গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক আমার দেশ প্রত্রিকার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “ধামরাইয়ে স্বামীকে খুঁটিতে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ হিন্দু যুবকদের”।
আমার দেশ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে হিন্দু বাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক মুসলিম গৃহবধূ। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বামীকে ঘরের খুঁটির সঙ্গে রশি দিয়ে বেধে রেখে ওই গৃহবধূকে পালা ক্রমে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। সেইসঙ্গে গৃহবধূর পরনে থাকা কানের দুল, গলার চেন ও হাতের বালা সহ সাড়ে তিন ভরি ওজনের স্বর্ণের গহনা ও ছিনিয়ে নেয় ওই সংঘবদ্ধ ধর্ষণকারীরা। এ সঙ্গবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাতে (১৫ জানুয়ারি) উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা রামরাবন গ্রামের শান্তি রানী মনিদাসীর বাড়িতে।”
নামহীন “সংশ্লিষ্ট সূত্র”র বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মানিকগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও ধামরাই উপজেলার পাবরাইল এনডি কনস্ট্রাকশন ফার্মের গাড়ি চালক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক তার সহধর্মিনীকে নিয়ে বালিয়াটি প্রাসাদে ঘুরতে যান রাম রাবণ গ্রামের ফনি চন্দ্র মনি দাসের ছেলে ও এন ডি কনস্ট্রাকশন ফার্মের নিরাপত্তা কর্মী কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস কে সঙ্গে করে। দিনশেষে সন্ধ্যার দিকে রামরাবন গ্রামের ওই কৃষ্ণচন্দ্র মনিদাসের বাড়িতে বেড়াতে যান, ওই এনডি কনস্ট্রাকশন ফার্ম এর গাড়ি চালক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক ও তার সহধর্মিনী। ওই বাড়িতে মন্দির প্রাঙ্গণে পৌষ পার্বণ চন্দ্র মনি দাস আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রীকে রাত্রি যাপনের জন্য কৃষ্ণচন্দ্র মনিদাস এর বোন শান্তি রানী দাস এর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাত বারোটার দিকে পাঁচ সাত জন হিন্দু যুবক চাপাতি ও রামদা সহ ধারালো অস্ত্রের মুখে চিমনি করে গাড়ি চালক আব্দুর রাজ্জাককে রশি দিয়ে বেঁধে রেখে তার সহধর্মিনীকে জোরপূর্বক পালা ক্রমে রাতভর ধর্ষণ করে।”
অর্থাৎ, এই ঘটনায় মূলত দুটি অভিযোগ। প্রথমটি হচ্ছে, বেড়াতে এসে ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মুসলিম গৃহবধু। আর দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, ছিনতাই ও ধর্ষণকারীরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
আমার দেশ-এর আগে এই ঘটনা নিয়ে গত ১৭ জানুয়ারি প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, “ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ”।
১৮ জানুয়ারি দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকাও একই প্রতিবেদন প্রকাশ করে “ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ” শিরোনামে।
তবে ভিন্ন শিরোনামে তিনটি আলাদা পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হলেও মূলত প্রতিবেদনটির টেক্সট সব পত্রিকায় একই ছিল। এমনকি কয়েকটি প্যারা সবগুলো প্রতিবেদনে হুবহু একই রকম। তিনটি পত্রিকা তাদের নিজ নিজ ‘ধামরাই প্রতিনিধি’র ক্রেডিটে প্রতিবেদনটি ছাপালেও কোন প্রতিবেদনেই ভুক্তভোগীদের কোন বক্তব্য নেই।
এই খবর প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। ‘একদল হিন্দু পুরুষ দ্বারা একজন মুসলিম গৃহবধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’-- এই বয়ানে অনলাইন এক্টিভিস্টদের অনেকে ঘটনাটিকে নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তবে যুগান্তর, দেশ রূপান্তর এবং আমার দেশ এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোন সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়নি। এতে কতিপয় অনলাইন এক্টিভিস্ট অভিযোগ তুলেছেন, ‘হিন্দুদের দ্বারা মুসলিম নিপীড়িত হওয়ায়’ মিডিয়া এই খবর এড়িয়ে যাচ্ছে।
