হুম্মাম কাদের চৌধুরীর গুমের খবর শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আকবর হোসেন। একইভাবে মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান নামেই বেশি পরিচিত)-এর গুমের খবরও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানতেন।
এছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) হেফাজতে গুমের ঘটনাগুলো সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে অনেকে এসব বিষয়ে জানতেন না বলে দাবি করেন।
গত ৪ জানুয়ারি ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানেই এ চিত্রটি উঠে আসে।
গুম কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্রিগেডিয়ার আজমির গুম নিয়ে সেনাবাহিনীর পরিচালিত কোর্ট অব ইনকোয়ারির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর প্রাথমিক অপহরণ ও আটকের অনুমোদন দিয়েছিলেন। তার পরবর্তী সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিজিএফআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেলরা কর্তৃত্বের অপব্যবহার করে ব্রিগেডিয়ার আজমির অননুমোদিত আটক অব্যাহত রাখার জন্য দায়ী ছিলেন।
এতে বলা হয়, কমিশনের সামনে হাজির হয়ে ডিজিএফআইয়ের ডিজি (২০১৩–২০১৭) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর জানান, তিনি হুম্মাম কাদের গুমের বিষয়টি শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তাকে জানান, হুম্মামকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং জানতে চান, মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিককে বিষয়টি জানানো হয়েছে কি না। আকবর কমিশনকে নিশ্চিত করেন, তিনি তাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি)-এর সাবেক ডিরেক্টর (২০২০–২০২২) মেজর জেনারেল কবির আহমেদ কমিশনকে জানান, তিনি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি)-এ ব্রিগেডিয়ার আজমির আটক থাকার বিষয়টি তার অধীনে থাকা দুই ডিরেক্টর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তারা হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী। একইভাবে ডিজিএফআই কর্মকর্তা মেজর জেনারেল একেএম আমিনুল হক বলেন, ব্রিগেডিয়ার আজমিকে তুলে আনার আদেশ তিনি সরাসরি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবরের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন এবং নিজ কানে সে আদেশ শুনেছেন।
র্যাবের ডিজি (২০২০–২০২২) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আইসিটির সামনে দেওয়া তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেন, র্যাবের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানতেন, ব্যারিস্টার আরমান তাদের হেফাজতে ছিলেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষ্য থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিকরা জানান, সিটিআইবির ডিরেক্টররা নিয়মিতভাবে জেআইসি পরিদর্শন করেন। ভুক্তভোগীরা নিজ চোখে বগুড়া ও বাগেরহাটের পুলিশ সুপার, পাশাপাশি সিটিটিসি ও ডিবির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দেখেছেন। কমিশনের সামনে হাজির হয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূঁইয়া নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পেরেছেন, কোন অফিসাররা অবৈধভাবে বন্দি রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী।
টিএফআই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী একজন সৈনিক সাক্ষ্য দেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুইজন এডিজি (অপারেশনস) এবং দুইজন ডিরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স)-এর পরিদর্শনের বিষয়ে জানতেন। তারা হলেন কর্নেল কেএম আজাদ (২০২১–২০২২), কর্নেল মাহবুব আলম (২০২৩–২০২৪), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোশিউর রহমান জুয়েল (২০২১–২০২৩) এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন (২০২৩–২০২৪)। তিনি জানান, এ ধরনের পরিদর্শনের দুই থেকে তিনদিন আগে সকালের রোলকলের সময় টিমকে সতর্ক করা হতো, যাতে প্রাঙ্গণ প্রস্তুত করা যায়। তিনি বিশেষভাবে ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরের দিনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোশিউর রহমান জুয়েলের পরিদর্শনের কথা স্মরণ করেন। ঈদের নামাজের পর তিনি প্রহরীদের জন্য মিষ্টি আনেন এবং প্রতিটি সেল ঘুরে দেখেন।
বহু বছর ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষাৎকার থেকে বোঝা যায়, এসব পরিদর্শন ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত ঘটনা ছিল। সব সাক্ষ্য একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, আটক স্থানগুলো সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের জ্ঞান, তদারকি ও সম্পৃক্ততা ছিল। তাই ঊর্ধ্বতনরা এসব অপারেশন সম্পর্কে জানতেন না—এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বগুড়া পুলিশ লাইনে এসপির অফিস ও আটক কক্ষ একই তলায় ছিল এবং একই সিঁড়ি ব্যবহার করতে হতো। কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে বন্দি রাখার স্থান ছিল প্রবেশপথ থেকেই দৃশ্যমান। দিনাজপুর ও বাগেরহাট পুলিশ লাইনসেÑএমনকি বাগেরহাটে হাসপাতালের নিচতলায় বন্দিদের রাখা হতো। এসব বাস্তবতায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অজ্ঞতার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ল এনফোর্সমেন্ট ইন্টেলিজেন্স সেল (এলআইসি)-এ নিচতলায় আটক ও নির্যাতনের কক্ষ ছিল আর উপরের তলাগুলোতে যেতে হলে সে এলাকার পাশ দিয়েই যেতে হতো। র্যাব ইন্টেলিজেন্সের টিএফআই, গ্লাস হাউস ডিটেনশন সেন্টার, র্যাব-১, র্যাব-৭ ও র্যাব-১১Ñসব জায়গাতেই সেলগুলো কমান্ডিং অফিসারদের অফিস থেকে খুব কাছাকাছি ও দৃশ্যমান ছিল।
তাই সারা দেশে র্যাব ব্যাটালিয়নগুলোর সিসিটিভি কভারেজ সরাসরি অধিনায়কদের অফিসে দেখা যেত। তাই বহু বছর ধরে এসব কার্যক্রম অজানা থাকার দাবি অবাস্তব।