প্রায় ৪৩ হাজার টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গরে থাকা একটি জাহাজ রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। এটি কুতুবদিয়া অ্যাংকরে ১৩ মাস অবস্থানকালে নাম ও ফ্ল্যাগ পরিবর্তন করে। পরে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায়। জাহাজটিতে পরিবহন করা এলপিজি ইরানের ছিল— এমন অভিযোগও উঠেছিল। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, জাহাজটি যখন চট্টগ্রাম বন্দরে আসে তখন এর নাম ছিল ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি ) গত বছরের ৯ অক্টোবর ইরানি জ্বালানি পরিবহনের অভিযোগ এনে এলপিজি পরিবাহী ট্যাংকার জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তখন জাহাজটি অবস্থান করছিল বাংলাদেশে। এটি এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং লিস্টে রয়ে গেছে। বন্দরের নথি অনুযায়ী কাগজে কলমে জাহাজটি এখনো ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ নামে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। বার্থিং লিস্টের তথ্য বলছে, জাহাজটিতে ৪২ হাজার ৯২৪ টন এলপিজি ছিল।
বার্থিং লিস্টে থাকে বন্দরে অবস্থানরত জাহাজের সবশেষ পোর্ট, পতাকা, বাহিত পণ্যের নাম, পরিমাণ, আগমনের তারিখ, লোকাল এজেন্টের নাম।
‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ জাহাজটি নিয়ে অনেক দিন কোনো আলোচনা না থাকলেও সম্প্রতি দেশে এলপিজি নিয়ে সংকট তৈরি হলে জাহাজের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। তখন জানা যায়, বন্দরের বার্থিং লিস্টে নাম থাকলেও জাহাজটি বাংলাদেশে নেই। কখন ছেড়ে গেছে এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যও নেই চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে। স্থানীয় প্রতিনিধি বলছেন, জাহাজটি গত ১৫ নভেম্বরের আগে তাদের অবগত না করেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে।
এদিকে জাহাজটির পরিবাহিত গ্যাস সম্পর্কে বক্তব্য দিতেও রাজি নয় এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, ক্যাপ্টেন নিকোলাস ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ৪৪ হাজার ৯২৫ টন এলপিজি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। জাহাজটির লোকাল এজেন্ট (স্থানীয় প্রতিনিধি) ছিল সিওয়েভ মেরিন সার্ভিস। ১৩ অক্টোবর বিএলপিজি সোফিয়া নামে আরেকটি ট্যাংকারে এলপিজি খালাসের সময় দুটি জাহাজেই আগুন ধরে যায়। এতে ক্যাপ্টেন নিকোলাস সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মারাত্মক ক্ষতি হয় বিএলপিজি সোফিয়ার।
বিষয়টি তদন্তে ওইদিনই বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হার্বার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর এম ফজলার রহমানকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটির প্রতিবেদন কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়নি। তখন থেকেই আলোচনা ছিল জাহাজটি ইরানি এলপিজি নিয়ে এসেছিল।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুটি অ্যাডমিরালটি (সামুদ্রিক বিষয়াদি সম্পর্কিত আইন) মামলায় জাহাজটিকে জব্দ করা হয়। অবশ্য গত ৫ সেপ্টেম্বর পুনরায় গ্যাস স্থানান্তরের অনুমতি পায় জাহাজটি। এর মধ্যে আবার ৯ অক্টোবর জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি )।
তবে ক্যাপ্টেন নিকোলাস থেকে এলপিজি আদৌ স্থানান্তর হয়েছে কি না কিংবা কী হলো সেটা নিয়ে তথ্য দিতে পারছেন না কেউ।
জানা গেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির এক মাস চারদিন পর গত ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের পিসি (পোর্ট ক্লিয়ারেন্স) ছাড়াই বাংলাদেশ ত্যাগ করে ক্যাপ্টেন নিকোলাস। এ ঘটনায় গত ২৩ নভেম্বর কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে স্থানীয় এজেন্ট সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের এক্সিকিউটিভ অপারেশন মনোয়ার পারভেজ।
