বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ আট বছর গুম থাকার পর ফিরে আসা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) তার বন্দিজীবনের অবর্ণনীয় ও রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট মধ্যরাতে র্যাব পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তের যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে তার জবানবন্দীতে।
তিনি জানান, বন্দিদশায় তাকে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এমনকি তাকে হত্যার জন্য ওজন মেপে শরীরের সাথে ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। সম্প্রতি গুম কমিশনের সদস্য, প্রধান উপদেষ্টা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তিনি র্যাব-১ এর ভেতর তার গোপন বন্দিশালাটি (আয়নাঘর) শনাক্ত করেন।
গতকাল বুধবার র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান সেনাকর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিচ্ছেন দীর্ঘ আট বছর গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান।
এদিন দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ মামলায় প্রথমে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তার সেই দীর্ঘ জবানবন্দীটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
‘আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। গত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার যাদেরকে গুম করে রেখেছিল আমি তাদের একজন। আমি আমার পিতা শহীদ মীর কাসেম আলী সাহেবের মামলায় নিয়োজিত আইনজীবী ছিলাম। ট্রাইব্যুনালে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ হয়েছিল এবং রিভিউ শুনানি চলছিল। ৪ আগস্ট ২০১৬ সালে আমি মিরপুর ডিওএইচএসস্থ আমার ভাড়া বাসায় ছিলাম। ঐ দিন রাত ১২ ঘটিকার পর কিছু লোক র্যাব পরিচয় দিয়ে আমার বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেন। দারোয়ান বাধা দেয় এবং বলে রাত ১২টার পরে বাসায় ঢুকতে দেয়া নিষেধ। তখন তারা চলে যায়। কিছুক্ষণ পর সাথে র্যাবের পোশাকধারী কিছু সদস্য নিয়ে তারা আবার আসে। পোশাকধারী র্যাব সদস্যদের পরনে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ছিল এবং তার উপরে র্যাব-১ কথাটি লেখা ছিল। তখন দারোয়ান তাদের ভিতরে ঢুকতে দেয়। এরপর তারা দোতলায় আমার অ্যাপার্টমেন্টে আসে। দারোয়ান বিষয়টি আমাকে জানালে আমি দরজা খুলি। র্যাব সদস্যরা ভিতরে প্রবেশ করে তাদের কমান্ডিং অফিসার আমার মোবাইলটি নিয়ে চেক করে কোন একজনকে ফোন করে বলে, স্যার ব্যারিস্টার আরমানকে পাওয়া গেছে। তারা আমার অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে তল্লাশি করে চলে যায়। তবে তল্লাশি চলাকালে আর একজনের সাথে ফোনে কথা বলে, তারপর চলে যায়।
৯ আগস্ট ২০১৬ সালে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে বাসা থেকে বের হলে লক্ষ করি একটি মাইক্রোবাস আমাকে ফলো করছে। আমি সারা দিনে যেখানেই গেছি তারা আমাকে ফলো করেছে। আমি আনুমানিক রাত ১১.৩০ ঘটিকায় বাসায় ফেরত আসি। আমি সপরিবারে রাতের খাবার খেতে বসার সময় দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার আওয়াজ শুনতে পাই। আমি পিপ হোল দিয়ে তাকিয়ে দেখি ৭-৮ জন অস্ত্রধারী লম্বা চওড়া লোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর আমি দরজার চেইন লাগিয়ে হালকা করে দরজা খুলি। আমি তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করি। তারা বলে যে, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। আমি আবারো তাদের পরিচয় জানতে চাই। তখন তারা বলে আমরা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর লোক। আমি তখন তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় জানতে চাই, আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কি না তাও জানতে চাই এবং বাহিনীর পরিচয়ও জানতে