এসবের প্রেক্ষিতে দ্য ডিসেন্ট সরেজমিনে ঘটনাটি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।
সরেজমিনে গিয়ে যা জানা গেল
তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজন, ভুক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি এবং পুলিশের সাথে কথা বলে দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিনিধি উল্লিখিত তিনটি পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে ভিন্ন চিত্র পেয়েছেন।
প্রথমত, ওইদিন সেখানে ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ জানেন না। এমনকি যে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে তার ‘স্বামী’ বলে পরিচয় দেয়া ব্যক্তিটিও দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, তার ‘স্ত্রী’ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তার জানা নেই এবং এমন কথা তিনি কাউকে বলেননি।
স্বামী পরিচয় দেয়া আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, “ঘটনার সময় দুইজন হামলাকারী ঘরে ঢুকে আমাকে মারধর করে এবং সাথে থাকা মানিব্যাগসহ মোবাইল ও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যায়। আর আমার স্ত্রীকে বাইরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে ওরা চলে গেলে বাইরে এসে কিছু জায়গা দূরে স্ত্রীকে পাই কান্নাকাটি করতেছে। ওর কাছে থাকা ব্যাগ এবং টাকায় পয়সা এবং কিছু অলংকার নিয়ে চলে গেছে বলে আমাকে জানায়। তাকে শারিরীক কোন ক্ষতি করেছে বলে আমার স্ত্রী আমাকে কিছু বলেনি।”
ঘটনার অল্পক্ষণ পরই প্রতিবেশি যারা ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন তাদের কেউও ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটেছে বলে জানেন না। ভুক্তভোগী স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেয়া ব্যক্তিদ্বয়ও তখন তাদেরকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোন তথ্য দেননি। এবং তাকে খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার যে তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে তা অস্বীকার করেছেন আব্দর রাজ্জাক। স্থানীয়রাও খুঁটিতে বেঁধে মারধরের কোন ঘটনা শুনেননি।
স্বামী পরিচয় দেয়া আব্দুর রাজ্জাক দ্য ডিসেন্ট-কে বলেছেন, তিনি কোন সাংবাদিকের সাথেও এই ঘটনার পর কথা বলেননি। তিনটি পত্রিকায় ধর্ষণের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে তাতেও অবশ্য আব্দুর রাজ্জাক বা তা স্ত্রী পরিচয় দেয়া নারীর বরাতে কোন বক্তব্য ছিল না। যা প্রকাশিত হয়েছে তা ছিল নামহীন ‘সংশ্লিষ্ট সূত্র’ বা ‘স্থানীয় সূত্র’ এর বরাতে।
এই ঘটনায় থানায় কোন অভিযোগও করেননি ভুক্তভোগীরা।
দ্বিতীয়ত, ছিনতাইয়ের ঘটনায় (এবং তিনটি সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী ধর্ষণে) জড়িত ব্যক্তিদের কোন পরিচয় কেউ জানে না। ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক দ্য ডিসেন্ট-কে বলেছেন, “ওরা মাংকি টুপি পরা ছিল। নাক-মুখ ঢাকা ছিল। আর রাতের বেলা। লাইট অফ করে দিয়েছিল ঘরে ঢুকার আগে। কাউকে আমি দেখিনি ভাল করে। এখন দেখলেও চিনবো না।”
স্থানীয়রাও জানিয়েছেন, তারা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে দেখেছেন ছিনতাইকারীরা চলে গিয়েছে। একজন নারী জানান তিনি চিল্লাচিল্লি শুনে ৪/৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি আসার আগেই হামলাকারীরা চলে যায়। এলাকার অন্য কেউও তাদেরকে দেখেনি। ফলে, তারা মুসলিম নাকি হিন্দু বা তাদের নাম পরিচয় কী- এসব কারো জানার সুযোগ হয়নি।