জাহাজটির উধাও হওয়ার বিষযে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “শুনেছি কয়েকদিন আগে জাহাজটি চলে গেছে।”
এ সম্পর্কে তিনি আরো জানান, ক্যাপ্টেন নিকোলাস এলপিজি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। পরে এলপিজি স্থানান্তরের সময়ে জাহাজটিতে আগুন লাগে। এরপরে জাহাজটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অ্যাডমিরালটি আদালতে মামলা ছিল। আদালতের আদেশে জাহাজটি আটকও করা হয়। ইতোমধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
জাহাজটির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথাও নিশ্চিত করেন তিনি। তবে বন্দরের বার্থিং লিস্টে ক্যাপ্টেন নিকোলাসের নাম থাকার বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি।
বন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম বলেন, “২০২৪ সালে জাহাজটি এসেছিল। তখন অভিযোগটি ওঠে। এর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আমরা জাহাজটি ভিজিট করেছি। ওই অভিযোগ তো তখন নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এরপর জাহাজটির খবর আমি রাখিনি। কারণ আমাদের কাজ হলো বন্দরে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে পাইলটিং দেওয়া। বড় জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না।”
বার্থিং লিস্টে ক্যাপ্টেন নিকোলাসের নাম থাকলেও জাহাজটি এখন চট্টগ্রাম বন্দরে নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, “কোনো জাহাজ বন্দরে প্রবেশের আগে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা দিতে হয়। আবার বন্দর ছেড়ে যেতে পিসি (পোর্ট ক্লিয়ারেন্স) নিতে হয়। ক্যাপ্টেন নিকোলাসে ২০২৪ সালে যখন আগুন লাগে তখন একটি কমিটি গঠন করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। ওই কমিটিতে আমাদের একজন শিপ সার্ভেয়ার সদস্য হিসেবে ছিলেন। বিষয়টি ওই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েও পরে জাহাজটি মামলা জটিলতায় পড়ে।”
তবে জাহাজটি বাংলাদেশে অবস্থানকালে নাম ও পতাকা পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি জানেন না বলে জানান।
এ বিষয়ে সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের সিইও শেখ সামিদুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস সম্পর্কে বক্তব্য দেবে বন্দর।”
জাহাজটি উধাও হওয়ার বিষয়ে কুতুবদিয়া থানায় জিডি করার কথা নিশ্চিত করে সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক বলেন, “বন্দর থেকে জাহাজটির পিসি (পোর্ট ক্লিয়ারেন্স) নেওয়া হয়নি। পিসি না নিলে বন্দরের বার্থিং লিস্টে নাম রয়ে যায়। প্রিন্সিপাল (জাহাজের মালিক) আমাদের পিসি নিতে বলেননি। গত ১৬ নভেম্বর থেকে জাহাজটির হদিস মিলছে না। এজন্য আমরা বন্দর, কোস্টগার্ড, নেভিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে লিখিত জানিয়েছি। এরপর প্রিন্সিপালকে মেইল করেছি, তারা আমাদের কোনো রিপ্লাই দিচ্ছে না।”
জাহাজটি উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর করা জিডি করা হয়। ওই জিডিতেও মিথ্যা তথ্য দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ক্যাপ্টেন নিকোলাস ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর ১৩টি এলপিজি কনসাইমেন্ট মিলে ৪২ হাজার ৯২৫ টন এলপিজি নিয়ে কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে আসে। আসার পর থেকে লোকাল এজেন্টের সঙ্গে ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপপে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ১৬ নভেম্বর থেকে ক্যাপ্টেন নিকোলাসের মাস্টারের কাছ থেকে ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
