বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার, শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ স্বল্পতা শুরু হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। দেশে জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখার নীতি অনুসরণ করা হয় সে সময়ে। কিন্তু অর্থ সংকট এবং আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে দফায় দফায় জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ ক্রমেই ভয়াবহ উদ্বেগে রূপ নিচ্ছে, এমনকি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঢেউ এসে চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়। একদিকে যেমন জ্বালানি সংগ্রহে রাজস্ব আয় থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনা সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এরই মধ্যে দেশে এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ চেইনে যদি কোনো কারণে বিঘ্ন হয়, তা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতাকে বড় রকমের বিপদে ফেলতে পারে।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫৮ কোটি ঘনফুট। চাহিদা ও সরবরাহে বর্তমানে ঘাটতি থাকছে দৈনিক ১২২ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে বর্তমানে যে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে তা গত বছরের এ সময়ের (১০ জানুয়ারি, ২০২৫) তুলনায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট কম। ওই সময়ে দেশে গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট।
দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচ কোম্পানির চারটির উৎপাদন গত এক বছরে হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনের এ ঘাটতি মেটাতে বিকল্প সমাধান হিসেবে বিপুল অর্থে কেনা হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অন্তত সাড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকার ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু সেখানেও রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা। জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার নিয়ে পরাশক্তিগুলোর কৌশলে আটকে গেলে আগামীতে গভীর জ্বালানি সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা।
এরই মধ্যে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজার থেকে পণ্যটি আমদানিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জ্বালানি খাত বিশেষত গ্যাসের সরবরাহ সংকটের এ পরিস্থিতি একদিনের নয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে এ পরিস্থিতি অব্যাহত আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতির প্রাণশক্তি জ্বালানি খাতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে স্বল্পসময়ে একটা কার্যকর ও টেকসই কৌশল বাস্তবায়ন করা। যার মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় সরবরাহ বাড়বে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের সরবরাহ সংকট আগের চেয়ে প্রকট হয়েছে। এ পরিস্থিতি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তারা মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এলএনজি আমদানির একটা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল। এ সিন্ডিকেটের কারণে রুদ্ধ ছিল স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পথ। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। যদি নেয়া হতো তার প্রভাব আর্থিক ব্যয়ে উঠে আসত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দেশে কর্মরত বেশির ভাগ কোম্পানির উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
দেশে গ্যাস উত্তোলনে স্থানীয় তিনটি কোম্পানির পাশাপাশি দুটি বিদেশী কোম্পানি নিয়োজিত রয়েছে। কোম্পানিগুলোর গত এক বছরের গ্যাস উৎপাদনচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চারটি কোম্পানিরই উৎপাদন কমেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস উৎপাদন করেছে ৫ হাজার ৩১৪ এমএমসিএম (মিলিয়ন ঘনমিটার), যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৫ হাজার ৮৩৭ এমএমসিএম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৫২৩ এমএমসিএম।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) গত অর্থবছরে গ্যাস উৎপাদন করেছে ১ হাজার ৩৯২ এমএমসিএম, যা তাদের আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ছিল ১ হাজার ৭৩ এমএমসিএম। কোম্পানিটির গ্যাস উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে।
বাপেক্সের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৫৫ এমএমসিএম, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৩৩৪ এমএমসিএম। এক বছরের ব্যবধানে বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
দেশের স্থলভাগে বিদেশী কোম্পানি হিসেবে গ্যাস উত্তোলন করছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোম্পানির আওতাধীন গ্যাস ফিল্ডের হিস্যা মোট সরবরাহের প্রায় অর্ধেক। সেখান থেকেও গ্যাস সরবরাহ এক বছরের ব্যবধানে বড় আকারে কমেছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, শেভরনের তিনটি গ্যাস ফিল্ড থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার ৩৬৮ এমএমসিএম, যা আগের বছরে ছিল ১২ হাজার ৪০৭ এমএমসিএম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৩৯ এমএমসিএম।
দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী আরেকটি কোম্পানি তাল্লো গ্যাস উৎপাদন করছে। কোম্পানিটির উৎপাদনও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩৬৯ এমএমসিএম গ্যাস উৎপাদন করেছে, যা আগের বছরে ছিল ৪২১ এমএমসিএম।

পেট্রোবাংলা বলছে, স্থানীয় মজুদ-সরবরাহ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও কমছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন কূপ খনন করে গ্রিডে সংযোগ দেয়া হলেও তা খুব বেশি কাজে আসছে না। সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন গ্রিড থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাচ্ছে। এ কারণে গ্রিডে নতুন করে সরবরাহ যুক্ত হলেও সে বাড়তি গ্যাসের কোনো ইতিবাচক প্রভাব সার্বিকভাবে পড়ছে না।
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে জ্বালানি বিভাগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট থেকে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ পরিমাণ কার্গো আমদানিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকার এলএনজি কেনা হয়েছে।
