়া হয় ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেওয়ার জন্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪০টি অস্ত্র থানায় জমা পড়ে। তবে এখনো তিন হাজার ৮৬০টি অস্ত্র লাইসেন্সধারীদের হাতে রয়ে গেছে। ওই অস্ত্রগুলো বর্তমানে অবৈধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

থানায় জমা দেওয়া অস্ত্রের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র তিন হাজার অস্ত্র মালিকদের ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি ১০ হাজারেরও বেশি অস্ত্র ফেরত দেওয়া হয়নি। গত বছর ৩০ অক্টোবর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করার পর তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন। কমিটির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে বা যাঁরা অতীতে অস্ত্রের অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের অস্ত্র কোনোভাবেই ফেরত দেওয়া হবে না।

তালিকায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা যেমন মাহবুবুল আলম হানিফ, শামীম ওসমান, নিজাম উদ্দিন হাজারী, কামাল আহমেদ মজুমদার এবং জুনাইদ আহমেদ পলকের মতো ব্যক্তিরা তাদের অস্ত্র জমা দেননি। এঁদের অনেকে বর্তমানে আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে রয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাদের অস্ত্র লুট হয়ে গেছে। তবে সরকার এই দাবি গ্রহণ করেনি এবং এগুলো উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও পাবনা জেলায় সবচেয়ে বেশি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া ৭৭৮টি লাইসেন্সের অধিকাংশ মালিকই সাবেক সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।

নির্বাচনের আগে অবৈধ হয়ে যাওয়া ও থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি অবৈধ অস্ত্রগুলো দ্রুত উদ্ধার করা না যায়, তবে নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।