Image description

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। নতুন অধ্যাদেশে একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য নিয়ে এ কর্তৃপক্ষ গঠন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংস্থাটির বোর্ড গঠনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমলানির্ভর বোর্ড থেকে বেরিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করায় বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে।

গত ১৯ জানুয়ারি ‘‌রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ শীর্ষক অধ্যাদেশটি প্রকাশ করে আইন মন্ত্রণালয়। এতে রাজউকের আওতাভুক্ত এলাকা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরী, ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার আওতাধীন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার আওতাধীন এলাকা, পাশাপাশি সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় এ আইন প্রযোজ্য হবে।

এর আগে দ্য টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩ অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্য নিয়ে রাজউক বোর্ড গন হওয়ার বিধান ছিল। বর্তমানে এটি সাতজনে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া রাজউকের সব বোর্ড মেম্বার ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা বিভিন্ন দপ্তরপ্রধানরা। তবে নতুন অধ্যাদেশে আমলাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করে বোর্ড গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে রাজউক আরো স্বচ্ছ ও সচল প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, রাজউক বোর্ডের সভাপতি হবেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, একই মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় সংসদের স্পিকার কর্তৃক মনোনীত রাজধানীর বাইরের নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত একজন অধ্যাপক, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার প্রতিনিধি, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক ও একজন স্বাধীন স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হবে রাজউক বোর্ড।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজউক বোর্ডের প্রধান কাজ হবে পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও সাম্যভিত্তিক নগরায়ণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে রাজউক প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ যাবতীয় কার্যক্রম তদারকি ও মূল্যায়ন করা।

রাজউক বোর্ডে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি পরিকল্পিত নগর গড়ার ক্ষেত্রে আশাজাগানিয়া বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে রাজউক গঠনের আগে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) বোর্ড এভাবেই নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরবর্তী সময়ে এরশাদ এসে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেন এবং এর বোর্ড থেকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে আমলাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর পর থেকেই সরকার যেভাবে বলেছে, যাকে বলেছে তাকেই প্লট দেয়া হয়েছে। ভূমির শ্রেণী ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা হয়েছে। এবার যেহেতু আগের সেই পদ্ধতির আদলে নতুন বোর্ড গঠন হওয়ার নির্দেশনা এসেছে, আশা করা যাচ্ছে, ঢাকার জন্য ভালো কিছু হবে।’

এতদিন সরকারি চাকরির নিয়মের আদলে ৫৯ বছর চাকরি হলে অবসরে যেতেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বাধ্যতামূলক অবসরের নজিরও রাজউকে নেই। এবার অধ্যাদেশে কারো চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলেই তাকে অবসরে পাঠানোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশে ভূমি ক্রয়, ইজারা ও অধিগ্রহণ নিয়ে বলা হয়েছে, এ অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কর্তৃপক্ষ যেকোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি অথবা ভূমিসংশ্লিষ্ট স্বার্থ ক্রয়, ইজারা, বিনিময় বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে। কোনো ভূমি বা ভূমিসংশ্লিষ্ট স্বার্থ অধিগ্রহণ করতে হলে তা জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে এবং ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।

নতুন অধ্যাদেশে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন নিয়ে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ নিজের আওতাভুক্ত এলাকায় অনুমোদিত কৌশলগত পরিকল্পনা ও এলাকাভিত্তিক বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। কৌশলগত পরিকল্পনায় চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সেগুলো হলো ভবিষ্যৎ নগরীর বিস্তার এবং জনসংখ্যার প্রক্ষেপণ, প্রাকৃতিক ভূচিত্র অনুযায়ী ভূমির বিদ্যমান শ্রেণী বিন্যাস, নগরের ভূমি ব্যবহারের প্রকার ও চাহিদা নির্ণয় এবং টেকসই বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগ্রহণ।

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেগুলো হলো মৌজাভিত্তিক ভূমির বিস্তারিত বিবরণ, ভূমি ব্যবহার, পুনরুন্নয়ন, পুনর্বিন্যাস এলাকাসংক্রান্ত বিবরণ, জনঘনত্ব অঞ্চল বিভাজন ও জোনিং, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়িতব্য কর্মসূচি, ইমারতের উচ্চতাসংক্রান্ত বিধিবিধান, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় উল্লেখিত ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমি মালিককে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক চেয়ারম্যান সেটি প্রত্যাখ্যান করবেন অথবা অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেবেন।

রাজউক অধ্যাদেশে উল্লেখিত বিধিগুলো যদি কোনো ব্যক্তি অমান্য করেন তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

কৌশলগত পরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা লঙ্ঘনের দণ্ড সম্পর্কে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত কোনো ভূমি ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর দায়ে দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এছাড়া এ ধরনের অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে।

নিচু ভূমি ভরাট বা প্রাকৃতিক জলাধার বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে প্রথমবার দুই বছরের জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এরপর প্রতিবার একই অপরাধ সংঘটিত করলে অনধিক দুই বছর জেল বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

রাজউকের নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকায় নকশাবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে স্থাপনা নির্মাণকারীকে অনধিক দুই বছরের জেল বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এছাড়া রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়া অথবা জেনেশুনে দায়িত্ব পালন না করার কারণে যদি এ অধ্যাদেশে উল্লেখ কোনো অপরাধ সংঘটিত করেন কিংবা অপরাধ করার সুযোগ করে দেন তাহলে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারী অনধিক দুই বছরের জেল বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।