Image description

রাজধানীতে জনদূর্ভোগের নতুন আতঙ্ক ব্যাটারিচালিত রিকশা। মূল সড়ক থেকে গলিপথ, স্কুলগেট, ফ্লাইওভারের ওপরে কিংবা ওভারব্রিজের নিচে; প্রত্যেকটা সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব রিকশা। বেপরোয়াভাবে চালানোয় এসব রিকশা দুর্ঘটনায় পড়ছে অহরহ। এমন অবস্থায় হাইকোর্ট ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের আদেশ দিলে সড়কে নামেন চালকরা। হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিলেও পরে আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থায় আপাতত ঢাকার রাস্তায় চলার অনুমতি পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব রিকশার চালকরা।

বেসরকারী হিসাবে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রিকশা চলাচল করছে। এর বড় একটি অংশ ব্যাটারিচালিত। বিআরটিএ সূত্র বলছে, সারা দেশে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার রিকশার। রাজধানীতে যতগুলো রিকশা চলছে এর বেশিরভাগই রাজধানীর বাইরে থেকে আসছে। গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী থেকে আসা গাড়িগুলোই রাজধানী দাবিয়ে বেড়াচ্ছে।

বেসরকারী সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৮৫৬টি ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৫৯ জন নিহত হয়েছে। ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এ বাহনের উন্নত বিকল্প মানুষের সামনে হাজির করতে হবে। মানুষর কাছে চাহিদা কমলে শ্রমজীবী মানুষ ঢাকায় এসে রিকশা চালাতে নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে রিকশার সংখ্যা কমবে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ লাখেরও বেশি অবৈধ রিকশা রয়েছে রাজধানীতে। ব্যাটারিচালিত রিকশায় সয়লাব রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থেকে বকশীবাজার ফুটপাত। হাতিরপুল থেকে শুরু করে নিউমার্কেট এলাকাসহ বিভিন্ন অলিগলিতেও একই অবস্থা। তবে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির রাস্তায় মাঝে মধ্যেই ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায় উত্তর সিটি কর্পোরশেনকে। এসব রাস্তায় ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচল করতে দেখলেই পুলিশ আটক করে। তবে কিছু অলি-গলিতে বাহনগুলোর চলাচল অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর উত্তরা, জসিমউদ্দিন, রাজলক্ষী, আজমপুর, হাউজবিল্ডিং, আব্দুল্লাহপুর, দিয়াবাড়িসহ কয়েকটি সড়কে এসব রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে।

বেসরকারী সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আমার দেশকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৮৫৬টি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৫৯ জন নিহত হয়েছে। ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক চালকের নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা। অদক্ষ চালক অনেক সময় রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। অধিকাংশ অটোরিকশা চালাচ্ছে শিশু-কিশোর এবং অন্য পেশা থেকে আসা শ্রমিকরা। এসব চালকদের বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খলা অটোরিকশা চালনার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটেছে দুর্ঘটনা।

ছিনতাইকারীদের প্রধান বাহন এখন এসব রিকশা

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন ছিনতাইকারীদের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এই বাহনে কখনো যাত্রীর বেশে আবার কখনো চালক বেশে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এই দুর্বৃত্তদের রুখতে দিশেহারা পুলিশও। কিছুদিন আগেও ছিনতাইকারীরা মোটরসাইকেল বেশি ব্যবহার করলেও, এখন করছে অটোরিকশা। পুলিশ বলছে, অভিনব এই ছিনতাইকারীদের ধরতে চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে।

মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের শেষ মাথায় গত বছরের ৩১ আগস্ট ভোর ৬টায় অটোরিকশায় চড়ে আসে এক যুবক। অটো থামার সাথে সাথে পেছন থেকে আসে দুজন। কোমড় থেকে বের করে চকচকে চাপাতি। যা গলায় ঠেকিয়ে লুটে নেয় মোবাইল মানিব্যাগসহ সব কিছু। সেই অটোর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো আরো দুটি অটোরিকশা, তবে প্রতিবাদ করেনি কেউ। যে অটোতে এসে যুবকটি ছিনতাইয়ের শিকার হলেন, সেই অটোতে এবার ছিনতাইকারী বেরিয়ে পড়লো নতুন শিকারের সন্ধানে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই দিন ছিনতাইয়ের শিকার যুবকের নাম নাগর রায়। একইভাবে রাজধানীর ৩শ ফিটে প্রকাশ্যে অটোরিকশা নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। রাজধাণীর যাত্রাবাড়িতে অটো রিকশায়ও মোবাইল ছিনতাইকারীরা তৎপর।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডিএমপির সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০টি রিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে, ব্যাটারি জব্দ করা হচ্ছে, তার কেটে দেওয়া হচ্ছে। মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা যেন না উঠতে পারে সে কারণে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের পাশাপাশি এক হাজার ছাত্র সদস্য কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে প্রতিনিয়ত রাজধানীতে দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে, এই দুর্ঘটনা রোধে রিকশার আকৃতি ও গঠনের পরিবর্তন জরুরি। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রিকশার আকৃতি কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে, একটু বড় সাইজের রিকশা বানাতে হবে। একইসঙ্গে ব্রেক, টায়ার, স্পোকগুলোও থাকতে হবে মানসম্মত।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে অটোরিকশা নিবন্ধন করে মনিটর করতে হবে। সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মফস্বল শহর কেন্দ্রিক কৃষি ও শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি করে রাজধানীমুখি শ্রমজীবী মানুষের স্রোত থামাতে হবে।

কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আমার দেশকে বলেন, ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন একযোগে ই-রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা ই-রিকশাচালকদের একটি আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে চাই। প্রশিক্ষণের আওতায় পর্যায়ক্রমে দুই লাখ রিকশাচালককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য ভিন্ন রঙের রিকশার অনুমোদন দেওয়া হবে। তখন একটি অঞ্চলের রিকশা আর অন্য অঞ্চলে চালানো যাবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, সরকার ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে যানজট নিরসনের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা থেকে নগরবাসী রক্ষা পাবে। প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী রিকশাচালকেরা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশা খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হবে।