ওই সময়ে কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন মো. আরমান হোসেন (বর্তমানে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি)। জিডির বিষয়ে ওসি আরমান হোসেন বলেন, “ক্যাপ্টেন নিকোলাস নামের জাহাজটি নির্ধারিত স্থানে না পাওয়ায় লোকাল এজেন্টের পক্ষ থেকে কুতুবদিয়া থানায় লিখিতভাবে জানানো হয়। এরপর পুলিশের একটি টিম স্পিডবোটে ঘটনাস্থল ও আশপাশে পরিদর্শন করে জাহাজটির হদিস পায়নি। পরে আমরা বিষয়টি জিডি হিসেবে এন্ট্রি করেছি।”
তথ্যমতে, জাহাজটি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। কিন্তু জিডিতে উল্লেখ কর হয় ২০২৫ সাল। এটি ভুলবশত লেখা হয়েছিল বলে দাবি করেন সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক।
চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানকালীন সময়ে নাম ও ফ্ল্যাগ পরিবর্তন: যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি তাদের নিষেধাজ্ঞায় ক্যাপ্টেন নিকোলাসের নাম ‘আদা’ এবং পূর্বনাম ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাহাজটির আইএমও ৯০০৮১০৮। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশে আসার সময় ক্যাপ্টেন নিকোলাস হিসেবে এসেছিল জাহাজটি। তখন জাহাজটি তানজানিয়ার পতাকা বহন করছিল।
বৈশ্বিক জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে জাহাজটির নাম ‘আদা’ এবং বতসোয়ানার পতাকা বহন করছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী জাহাজটি বর্তমানে মালাক্কা প্রণালির মধ্য দিয়ে চীনের দিকে যাচ্ছে। মেরিটাইমঅপটিমা বলছে, জাহাজটি ১৮ ডিসেম্বর আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে পৌঁছে। এটি ২৫ ডিসেম্বর চীনের উদ্দেশ্যে আরব আমিরাত ছেড়েছে।
একই আইএমও নম্বর হলেও ভ্যাসেল ট্র্যাকার বলছে, জাহাজটির বর্তমান নাম কালাস্তিন। সেখানেও এটিকে বতসোয়ানার পতাকাবাহী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে মঈন ছিদ্দিক বলেন, “জাহাজটি ক্যাপ্টেন নিকোলাস নামে বাংলাদেশে এসেছিল। এটি ওমানের সোহার বন্দর থেকে আসে। তখন তানজানিয়ার পতাকা বহন করছিল। সবশেষ গত বছরের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে জাহাজের ক্যাপ্টেনের যোগাযোগ হয়েছে। তখন পর্যন্ত জাহাজের নাম ও পতাকা পরিবর্তনের বিষয়ে আমাদের জানানো হয়নি। একেক সাইটে একেক নাম ও ফ্ল্যাগ দেখা যাচ্ছে।”
জাহাজটি তৈরি করা হয় ১৯৯২ সালে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এটির নাম ছিল সানি গ্রিন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যাপ্টেন নিকোলাস নামকরণ হয়। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ‘আদা’ নাম ধারণ করে জাহাজটি।
ক্যাপ্টেন নিকোলাস জাহাজটি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর যখন বাংলাদেশে আসে তখন পরিবহন করা এলপিজি ইরানি বলে আলোচনায় আসে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাননি। ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর যখন জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় তখন ইরানি এলপিজি বহনের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “ক্যাপ্টেন নিকোলাস জাহাজটি আসার পর অভিযোগ ওঠায় আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছি। তখন জাহাজের ডকুমেন্ট পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।’
স্থানীয় এজেন্ট সিওয়েভ মেরিনের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক বলেন, “এখন আমেরিকা বলছে, এগুলো ইরানি গ্যাস। আমরা বলতে পারব না- আসলে কী হয়েছে। আমাদের কাছে পাঠানো ডকুমেন্ট অনুযায়ী জাহাজটির লোডিং পোর্ট ছিল সোহার, ওমান।”
শীর্ষনিউজ