‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ’ বিশেষ বিধানে নেপাল থেকে ৫০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির একটি চুক্তি করেছিল সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই বিশেষ বিধান বাতিলের পাশাপাশি চুক্তিটিও বাতিল করে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নেপাল থেকে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ আমদানি করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ দিনের পানিসম্পদ ব্যবহারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, চুক্তি বাতিল করায় তা ভেস্তে গেলো। যদিও আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়— সেটিই এখন দেখার বিষয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এমন প্রেক্ষাপটে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বিকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিএনপিকে দেশের বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা তারেক রহমানের সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, বিগত সরকারের সময় হওয়া দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট জল বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া অনুমোদন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই চুক্তিটিও এর আগের সরকার বিদ্যুৎ-জ্বালনি দ্রুত সরবরাহের জন্য বিশেষ বিধানে করেছিল। কিন্তু একই বিধানে নেপাল থেকে আনতে চাওয়া ৫০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ আমদানির একটি চুক্তি বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বিধানে হওয়া দুটি চুক্তির ক্ষেত্রে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হলে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি লাভজনক হতো। লাভজনক এই অর্থে বিবেচনা করা হচ্ছে যে, এতে বাংলাদেশও বিদ্যুৎ রফতানির সুযোগ পেতো। নেপালে শীতের সময় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পানি বরফে রূপান্তরিত হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্নিত হয়। অপরদিকে শীতের সময় আমাদের বিদ্যুৎ চাহিদা কমে যায়। এতে করে বাংলাদেশের বেশিভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন না করে বসে থাকে। নেপালের ঠিক যে সময়ে ঘাটতি তৈরি হয়, ওই সময় বাংলাদেশে চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই কারণে শুধু আমদানি না নেপালে রফতানিরও সুযোগ তৈরি হতো।
জানা যায়, নেপাল থেকে এখন যে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আনা হচ্ছে— তার দাম পড়ছে ৮.১৭ টাকা প্রতি ইউনিট। ভারতীয় সঞ্চালন লাইনের ব্যয় ধরেই এই দাম পড়ছে। অপরদিকে বাংলাদেশে ফার্নেস অয়েল দিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার উৎপাদন ব্যয় এর দ্বিগুণের কাছাকাছি। এমনকি গ্যাসের দাম বাড়ায় এলএনজি-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যয়ও এর চেয়ে বেশি। একবার চুক্তি হলে দীর্ঘ সময় ধরে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এখন যে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেপাল থেকে আসছে— তা ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে আনা হচ্ছে। এর বাইরে ভারত থেকে প্রতিদিন আরও ৮০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি আমদানি করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভারতীয় কোম্পানি আদানি থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে।
নেপালে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে— সেটিও ভারতীয় কোম্পানি জিএমআর নির্মাণ করছে। ফলে ভারত এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ রফতানিতে খুব বেশি বাঁধার কারণ হতো না বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আগের সরকার এমওইউ সই করেছিল। ক্রয় চুক্তি সইয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘‘বর্তমান সরকারের এই বিষয়ে আলোচনা না করাই ভালো। জ্বালানি খাতের কোনও পরিবর্তনই এই সরকারের আমলের হয়নি। বেশিরভাগ সমস্যা অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়ে গেছে৷ বরং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যায আরও বেড়েছে। এজন্য নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনার বিষয়টি পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।’’ তিনি বলেন, ‘‘নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে গেলে সবার আগে দামের রিভিউ করার দরকার। এখন যে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা হয়— তার যে দাম ধরা হয়েছে তাতে অনেক দাম অযৌক্তিক ব্যয় যুক্ত আছে। এসব ব্যয় রিভিউ করা জরুরি। তিনি বলেন, গণশুনানির মাধ্যমে এই দাম নির্ধারণ করা উচিত। স্বচ্ছতা বজায় রেখে জনগণের মতামত নিয়েই এই দাম রিভিউ করতে হবে।’’
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি নেপাল- বাংলাদেশ যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশের তরফ থেকে ‘নেপাল থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিটি করা হবে না’ বলে জানানো হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পলিটিক্যাল ইকোনমি বলে একটা কথা আছে। এক্ষেত্রে এ বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে অবস্থা, তার উত্তরণ না ঘটিয়ে এই বিদ্যুৎ আনা সম্ভব না। আশা করি, নতুন সরকার এলে পলিটিক্যাল ইকোনমি বুঝেশুনে এ আলোচনা এগোবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘এতকিছুর পরও কিন্তু আদানি থেকে আমাদের বিদ্যুৎ আসছে, এর বাইরে আমরা এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এখনও পাচ্ছি ভারত থেকে। নেপালের এই বিদ্যুৎ এলে আমরা কার্বন ফ্রি বিদ্যুৎ পাবো। সেটা দিয়ে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে লক্ষ্য ছিল, সেটি পূরণ করা সম্ভব হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ক্লিন এনার্জির জন্য এই বিদ্যুৎ আনা খুব জরুরি। এমনিতেই আমরা আমদানির ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছি। সে ক্ষেত্রে ক্লিন এনার্জি যোগ করা গেলে ভালো হয়,’’ বলে তিনি মনে করেন।
পিডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, নেপাল-ভুটান এবং মিয়ানমারের জলসম্পদ ব্যবহার করে অন্তত দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারলে— এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো বলে মনে করা হয়।
অপরদিকে এমন পরিস্থিতিতে নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে সরকার।