অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর চাঁদে মনুষ্যবাহী মিশন পরিচালনা করতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। বিবিসি বলছে, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই তারা চাঁদের উদ্দেশে মহকাশযান উৎক্ষেপণ করতে পারে।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শনিবার (১৭জানুয়ারী) নাসা তাদের বিশাল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) চন্দ্র রকেট ও ওরিয়ন স্পেস ক্যাপসুলকে ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং (ভিএবি) থেকে উৎক্ষেপণ প্যাডে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ দিনের আর্টেমিস–২ মিশনে অংশ নেওয়া নভোচারীরা মহাকাশের এমন গভীরে যাবেন, যেখানে আগে কখনো মানুষ যায়নি।
এই মিশনের লক্ষ্য ১৯৬০ ও ৭০–এর দশকের অ্যাপোলো মিশনের পর প্রথমবারের মতো চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের অবতরণের পথ তৈরি করা।
আর্টেমিস–২-এর উৎক্ষেপণ কবে
শনিবার নির্ধারিত চার মাইলের এই যাত্রা ক্রলার–ট্রান্সপোর্টার–২–এ করে সম্পন্ন হতে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। উৎক্ষেপণ প্যাডে পৌঁছানোর পর প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ সংযোগ ও জ্বালানি সরবরাহ লাইন যুক্ত করাসহ নানা প্রস্তুতি শুরু করবেন।
জানুয়ারির শেষ দিকে নাসা একটি 'ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল' চালাবে—অর্থাৎ উৎক্ষেপণের আগে রকেটে জ্বালানি ভরে পরীক্ষা চালানো হবে। এতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশোধনের জন্য এসএলএস ও ওরিয়নকে আবার ভিএবিতে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সবচেয়ে দ্রুত সম্ভাব্য উৎক্ষেপণের তারিখ হতে পারে ৬ ফেব্রুয়ারি। তবে শুধু রকেট প্রস্তুত থাকলেই চলবে না—চাঁদের অবস্থানও ঠিক থাকতে হবে। সে অনুযায়ী নির্দিষ্ট উৎক্ষেপণ সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
বাস্তবে এর মানে হলো—প্রতি মাসের শুরুতে প্রায় এক সপ্তাহ এমন সময় থাকে, যখন রকেট সঠিক দিকে তাক করা যায়। এরপর টানা তিন সপ্তাহ কোনো উৎক্ষেপণ সুযোগ থাকে না।
এর ফলে সম্ভাব্য উৎক্ষেপণের তারিখগুলো হলো—৬, ৭, ৮, ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১১ মার্চ কিংবা ১, ৩, ৪, ৫ ও ৬ এপ্রিল।
ক্রু কারা, কী করবেন তারা
আর্টেমিস–২ মিশনের চার ক্রুর মধ্যে আছেন—নাসার কমান্ডার রিড ভাইসমান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কখ। কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনও দ্বিতীয় মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দলে থাকবেন।
এই মিশনে প্রথমবারের মতো এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন ক্যাপসুলে মানুষ নিয়ে উড্ডয়ন করা হবে।
নিরাপদে কক্ষপথে পৌঁছানোর পর নভোচারীরা ওরিয়ন মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পদ্ধতি পরীক্ষা করবেন। ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণ মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে তারা পৃথিবীর কক্ষপথে হাতে–কলমে ক্যাপসুল দিকনির্দেশনা ও সারিবদ্ধ করার অনুশীলন করবেন।
এরপর তারা চাঁদের আরও কয়েক হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন, যেখানে ওরিয়নের জীবনধারণ ব্যবস্থা, ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ ও নেভিগেশন সিস্টেম পরীক্ষা করা হবে।
নভোচারীরা নিজেরাই চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষার অংশ হিসেবে কাজ করবেন এবং গভীর মহাকাশ থেকে তথ্য ও ছবি পাঠাবেন।
তারা ওজনহীন পরিবেশে একটি ছোট কেবিনে কাজ করবেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের তুলনায় সেখানে বিকিরণের মাত্রা বেশি হবে, তবে তা নিরাপদ সীমার মধ্যেই থাকবে।
পৃথিবীতে ফেরার সময় নভোচারীরা বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ঝাঁকুনিময় যাত্রার পর যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবেন।
আর্টেমিস–২ কি চাঁদে অবতরণ করবে
না। এই মিশনের উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে আর্টেমিস–৩ মিশনকে চাঁদে অবতরণের ভিত্তি তৈরি করা।
নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস–৩–এর উৎক্ষেপণ '২০২৭ সালের আগে নয়'। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে ২০২৮ সালের আগে তা সম্ভব নাও হতে পারে।
চাঁদের পৃষ্ঠে নামার জন্য কোন মহাকাশযান ব্যবহার করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি হতে পারে স্পেসএক্সের স্টারশিপ ল্যান্ডার অথবা জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের তৈরি কোনো যান।
তাছাড়া, মার্কিন কোম্পানি অ্যাক্সিয়মের তৈরি নতুন স্পেসস্যুটও এখনো প্রস্তুত নয়।
আর্টেমিস–৩ মিশনে নভোচারীরা চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে যাবেন। এরপর লক্ষ্য থাকবে—চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
আর্টেমিস–৪ ও ৫ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকা ছোট স্পেস স্টেশন গেটওয়ে নির্মাণ শুরু হবে। এরপর আরও চাঁদে অবতরণ, গেটওয়েতে নতুন অংশ যোগ এবং চাঁদের পৃষ্ঠে রোবটিক যান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে আরও অনেক দেশ যুক্ত হবে।
সর্বশেষ কবে মানুষ চাঁদে গিয়েছিল
সর্বশেষ মনুষ্যবাহী চন্দ্র মিশন ছিল অ্যাপোলো–১৭। এটি ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে চাঁদে অবতরণ করে এবং সেই মাসেই পৃথিবীতে ফিরে আসে।
এ পর্যন্ত মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদে গেছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন চাঁদের পৃষ্ঠে হেঁটেছেন—সবই অ্যাপোলো মিশনের সময়।
ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬০–এর দশকে প্রথম চাঁদে যায়, মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নকে টপকাতে। লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর রাজনৈতিক আগ্রহ ও জনসমর্থন যেমন কমে যায়, তেমনি কমে যায় অর্থায়নও।
আর্টেমিস মিশন গড়ে ওঠে মানুষের চাঁদে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে—তবে এবারের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি, নতুন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে।
আর কারা চাঁদে মানুষ পাঠাতে চায়
হ্যাঁ। ২০৩০–এর দশকে আরও কয়েকটি দেশের চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউরোপীয় নভোচারীরা ভবিষ্যতে আর্টেমিস মিশনে যুক্ত হবেন, আর জাপানও আসন নিশ্চিত করেছে।
চীন নিজস্ব মহাকাশযান তৈরি করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে প্রথম অবতরণের লক্ষ্য নিয়েছে।
রাশিয়াও ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও একটি ছোট ঘাঁটি তৈরির কথা বলছে। তবে নিষেধাজ্ঞা, অর্থসংকট ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এই সময়সূচিকে অত্যন্ত আশাবাদী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতও একদিন নিজস্ব নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে।
২০২৩ সালের আগস্টে চন্দ্রযান–৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে সফলভাবে অবতরণের পর ভারতের মহাকাশ সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ২০৪০ সালের মধ্যে তারা চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে। এটি পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে তাদের মানব মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণের অংশ।
শীর্ষনিউজ