চাই। আমি তাদেরকে আরো জানাই সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আছে কোনো বাহিনী তাদের পরিচয় না দিয়ে কাউকে আটকাতে পারবে না। তারা উত্তরে বলে তাদের পরিচয় দেয়া লাগে না। আমি দরজা বন্ধ করে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা করি, এখন কী করব। তারা আমাকে দরজা না খুলতে অনুরোধ করে। তখন তারা দরজা ভেঙে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। তখন আমি দরজা খুলে দেই। তারা ভিতরে ঢুকে আমাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে নিচে নামতে থাকে। আমি খালি পায়ে যাচ্ছি দেখে আমার ছোট মেয়ে আমার স্যান্ডেল নিয়ে আমার পিছে পিছে যাইতে থাকে। সিঁড়ি দিয়ে নামার একপর্যায়ে তারা যখন দেখল আমার মেয়ে স্যান্ডেল নিয়ে নামতেছে তখন তারা তার হাত থেকে স্যান্ডেল নিয়ে নেয়। নিচে নেমে দেখি যে, যে মাইক্রোবাসটি সারা দিন আমাকে ফলো করেছে সেই মাইক্রোবাসটি দাঁড়ানো আছে। তারা ওই মাইক্রোবাসে আমাকে উঠিয়ে যাত্রা শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর আমাকে হাতকড়া পরায় এবং চোখ বেঁধে ফেলে। যাত্রাপথে কয়েক জায়গায় মাইক্রোবাসটি থামে এবং তাদের কথোপকথন থেকে বুঝতে পারি তারা বিভিন্ন জায়গায় রিপোর্ট করছে। যিনি আমাকে আটকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার কোমরে একটি ছোট অস্ত্র ছিল এবং দুইজনের হাতে বড় অস্ত্র ছিল এবং সেই অস্ত্রের গায়ে সাদা কালিতে সিরিয়াল নাম্বার লেখা ছিল।
গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাকে একটি সঙ্কীর্ণ সেলে প্রবেশ করায় এবং আমার জামা কাপড় খুলে তাদের দেয়া লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরতে বলে। আমি পরনের সব কাপড়-চোপড় ও স্যান্ডেল তাদের দিয়ে দেই এবং তাদের দেয়া লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরি। আমাকে চোখ বেঁধে ওই ঘরে রাখা হয়েছিল। ওই ঘরের মেঝে স্যাঁতসেঁতে, ইঁদুর এবং তেলাপোকা আমার শরীরের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছিল। আমি নিজেকে সান্ত¡না দিচ্ছিলাম এই বলে যে, আমাকে হয়ত এখানে ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকতে হবে না। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হলেও আমাকে আদালতে হাজির করা হয় নাই। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি যে গুমের বিরুদ্ধে কথা বলতাম আমি সেই গুমের শিকার হয়েছি। সেখানে আমাকে ১৬ দিন রাখা হয়। আমি এই ১৬ দিনে বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি।
১৬ দিন পর এক মাঝরাতে ওই বন্দিশালা থেকে বের করে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে একটা গাড়িতে করে আরেকটি বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে একটি সিঁড়ি বেয়ে একটি ভবনের দোতলায় তোলা হয়। তারপর সেখান থেকে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পাঁচধাপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বাম দিকে একটি বন্দী সেলে নেয়া হয়। এই সেলটি আগের চেয়ে অনেক বড় এবং ফ্লোর টাইলস করা। টাইলসের রঙ ছিল সাদা রঙের ওপর ধূসর ডোরাকাটা এবং সেই সেলের সাথে একটি অ্যাটাচড টয়লেট ছিল। টয়লেটের টাইলসের রঙ ছিল সাদার ওপরে নীল ডোরাকাটা। সেলের প্রবেশদ্বার ছিল স্টিলের। দেয়ালের ওপরে ভিতরে নজরদারির জন্য একটি ছোট্ট জানালা ছিল যা বাইর থেকে খোলা যায়। টয়লেটে যাওয়ার সময় এবং খাওয়ার সময় আমার চোখের বাঁধন ঢিলে করে দেয়ার কারণে আমি উপরের বর্ণনাগুলো দেখতে পাই। আমি বন্দী থাকা অবস্থায় সিলিংয়ের একটা অংশ খুলে পড়েছিল যা পরবর্তীতে মেরামত করা হয়, যা এখনো দৃশ্যমান। যা আমি মুক্ত হওয়ার পর গুম কমিশনের সদস্যগণ, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, তদন্ত সংস্থার লোকজন এবং চিফ প্রসিকিউটরের উপস্থিতিতে আমাকে যেখানে বন্দী রাখা হয়েছিল সেটা পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি। যেটা ছিল র্যাব-১ কম্পাউন্ডে, র্যাব সদর দফতরের অধীনে পরিচালিত, র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের টিএফআই সেল।
