Juel M. Hasan (জুয়েল এম. হাসান)
আমাদের দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সন্দিহান। কারণ আমরা বহুবার দেখেছি- নির্বাচনের আগে সবাই বড় বড় কথা বলে কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেগুলো দিব্যি ভুলে যায়।
প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের কূটনৈতিকদের উপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিটে হরেক রকমের উচ্চাভিলাসী ও কাল্পনিক সুযোগ সুবিধার ফিরিস্তি শুনে মনে হতেই পারে-
এত এত সুবিধা দিতে গেলে টাকা আসবে কোথা থেকে? এটা কি আদৌ সম্ভব? নাকি এইটাও একটা নির্বাচনী ভাওতাবাজি?
এই ব্যাপারটাই একটু দেখা যাক-
আজকের পলিসি সামিটের সবচেয়ে স্ট্রেংথ হলো-
শুধু সুযোগ সুবিধার লম্বা তালিকা দিয়ে স্বপ্ন দেখায়নি বরং টাকা কোথা থেকে কিভাবে আসবে, খরচ কেমন হবে, কারা সুবিধা পাবে এবং কিভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সেটাও পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে।
সেই বিবেচনায় পুরো সামিটকে ছয়টি আলাদা কিন্তু পরস্পর–সংযুক্ত সেশনে সাজানো হয়েছে এভাবে-
Governance Framework, Economy & Investment, Youth Employment, Women & Inclusion, Education for the Future এবং Health Matters.
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার।
জামায়াত অনেক গুলো পলিসির কথা বলেছে, যার বড় একটি অংশ আদতে বাংলাদেশে আগেও ছিল, এখনো কাগজে কলমে আছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে।
কিন্তু দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাবে সেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর হয়নি।
এজন্যই জামায়াত শুরুতেই Good Governance–কে ফাউন্ডেশন হিসেবে পিক করছে। কারণ শাসন ঠিক না থাকলে নতুন বাজেট দিলেও লাভ নেই, আর শাসন ঠিক থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই নতুন অবকাঠামো ছাড়াই শুধু proper planning ও management দিয়েই বিরাট আউটপুট পাওয়া সম্ভব।
সিটিজেন-সেন্ট্রিক (নাগরিক–কেন্দ্রিক) সুবিধাগুলো যদি দেখি, Health Matters সেশনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ৫ বছরের নিচে সকল শিশু এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে সকল নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ‘First 100 Days Program’-এর আওতায় প্রসূতি নারী ও মায়েদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সহায়তা দিবে রাষ্ট্র।
এখানে কারা সুবিধা পাবে, কোথায় পাবে -সবই স্পেসিফাইড।
Education for the Future সেশনে বলা হয়েছে-
৫ লাখ গ্রাজুয়েটের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, ১ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর মাসিক শিক্ষা সহায়তা, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর ১০০ শিক্ষার্থী পাঠানো এবং ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে।
Youth Employment সেশনে উঠে এসেছে সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের রূপরেখা-
৫ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে স্কিল ট্রেনিং, প্রতিটি উপজেলায় Youth Tech Lab, প্রতিটি জেলায় জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক, ৫ লাখ উদ্যোক্তা এবং ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সার তৈরি করবে। অর্থাৎ শিক্ষা শেষ করে তরুণরা আর অনিশ্চয়তায় ঝুলে থাকবে না, তাদের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ আছে।
এগুলো সব নাগরিকের হাতে পৌঁছাবে একটি Smart Social Security Card –এর মাধ্যমে।
মানে আলাদা আলাদা অফিসে ঘুরতে হবে না, দালালের পেছনে দৌড়াতে হবে না। এক কার্ডেই পরিচয়, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা। এতে সুবিধা যেমন দ্রুত পৌঁছাবে, তেমনি অপচয় ও দুর্নীতিও কমবে।
এখন আসি সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়। টাকা আসবে কোথা থেকে?
এখানে কোনো ম্যাজিক ট্যাজিক নাই বরং খুব সিম্পল, বাস্তব এবং দৃশ্যমান একটা চেইন পোট্রে করেছে। যেটা Economy এবং Investment সেশনে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত,
সরকার নতুন করে টাকা ছাপাবে না। বিদ্যমান বাজেটকে পুনর্বিন্যাস করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত,
বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা কলকারখানা পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) -এ আবার চালু করা হবে, যেখানে শ্রমিকদের ১০% মালিকানা দেওয়া হবে।
কারখানা বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র কিছুই পায় না, কিন্তু চালু হলে উৎপাদন হয়, চাকরি হয়, ট্যাক্স আসে। এটাই রিয়েলিস্টিক ইকোনমি।
সাথে যোগ করা হইছে শিল্পখাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা,
পরিকল্পিত শিল্পনীতির অংশ হিসেবে প্রথম তিন বছর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি চার্জ মওকুফ করবে সরকার। শিল্প কারখানার খরচ যখন স্থির থাকবে বা কমবে, তখন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী বুঝবে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কম, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিবেচনা করা যায়।
এই কারণেই এই নীতি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ফলে কী হবে?