মারধর করে টাকা ও অলংকার লুট করা হয়েছে
ঘটনাস্থলটি সাটুরিয়া-কাওয়ালীপাড়া সড়কের সাটুরিয়াগামী সড়ক থেকে বাম দিকে রামরাবন এলাকায়। ওই এলাকায় পাকা সড়ক থেকে বাম দিকে কাঁচা সড়কের প্রায় ৩০০-৪০০ মিটার দূরে বামে এক কক্ষের টিনের ঘর। ওই বাড়িতে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন শান্তি মনি দাস। বাড়িটিতে একটি রান্নাঘর ও এটির পেছনে টিউবওয়েল ও বাথরুম।
ঘটনার দিন মেহমান (আব্দুর রাজ্জাক ও তার কথিত স্ত্রী) আসায় নিজ ঘরে তাদের থাকতে দিয়ে নিজে ভাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন শান্তি মনি দাস ও তার কন্যা। ঘটনার বিষয়ে পর দিন জানতে পারেন তিনি।
বাড়িটির পশ্চিমে বাড়ির মালিক পরেশ রাজবংশী, উত্তর পশ্চিমে ডানে বাড়ির তাপস সাহা, চন্দ্র মোহন, পূর্বে কৃষি জমি, উত্তরে পতিত জমি, গাছপালা আছে। আর দক্ষিণে নেপাল চন্দ্র মনি দাসের বাড়ি।
কথা হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। মধ্যরাতে ওই বাড়িতে মারধরের আওয়াজ পেয়ে বাড়িটিতে যান পাশের বাড়ির বাসিন্দা গৃহবধূ শিল্পী মনি দাস ও তার স্বামী নেপাল চন্দ্র মনি দাস। দুপুরের সময়ে বাইরে কাজে থাকায় স্বামী নেপাল চন্দ্র মনিকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
শিল্পী মনি দাস বলেন, “রাত ১টার দিকে হঠাৎ মারামারির শব্দ শুনি, এসে দেখি কেউ নাই, শুধু তারা দুইজন ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। পরে ওই মহিলা বললো, তার কানের দুল, গহনা, টাকা, মোবাইল নিছে। আর কাউকে দেখিনি। কোনো বেঁধে রাখার চিহ্ন দেখিনি। প্রায় ৪/৫ মিনিট ধরে ঘটে এই ঘটনা।”
মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা শুনে রাতেই ঘটনাস্থলে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, “রাতের বেলা আমি আমার বাসায় শুয়ে ছিলাম। আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে কৃষ্ণ দাদা ডাক দিয়ে আমাকে ওঠান। তিনি জানান, পাশের একটি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। খবর শুনে আমরা দ্রুত ওই বাড়িতে যাই। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরে দেখি, সেখানে ওই মহিলা কান্নাকাটি করছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, “ভাবি, কী হয়েছে? কেন কাঁদছেন?” তখন তিনি বলেন, তার কাছে মোট ২২ হাজার টাকা ছিল। এর মধ্যে আগে ৫ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছিল। বাকি প্রায় ১৭-১৮ হাজার টাকা চোরেরা নিয়ে গেছে। পাশাপাশি তার দুইটি কানের দুল, একটি নাকফুল এবং আরেকজনের একটি চেইন চুরি হয়েছে বলে জানান।”
আমি তাকে বলি “আপনি কাঁদবেন না। আপনার স্বামী বা কোনো পরিচিত মানুষ কি এসব নিয়ে গেছে?” তিনি বলেন, “না ভাই, আমার পরিচিত কেউ কিছু নেয়নি। তারা অপরিচিত ছিল। আমার স্বামীকে দুজন মারধর করে আমার জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে।”
ঘটনাস্থলে আমি কাউকে গাছে বেঁধে রাখা বা এ ধরনের কোনো আলামত দেখতে পাইনি। শুধু দেখেছি, তিনি ঘরের ভেতরে বসে কান্নাকাটি করছিলেন।
এ বিষয়টি পর দিন লোকমুখে জানতে পারেন স্থানীয় বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস।
তিনি বলেন, “আমি বৃহস্পতিবার সকালে জানতে পারি একটা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসে আমি কাউকেই পাইনি। আমার কাছে কেউই আসেনি। কোনো সহযোগিতাও চায়নি। যদি সহযোগিতা চাইতো, আমি অবশ্যই সহযোগিতা করতাম। তবে ওই সময় যারা উপস্থিত ছিল, বা পরে যারা এসেছে সবাই বলেছে, মালামাল নিয়েছে। কিন্তু আর কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
কী বলছেন ওই ঘরের মালিক শান্তি মনি?
রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাসের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তার ঘরেই ভাই কৃষ্ণ চন্দ্র মনির মেহমান হিসেবে এসে রাত কাটাচ্ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেয়া নারী। মেহমানদের জায়গা করে দিতে তিনি বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলেন মেয়েকে নিয়ে।
শান্তি মনি জানান, ঘটনার পরে সকালে তিনি এসব জানতে পারেন।
কথা হয় আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রীকে আতিথেয়তা দেওয়া কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস ও তার পরিবারের সঙ্গেও।
কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস জানান, ওই দিন বিকেলের দিকে রাজ্জাক তার স্ত্রীসহ ঘুরতে আসবেন বলে জানান। বিকেল ৫টার দিকে রাজ্জাক রামরাবন এলাকায় আসেন। কৃষ্ণ মনি দাস তাদের দুজনকে তার ও তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাদের ঘুমানোর জন্য তার বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে বোনের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রেখে তিনি নিজের বাড়ি চলে আসেন। এরমধ্যে রাত দেড়টার দিকে রাজ্জাক এসে তাকে গহনা, টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এর পরিপ্রেক্ষিত কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস তার স্বজনদের নিয়ে বোনের বাড়ি যান। এরপর তিনি ওই ঘটনার বিবরণ শুনতে পান ওই নারীর কাছ থেকে।
কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস বলেন, “রাজ্জাক ভাই ও আমরা দুইজন এনডিইতে কাজ করি। রাজ্জাক ভাই আমাকে ফোন দিয়ে জানালেন তার স্ত্রীসহ ঘুরতে আসবেন, রাতে থাকবেন। সন্ধ্যায় তিনি আসেন। পরে আমার বাড়ি জায়গা না থাকায় তাদের আমার বোনের বাড়িতে থাকতে দেই। রাত ১০টার দিকে তিনি (ফোন করে) জানান, অচেনা একজন এসে তাদের দরজায় নক করেছে। একাধিকবার নক করার পর দরজা খুললে তাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জানতে চেয়েছে। তারা নিজেদের পরিচয় দিলে ওই অচেনা লোকটি চলে যায়। এরপর আবার রাত দেড়টার দিকে ৪/৫ জন এসে দরজা খুলতে বলে তাদের। ভয়ে প্রথমে দরজা খোলেননি। পরে তাদের হুমকিতে দরজা খোলার পর রাজ্জাককে মারধর করে ও তার সঙ্গে থাকা নারীর গহনা, ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়।”
সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছিল বলে তিনি কিছু জানেন কিনা জানতে চাইলে কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, “আমি তাকে (রাজ্জাকের স্ত্রী) ওই সময় জিজ্ঞেস করি, তাকে কোনো অসম্মান করা হয়েছে কিনা। তিনি জানান তার স্বামীকে মারধর করা হয়েছে। আর তার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। আর কিছু ঘটেনি।”
এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্ট এর সাথে একাধিকবার কথা হয়েছে আব্দুর রাজ্জাকের। ঘটনা সম্পর্কে তার দেয়া বর্ণনা কৃষ্ণ চন্দ্র বা তার বোনের সাথে মিলে যায়।
রাজ্জাক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, “আমার স্ত্রী বালিয়াটি রাজবাড়ি বেড়াতে আসেন। বিকেলের দিকে আমিও যাই। এরপর আমি রাতে থাকা যাবে কিনা, সেজন্য যোগাযোগ করি কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে। এরপর আমরা রামরাবন আসি। তার বাড়ি আসার পর রাতে তার বোনের বাড়িতে ঘুমাতে যাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক যুবক এসে দরজা খুলতে বলে। আমার স্ত্রী বলল, দরজা খুলে দিন, আমরা তো চোর নই। আমি দরজা খুলে দেই। এরপর তারা আমাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জিজ্ঞেস করে। আমরা বলার পর সে চলে যায়। এরপর রাত দেড়টার দিকে আবারও পাঁচজন ব্যক্তি এসে দরজা খুলতে বলে। এরপরই তাদের মালামাল ছিনিয়ে নেয় তারা।”
“দরজা খোলার পরই তারা বাইরের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর চারজন ঘরে ঢুকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে ও আমার মানিব্যাগ থেকে ১৩০০ টাকা নেয়। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, তার কানের দুল, নাক ফুল, গলার স্বর্ণের চেইন ও ১৭ হাজারের মতো টাকা ছিনিয়ে নেয়। তারা আমাকে মারধর করে লাথি দেয়। এই ঘটনা আমাকে কাউকে জানাতে নিষেধ করে প্রায় পাঁচ মিনিট পর চলে যায়। পরে আমি পুরো ঘটনা কৃষ্ণ দা’কে জানাই। আমি কাউকে চিনতেও পারিনি”, বলেছেন রাজ্জাক।
স্ত্রীকে ধর্ষণ ও বেঁধে মারধরের বিষয়ে প্রশ্ন করলে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি। তবে তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি যোগাযোগ করিয়ে দিতে রাজি হননি। জিজ্ঞেস করলে তার নাম পরিচয়ও জানাননি।
রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে পাওয়া গেল তার স্ত্রী আরেক নারী!
গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে দ্য ডিসেন্ট এর সাথে তৃতীয় দফায় কথা বলার পর থেকে আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
রাজ্জাকের স্ত্রীর বিষয়ে খোঁজ নিতে তার কর্মস্থল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এনডিই) কর্মস্থলে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক।
এনডিই এর স্টোর ইনচার্জ অশীষ কুমার জানান, ওই ঘটনার পর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। ফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি কাজে আসছেন না বলে ইনচার্জকে জানিয়েছিলেন।
এদিকে কর্মস্থল থেকে পাওয়া রাজ্জাকের ভোটার আইডি কার্ড ধরে তার গ্রামের বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। তিনি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে রাজ্জাকের স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি জানান, ঘটনার দিন তিনি ধামরাইয়ের রামরাবন গ্রামে যাননি। দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিবেদককে নিজের নাম পরিচয় জানিয়েছেন এবং তার ও রাজ্জাকের দুটি সন্তান আছে বলে জানান। গত ১৫ জানুয়ারি স্বামীর বালিয়াটি রাজবাড়ি ঘুরতে যাওয়া নিয়ে তিনি কিছুই জানে না বলেও জানান। এটাও জানিয়েছেন ওইদিন তিনি তার স্বামীর সাথে ছিলেন না। এর আগেও কখনো তার কর্মস্থলে যাননি।
মিডিয়াতে ঘটনাটি যেভাবে এলো
এ সংক্রান্ত প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দৈনিক যুগান্তর তাদের ধামরাই প্রতিনিধির ক্রেডিটে। এরপরে দেশ রূপান্তর এবং আমার দেশ-এ ওই প্রতিবেদনের প্রায় হুবহু কপিই প্রকাশিত হয়েছে।
যুগান্তর এর ধামরাই প্রতিনিধি শামীম খানের সাথে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তিনি জানান, তাকে এই খবরটি জানিয়েছেন স্থানীয় আব্দুল মান্নান, যিনি নিজেও স্থানীয়ভাবে সাংবাদিকতায় জড়িত। আব্দুল মান্নান তাকে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলের প্রতিবেশি নেপাল চন্দ্র মনি দাস নামে এক ব্যক্তি ধর্ষণের খবর তাকে জানিয়েছিলেন। দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিনিধি নেপাল চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে স্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন, যা এই প্রতিবেদনের উপরে বর্ণিত হয়েছে। নেপাল চন্দ্র এবং আব্দুল মান্নানের মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি।
যুগান্তর এর প্রতিনিধি শামীম খান তাদের প্রতিবেদনে রাজ্জাক বা তার কথিত স্ত্রীকে উদ্ধৃত করে কিছু লিখেন নি। আপনি কি ভুক্তভোগীদের সাথে নিজে কথা বলে ঘটনার বর্ণনা লিখেছেন– এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শামীম খান বলেছেন, ‘ঘটনার সব বিস্তারিত মান্নানের কাছে আছে।’
যদিও মান্নানকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, মান্নানের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে চাঁদাবাজিকালে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ৪টি মামলা রয়েছে।
যা বলছে পুলিশ
মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।
ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এখানে পালাক্রমে ধর্ষণ বা কোনো নারীর উপর যৌন নিপীড়নের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, যারা এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ করতে চাইবেন, তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত হারাধন নামে কোনো এসআই নেই বলে জানান ওসি।
খোঁজ নিয়ে ধামরাই থানায় আরাধন চন্দ্র সাহা নামে একজন এসআই রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। কোনো লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।