সরকারি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার টেন্ডারে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠে। পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্তে কারসাজি করা হয় বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ এবং শীর্ষনিউজ ডটকম এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্র বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল হলেও এই দুর্নীতি-অনিয়মের সাথে জড়িতদের কারো বিরুদ্ধেই দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রকল্প পরিচালক পদে এখন পর্যন্ত বহাল আছেন ডা. এস এম কবির হাসান। এই অনিয়ম দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হলেন- হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা এবং তাঁর স্বামী ডা. মশিউর রহমান। এই দুই শীর্ষ দুর্নীতিবাজ চিকিৎসকও নিজ নিজ পদে বহাল তবিয়তে আছেন।
জানা যায়, আওয়ামী সরকারের আমলে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় স্বামী-স্ত্রীর এই সিন্ডিকেট ব্যাপক লুটপাট করেছেন। যা নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তখন। ওই সময় ৯টি প্যাকেজের ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটায় ভয়াবহ টেন্ডার জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে এই ৯ প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে। কিন্তু যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার জন্য প্রায় দেড় বছর আগে বিল পরিশোধ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি মালামাল সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেয়নি। নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করে তাতে ইউরোপ-আমেরিকার স্টিকার ও সিল ব্যবহার করেছে। সেই একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবারও অনিয়মের মাধ্যমে ৭৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। এইসব অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয় সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ-এর ১ ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যার প্রতিবেদনে।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য প্রায় ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু ওই দরপত্রে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি, অ্যানেসথেশিয়া সরঞ্জাম, এক্স-রে ইউনিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রের সঙ্গে ঘড়ি, টেলিভিশন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ মোট ৭০৩টি আইটেম একত্রে একটি লটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পাবলিক প্রকিউরমেন্টস রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী এত বৈচিত্র্যময় ও বিপুলসংখ্যক আইটেম এক লটে অন্তর্ভুক্ত করা আইন পরিপন্থি। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে গত ২ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয়া হয়। অভিযোগপত্রটি দিয়েছেন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম।
টেন্ডার অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়, দরপত্রে নিম্নমানের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা পিপিআর-২০২৫ বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। পাঁচ বছরের পরিবর্তে মাত্র দুই বছরের ওয়ারেন্টি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বদলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনপত্র গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। এসব শর্ত মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করবে।
অভিযোগকারীরা আরও উল্লেখ করেন, একই লটে এত সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন পণ্য রাখায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হবে। দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে ৭০৩টি আইটেম সরবরাহে সক্ষম নয়। ফলে দরপত্রটি একচেটিয়া হয়ে পড়বে এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে। পিপিআর অনুযায়ী প্রয়োজনভিত্তিক আলাদা আলাদা লটে বিভাজন করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়।
সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো দরপত্রটি বাতিল করা হয়। কিন্তু টেন্ডার অনিয়মের কারণে দরপত্র বাতিল হলেও এক অদৃশ্য শক্তির বলে দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তারা বহাল-তবিয়তে রয়ে গেছেন।
এর আগে বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ নামের দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানটি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের টেন্ডারের যেসব কাজ পেয়েছে তাতে নিম্নমানের সরঞ্জামে ইউরোপ ও আমেরিকার নামিদামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে সরবরাহ করা হয়েছে। সরবরাহকৃত এসব মালামাল এখন পর্যন্ত কোনো কোনোটি ব্যবহারও করা যায়নি। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি পিরিওড-ও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের এই দরপত্র অনিয়মের কারণে বাতিলের ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু টেন্ডার বাতিল নয়- আগের অনিয়মগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে একই ধরনের দুর্নীতি আবারও ফিরে আসবে।
আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা আমলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে যে ভয়াবহ টেন্ডার অনিয়ম ও দুর্নীতি-জালিয়াতি হয় তাতে মূল নায়ক ছিলেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা এবং তাঁর স্বামী ডা. মশিউর রহমান। ডা. মশিউর রহমান পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন)। শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ডা. দিলরুবা এবং ডা. মশিউর উভয়েই এখন এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও স্বপদেই বহাল-তবিয়তে আছেন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলরুবা ইয়াসমিন ওই সময় একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। কেনাকাটাগুলো হয়েছে তাঁর হাত দিয়েই। তবে সবকিছু হয়েছে ডা. মশিউরের পরিকল্পনামতো। তিনিই আওয়ামী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজের সঙ্গে গোপন সমঝোতা এবং ভাগবাটোয়ারার কাজগুলো করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এবারের টেন্ডারও পুরোপুরিই নিয়ন্ত্রণ করছেন এই চিকিৎসক দম্পতি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পদে এখনো আছেন ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা, তাঁর স্বামীও মেডিকেল কলেজে আগের পদেই আছেন। এদিকে প্রকল্প পরিচালক পদে আছেন ডা. এস এম কবির হাসান, যিনি ইতিপূর্বে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ছিলেন। তবে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল- উভয়টিতেই দুর্নীতিবাজ লিজা দম্পতির একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে এস এম কবির হাসানও এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। টেন্ডার সংক্রান্ত সবকিছুই হচ্ছে তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে বসে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজচক্র।
শীর্ষনিউজ