নতুন শিল্প আসবে, পুরনো শিল্প সম্প্রসারিত হবে, উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, আর সরবরাহ বাড়লে জিনিসপত্রের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে।
অর্থাৎ, এই পলিসি শিল্পবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার জন্যও ইতিবাচক।
অনেকে বলে,
ট্যাক্স কমালে তো সরকারের আয় কমে যাবে। বাস্তবে হয় উল্টোটা। Tax ও VAT যদি ব্যবসা-বান্ধব হয়, তাহলে ব্যবসা বাড়ে, নতুন বিনিয়োগ আসে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় আর দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও বাড়ে।
জামায়াত এখানে স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা না করে সাসটেইনেবল ইকোনমির কথা ভাবছে।
Youth Employment ও ICT Vision-2040.
লক্ষ লক্ষ তরুণ যদি স্কিল ট্রেনিং, ইয়ুথ টেক ল্যাব, জেলা জব ব্যাংক এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করে ডলার আনে, সেটাই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী আয়ের টেকসই সোর্স।
এবার পুরো চেইনটা খুব খেয়াল করলে বুঝা যাবে সাইকেলটা ঠিক কেমন।
Good Governance → দুর্নীতি কমে → বিনিয়োগ বাড়ে →
নতুন নতুন শিল্প কারখানা তৈরি হয় → চাকরি বা
কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় → মানুষ আয় করে → সরকার
রেভিনিউ বা রাজস্ব পায় → সেই রাজস্ব থেকেই শিক্ষা,
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা টেকসইভাবে চলে।
এই কারণেই বলা যায়,
জামায়াতের ইশতেহার উচ্চাভিলাসী হলেও সেটা জটিল কিছু না। বরং খুবই simple, chain-based এবং corruption-free হলে বাস্তবায়নযোগ্য।
আর দুর্নীতির প্রশ্নে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ক্লিনসিটের দাবিটা বাস্তবভাবে শুধু জামায়াতই করতে পারে। এই কনফিডেন্সটাই তাদের পলিসির সবচেয়ে বড় স্ট্রেংথ।
বলতেই হয়,
এমন বাস্তবসম্মত, ওয়েলফেয়ার-ওরিয়েন্টেড ইশতেহারের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা উন্মোচন করেছে, যা এতদিন কোনো বড় দল করে দেখাতে পারেনি।
চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে।
নাম্বার ওয়ান চ্যালেঞ্জ হলো, লাগামহীন দুর্নীতি।
জামায়াত যেহেতু সৎ ও ক্লিন লিডারশিপ দেওয়ার কথা বলছে, তাই শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা শুধু উপরে নয়। দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে আছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা সব জায়গাতেই বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া এক ধরনের দুর্নীতির অভ্যাস আছে, যেটা একদিনে ভাঙা যাবে না।
এই জায়গাটাই জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ নীতি ঠিক থাকলেই হবে না, বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কঠোর জবাবদিহিতা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জিরো টলারেন্স নিশ্চিত করতে হবে।
এখানেই Smart Social Security Card, ডিজিটাল পেমেন্ট, ICT-based সার্ভিস ডেলিভারি এবং গুড গভর্নেন্স ফ্রেমওয়ার্কের গুরুত্ব বেড়ে যায়। যত বেশি সুবিধা সরাসরি নাগরিকের হাতে যাবে, যত কম মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে তত বেশি দুর্নীতির খাত কমে আসবে।
তবুও বাস্তবতা হলো- দুর্নীতি পুরোপুরি থামানো একদিনের কাজ নয়। এটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সামাজিক মূল্যবোধ; তিনটাকেই একসাথে কাজ করতে হয়। জামায়াতের জন্য এই চ্যালেঞ্জটা একদিকে কঠিন, আবার অন্যদিকে তাদের ঘোষিত পলিসির সবচেয়ে বড় credibility test.
ভাবুন তো,
জামায়াতের ইশতেহার উচ্চাভিলাসী হলেও সেটা কি পুরোপুরি কল্পনাভিত্তিক?
মোটেও না বরং এটা এমন একটি পরিকল্পনা, যেখানে দুর্নীতি কমাতে পারলেই অধিকাংশ পলিসি অটো-মেটিক্যালি কাজ করতে শুরু করবে।
কারণ অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট কোন সমস্যা না, বরং অর্থের অপচয় ও ভুল ব্যবস্থাপনার কারণেই জনকল্যাণমুখী প্রজেক্ট মুখ থুবড়ে পড়ে।
প্রথাগত রাজনৈতিক বিরোধিতা আরেকটা চ্যালেঞ্জ। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো এমন একটি নাগরিক-কেন্দ্রিক welfare plan -কে নির্বাচনের আগ থেকেই নেগেটিভভাবে উপস্থাপন করবে, কিছু মানুষ বিভ্রান্তও হবে।
এজন্যই জামায়াতকে ব্যাপক, ধারাবাহিক ও সহজ ভাষায় প্রচারণা চালাতে হবে যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিরোধী দলের স্কলার পর্যন্ত সবাই বুঝতে পারে এই চেইনটা কিভাবে কাজ করে।
প্রকৃতপক্ষে,
এই পুরো পরিকল্পনা এভাবেই একটি inter-linked welfare chain তৈরি করবে যা একদিকে বেকারত্ব কমাবে, উৎপাদন বাড়াবে, মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, আর অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, টেকসই ও মানবিক welfare state গড়ে তোলার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করবে।
জনগন কি বুঝবে? গ্রহণ করবে? দেখা যাক!