এই সেলের প্রহরীদের আচরণ ছিল নির্মম এবং আমাকে সার্বক্ষণিক চোখ বেঁধে এবং হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। খাবারের সময় ডান হাত খুলে দিত। টয়লেটের সময় বাম হাত খুলে দিত। গভীর রাতে প্রতিদিন দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেয়া হতো। সকালে নাশতা না দেয়া পর্যন্ত এই ভাবে রাখা হতো। আমাকে নামাজের সময় বলা হতো না, দিন না রাত বুঝতে পারতাম না। বাইরের আওয়াজ যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য একটি একজস্ট ফ্যান চালিয়ে রাখা হতো। শীতকাল এলে একজস্ট ফ্যান বন্ধ রাখা হতো, তখন বাইরের শব্দ শুনতে পারতাম। যার মধ্যে বিমান, ট্রেন এবং জোরে গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনতে পারতাম। ওখানে অন্যান্য সেলের বন্দীদের নির্যাতনের সময় আর্তচিৎকার শুনতে পেতাম। আমি প্রায়ই অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়তাম। সেই সময় বাইরে থেকে চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দিতেন। কয়েক মাস পরে আমার ডান ঊরুতে ফোঁড়া হয়, যা পেকে গিয়ে রক্ত ও পুঁজ বের হতো। তখন আমাকে আমার সেল থেকে বের করে ডান দিকে মোড় নিয়ে পাঁচ ধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে কিছুদূর গিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিয়ে মাইনর সার্জারি করা হয়। আমি তাদেরকে বলি এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? তখন তারা বলে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আপনার বিষয়ে নির্দেশ আসে, আমাদের করার কিছু নাই। আমাকে সেলে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ওষুধ দেয়া হতো। একদিন ওষুধ দেয়ার সময় একটি কাঠের বাক্স দেয়া হয়, আমি চোখ বাঁধা অবস্থায় নিচ দিয়ে নাকের ফাঁক দিয়ে একটু দেখতে পেতাম, ওই ফাঁক দিয়ে দেখি ওই বাক্সের গায়ে লেখা টিএফআই এবং আমার ওষুধগুলো একটি বড় ঠোঙার মধ্যে ছিল, তার গায়ে লেখা ছিল ভিআইপি-২। বাক্সের গায়ে লেখা ছিল টিএফআই এবং বাক্সের ভিতরে থাকা ঠোঙায় ভিআইপি-২ লেখা ছিল। গায়ে মলম দেয়ার জন্য আমার হাত বের করে দিত। কিন্তু একদিন টিউবটি আমার হাতে দেয়। তখন টিউবের গায়ে লাল অক্ষরে লেখা দেখি ‘প্রাপার্টি অব র্যাব এইচ কিউ’। এইচ কিউ অর্থ হেডকোয়ার্টার। যে কয়দিন আমি মেঝেতে বসতে পারতাম না সেই কয়দিন নামাজ পড়ার জন্য আমাকে একটি চেয়ার দেয়া হয়েছিল, চেয়ারের গায়ে লেখা ছিল আই এন টি।
একবার গরমের সময় আমার হিটস্ট্রোক হয়েছিল। তখন কয়েকদিনের জন্য একটি স্ট্যান্ড ফ্যান আমার সেলের ভেতর দেয়া হয়েছিল। স্ট্যান্ড ফ্যানের নিচের অংশে লেখা ছিল র্যাব-১। শীতকালে আমাকে যে কম্বল দেয়া হতো সেখানে কম্বলের কোণায় সাদা ফ্লুইড দিয়ে লেখা ছিল র্যাব বা আইএনটি। সেখানকার প্রহরীরা সাধারণত আমার সাথে কথা বলত না। কয়েক বছর পর একবার একজন প্রহরী নরম ভাষায় কথা বলছিল এতে আমি সাহস পেয়ে তাকে অভিযোগের সুরে বললাম এভাবে কোনো মানুষকে রাখা হয় কি না? উত্তরে সে বলল আপনি ভাগ্যবান যে আপনি বেঁচে আছেন। আপনার মনে পড়ে কি? যে আপনাকে আনার দিন আপনার ওজন নেয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, আপনাকে হত্যা করা হবে। এসিড দিয়ে আপনার চেহারা এবং হাত ঝলসে আপনার ওজন অনুযায়ী ইট বেঁধে বরিশালের নদীতে আপনাকে ফেলে দেয়া হবে। কিন্তু যিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়। এরপর আপনার বিষয়ে সিদ্ধান্তটি ঝুলে যায়। আপনি আরো সৌভাগ্যবান যে জিয়া এখন আর এখানে নেই। থাকলে আপনি এত দিন হায়াত পেতেন না।
