ঢাকার রিকশা খাতে প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দ্রুত রূপান্তরের চিত্র তুলে ধরেছে ইনোভেশন কনসাল্টিং-এর সর্বশেষ গবেষণা। ‘আরবান মোবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানসিশন’ শীর্ষক এই গবেষণায় নগর পরিবহন, যানজট, সড়ক নিরাপত্তা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটায় রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় গবেষণার মূল ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাংলা টেসলা’ নামে পরিচিত ব্যাটারিচালিত রিকশা যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ায় গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ইনোভেশন কনসাল্টিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরোয়ার গবেষণার প্রধান ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই গবেষণায় চালক, যাত্রী ও গ্যারেজ মালিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকার রিকশা ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ৩৮৪ জন রিকশা চালক, ৩৯২ জন যাত্রী এবং ৬৩ জন গ্যারেজ মালিকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার রিকশা খাতের বড় অংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরে। ৯৭.৪ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা এবং ৮৫.৯৪ শতাংশ প্যাডেল রিকশা নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে। এছাড়াও ব্যাটারি রিকশা তুলনামূলকভাবে তরুণ চালকদের আকৃষ্ট করছে। ব্যাটারি রিকশাচালকদের গড় বয়স ৩৮ বছর, যেখানে প্যাডেল রিকশাচালকদের গড় বয়স ৪২ বছর।
দেখা গেছে, ব্যাটারি রিকশাচালকদের গড় দৈনিক মোট আয় ৮৮০ টাকা, যা প্যাডেল রিকশা চালকদের ৫৯৪ টাকা আয়ের তুলনায় বেশি। তবে উচ্চ ভাড়ার কারণে ভাড়াকৃত ব্যাটারি রিকশার নিট আয় কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের মালিকানাধীন ব্যাটারি রিকশা চালকরাই সবচেয়ে বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারেন। ব্যাটারি রিকশাচালকরা মূলত ভাড়া ও মাইক্রোফাইন্যান্স ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
যাত্রীদের সুবিধা ও উদ্বেগ
গবেষণায় দেখা যায়, যাত্রীরা প্রধানত ১ থেকে ৩ কিলোমিটার স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য রিকশা ব্যবহার করেন। ৮২ শতাংশ যাত্রী দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে ব্যাটারি রিকশা বেছে নেন। তবে দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে স্পষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাটারি রিকশায় দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং দুর্ঘটনায় আঘাতের মাত্রাও গুরুতর।
যানজটের জন্য দায়ী
যাত্রীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ মনে করেন, ব্যাটারি রিকশা ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে জনসমর্থনও জোরালো-৫৬.৬ শতাংশ কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং ২১.৯ শতাংশ সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ গ্যারেজ মালিকের প্রধান জীবিকা রিকশা ভাড়া। অধিকাংশ মালিক ব্যাটারি রিকশাকে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক মনে করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও মেরামতসংক্রান্ত সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন।
গবেষণায় ব্যাটারি রিকশা ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করতে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ব্যাটারি রিকশার নকশা মানসম্মত করা; প্যাডেল থেকে ব্যাটারিতে রূপান্তরে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন; স্বল্পসুদে ঋণের মাধ্যমে নিবন্ধন ও আনুষ্ঠানিকতা উৎসাহিত করা; চালকদের জন্য ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি; বিকল্প স্বল্প দূরত্ব পরিবহন ব্যবস্থা ও হাঁটাচলার অবকাঠামো উন্নয়ন।
ইনোভেশন কনসাল্টিং মনে করে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত রূপান্তরের মাধ্যমে রিকশাকে ঢাকার একটি নিরাপদ ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ইনোভেশন কনসাল্টিং একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা পরামর্শ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। নগর পরিবহন সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করাই এই গবেষণা উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।