প্রায়ই পরিদর্শনের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার সেলের সামনে আসতেন। তখন আমাকে সামনের হাতকড়া পেছন দিক দিয়ে পরিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসিয়ে রাখা হতো। আমি মোবাইলের আওয়াজ শুনে এবং দামি পারফিউমের ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারতাম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমি তাদের কথাবার্তা শুনতাম। আমি এদের মধ্যে হিন্দি ভাষায় কথোপকথন শুনেছি। আমি যখন গুম হই, তখন সে ছিল কর্নেল এবং পরে জেনারেল হয়। আমি জানতাম সে গুমের মাস্টারমাইন্ড। দ্বিতীয়জন যে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল সে ব্যক্তি সিলেটে সন্ত্রাসী হামলায় মারা যায়। আমাকে তিন বেলা খাবার দেয়া হতো। খাবারের পরিমাণ খুব সীমিত ছিল। আমাকে মুক্ত করার কয়েক মাস আগে থেকে খাবার খাওয়ার পরে আমার সারা শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হত। মনে হতো হাজারটি পিঁপড়া আমাকে কামড়াচ্ছে। খাবার পর প্লেট আমাকে নিজেকে ধুতে হতো। তখন আমি দেখতাম প্লেটে পানি পড়লে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো বুদবুদ উঠত। আমার তখন সন্দেহ হয় আমার খাবারে তারা কিছু মেশাচ্ছে। তখন আমি অধিকাংশ খাবার টয়লেটে ফেলে দিতাম। মাঝে মধ্যে ক্ষুধার কারণে কিছু খাবার পানি দিয়ে ধুয়ে খেতাম।
রমজান মাস এলে তারা আমাকে জানাত। ওই রমজান থেকে আমি হিসাব করতাম ভেতরে কত দিন ছিলাম। আমি আটটি রমজান ওই স্থানে অবস্থান করেছি। আমি অনেকবার তাদের কাছে কুরআন শরিফ চেয়েছিলাম, তারা আমাকে নিয়মের দোহাই দিয়ে কুরআন শরিফ দেয়নি। একজন প্রহরী আমাকে মধ্য রাতে জানায় আমরা মুসলমান কুরআন শরিফ আমরা দিতে চাই কিন্তু ‘র’-এর যে অফিসার আছে তার কারণে দিতে পারছি না। প্রথম রমজানের পর আমার শরীরে প্রচণ্ড খিঁচুনি হয়। তখন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার সেলে আসে। তখন আমি আবার তাদের কাছে কুরআন শরিফের জন্য অনুরোধ করি। তখন আমাকে কুরআন শরিফ দেয়া হয়। তখন আমার ঘরে একটি লাইট লাগিয়ে দেয়া হয় আর নির্দেশ দেয়া হয় দেয়ালের দিকে ফিরে চোখের বাঁধন হালকা লুজ করে কুরআন শরিফ পড়তে। যখনই প্রহরী আসার শব্দ পেতাম তখনই চোখের বাঁধন লাগিয়ে ফেলার কথা ছিল। পরবর্তীতে আমাকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তফসির গ্রন্থ দেয়ার অনুমতি দেয়। কিন্তু কখনই আমাকে ঘড়ি দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।
এভাবেই দিন অতিবাহিত হতো। এক দিন গভীর রাতে যখন আমি তাহাজ্জুত নামাজ পড়ছিলাম তখন কয়েকজন আমার সেলে প্রবেশ করে। চোখ সাধারণত সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত পোশাকের যে ফেব্রিক দিয়ে বাঁধা থাকত, তা খুলে গামছা দিয়ে চোখ বাঁধে। আর একটি গামছা দিয়ে হাত বাঁধে। তার পর আমাকে একজোড়া স্যান্ডেল দেয়া হয় এবং বলা হয় এই স্যান্ডেল পরেই আপনি এখানে এসেছিলেন। তার পর আমাকে পাঁচটি সিঁড়ি ওপরে নিয়ে পরে আবার কিছুদূর হাঁটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিয়ে আনে। সিঁড়িতে নামার সময় একটি জায়গায় আমি হোঁচট খাই যা আমি মুক্তির পর শনাক্ত করি কারণ ওই জায়গাটি একটু বাড়ানো ছিল। আমাকে একটি গাড়ির মেঝেতে শোয়ানো হয়। এরপর একজন প্রহরী আমার বুকের ওপর বসে আরেকজন আমার ঊরুর ওপর বসেন। গাড়ি আনুমানিক ৩০ মিনিটের মতো চলে। এরপর থেমে যায়। আমাকে সেই গাড়িতে শোয়া অবস্থা থেকে তুলে বসানো হয়। তখন একজন বয়স্ক লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, এত দিন কোথায় ছিলি? এবং আমরা কারা? আমি ভীত হয়ে বলি আমি জানি না। তখন তারা আমাকে বলে যে, সবাইকে এটাই বলবি। তার পর গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। আমি মনে করেছিলাম আমাকে হত্যা করা হচ্ছে। আমি সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকি যেন মৃত্যুটা সহজ হয়। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারি আমি একা। পরে আমি চেষ্টা করে চোখ ও হাতের বাঁধন খুলে ফেলি। আমি দূরে আলো দেখতে পাই, আমি ওই আলোর দিকে হাঁটতে থাকি। আলোর কাছে গিয়ে দেখতে পাই সেটি একটি নির্মাণাধীন ভবন এবং সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা ‘দিয়াবাড়ী, উত্তরা’। তখনো আমি জানি না যে, দেশে বিপ্লব হয়েছে। আমি আমার পরিচয় দিতে ভয় পাচ্ছিলাম। ওই ভবনের কর্মরত লোকদের বললাম যে, আমার সব কিছু ছিনতাই হয়েছে। আমি মিরপুর থাকি, কিভাবে যাবো সেখানে? তারা একটি দিকনির্দেশ করে সে দিকে আমাকে হাঁটতে বলে। কিছুদূর হাঁটার পর আমি উত্তরা (উত্তর) মেট্রোরেল স্টেশন খুঁজে পাই। তখন ফজরের আজান শুনি এবং লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে মসজিদ খুঁজে পাই। যেটা ছিল ১৫ নম্বর সেক্টর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। আমার মনে পড়ে উত্তরাতে একটি অলাভজনক মেডিক্যাল সেন্টার রয়েছে যেটা আমার বাবার প্রতিষ্ঠিত। আমি নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের কাছে ওই মেডিক্যাল সেন্টারে আমি কিভাবে যাবো, তা জানতে চাই। ইমাম সাহেব আমাকে ওই মেডিক্যাল সেন্টারে পৌঁছে দেন। ওই মেডিক্যাল সেন্টারের নাম ছিল ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার উত্তরা শাখা।
আমি সেখানে গিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে দারোয়ান আমাকে চিনতে না পেরে ঢুকতে বাধা দেয়। আমি গেটের বাইরে অপেক্ষা করি, যাতে কেউ আমাকে চিনতে পারে। পরে ম্যানেজার এলে তার কাছে আমি যাই। তিনিও আমাকে চিনতে পারে নেই। তখন আমি তাকে ইংরেজিতে বলি আই নিড হেল্প। তখন তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। আমি তখন তার মোবাইলটি চেয়ে নেই। মোবাইলটি নিয়ে গুগলে গিয়ে আমার নাম সার্চ করি। তখন আমার গুমের আগের ছবি ভেসে ওঠে। তখন আমি সেই ছবিটি আমি আমার মুখের পাশে ধরে বলি যে এই ছবির লোককে আপনি চিনেন কি না? তখন উনি আমাকে চিনতে পারেন এবং আবেগে কেঁদে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম এবং আমাদের ভাইকেও ফেরত পেলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম দ্বিতীয়বার স্বাধীন মানে কি? তার পর তিনি আমাকে কম্পিউটারে বিপ্লবের ভিডিও দেখান। তখনই দেখতে পাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে গেছে। তখন আমি বুঝতে পারি কেন আমি মুক্ত হয়েছি। তরুণরা রক্ত দিয়ে আমাকে মুক্ত করেছে। আমার মেডিক্যাল সেন্টারে যাওয়ার বিষয়টি তাদের সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড করা আছে। আমার ফিরে আসা সম্পর্কে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়। যেটা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে আমাকে দেখা যাচ্ছে। প্রামাণ্যচিত্রে ইবনে সিনা সিসি টিভিফুটেজ ছাড়া অন্যান্য বিষয় সংযুক্ত বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে টিউলিপ সিদ্দিককে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ এবং আমার বিষয়ে উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে। শেখ হাসিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছে। গুমের শিকার মানুষদের সম্পর্কে বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করছে।’ তার এই জবানবন্দী চলমান রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে রয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, শাইখ মাহদীসহ অন্যরা। আসামিপক্ষ ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরাও উপস্থিত রয়েছেন।
এ মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন- র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
শেখ হাসিনাসহ পলাতকরা হলেন শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।
এর আগে ২৩ ডিসেম্বর এ মামলায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই সাথে সূচনা বক্তব্যসহ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম দিনের সাক্ষ্য শুরু হলো।