এর আগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারও বড় আকারে এলএনজি আমদানি করেছিল। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৮৪৫ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ২৭৪ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার এলএনজি কেনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে পরিকল্পিত ১১৫টি কার্গো আমদানি করা হলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর থেকে এ যাবত দেশে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি হবে।
দেশে স্থানীয়ভাবে গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধিতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করেছিল। এ দরপত্রে বিদেশী কয়েকটি কোম্পানি তথ্য-উপাত্ত কিনলেও পরে একটি কোম্পানিও দরপত্রে অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ দরপত্র আহ্বান নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দেশে এলএনজি সরবরাহে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। দুটির সক্ষমতা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের সরবরাহ সংকট মেটাতে তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি করে গ্রিডে দিতে নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন। এ বিষয়ে কোনো বড় অগ্রগতি দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। জ্বালানি বিভাগ বলছে, নতুন করে আরো একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অবশ্য এখনো এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কোনো কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে অন্তত তিন বছর সময় প্রয়োজন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে এসব টার্মিনাল নির্মাণ করে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে তাদের মেয়াদের বেশির ভাগ সময় শেষ হয়ে যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যেকোনো দেশে বিনিয়োগের আগে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান বিদেশীরা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিগত সরকারের সময়ে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও গ্যাস দেয়া যাচ্ছে না। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা বছরের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ পান না। এজন্য রফতানিমুখী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর এলএনজি আমদানি করে জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে এ অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। যখন থেকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান কমতে শুরু করেছে তখন থেকে আমদানি বাড়ানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা প্রয়োজন ছিল, যা বিগত সরকার করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও এখান থেকে বেরিয়ে আসতে বড় কোনো কাজ করতে পেরেছে বলে মনে করছেন না তারা।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের গ্যাস খাতের সংকটের পেছনে মূল কারণ ছিল অনুসন্ধান-উত্তোলনে জোর না দেয়া। বলা চলে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ওই অর্থে হয়নি। এ খাতে বিনিয়োগ অন্যান্য খাতের মতো নয়। এ খাতে বিনিয়োগে একধরনের ঝুঁকি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাদের ওপর নির্ভর করে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসবে বিষয়টি এমন নয়। বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কোনো অনিশ্চিত সরকারের ওপর বিনিয়োগে ঝুঁকতে চায় না। এটা রাজনৈতিক সরকারের ওপর নির্ভর করে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘গ্যাস খাতে সহসা কোনো সমাধান নেই। এ খাতে বিনিয়োগ দরকার। বিশেষ করে একটা পদ্ধতি প্রয়োজন, যা দিয়ে নির্ধারিত একটি সময়ের মধ্যে এলএনজি আমদানি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে দেশের অর্থনীতি ঠিক রাখা সম্ভব নয়। এছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে ধরনের হস্তক্ষেপ চলছে, তাতে আমাদের মতো দেশ যেকোনো সময় বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। ফলে এ সরকারকে এমন একটা পদ্ধতি নির্ধারণ করে যেতে হবে যাতে পরবর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়ন করতে পারে।’
দেশে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা করা হলেও আমদানির বড় হিস্যা রাখা হয়েছে। দু’ভাবে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সামাল দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনায় তিন ধাপে জ্বালানি খাতকে সাজানো হয়েছে, যা ২০২৬ থেকে শুরু করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জ্বালানি খাতে ৭০-৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের সংকট কাটাতে আমদানি ও স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন দুটোই বাড়াবে সরকার। এক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য এলএনজির আরেকটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনে বাপেক্সসহ অন্যান্য কোম্পানি কাজ করছে। দুটি নতুন রিগ কেনা হচ্ছে। গভীর ড্রিলিং হচ্ছে। আগে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, সেগুলো সমন্বিত কোনো উদ্যোগ ছিল না, যে কারণে গ্যাস খাতে নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’
দেশের গ্যাস খাতে সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘স্থানীয় গ্যাস খাতে জরিপে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনায় কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে তা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ১০০ কূপ খননের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি স্পটের ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমিয়ে স্বল্পমেয়াদে (তিন বছর) এলএনজি চুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
তবে জ্বালানি খাত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থায়ী ও দ্রুত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করেন না দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনেকে। তারা বলছেন, সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ গ্যাস খাতের ওপর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
জানতে চাইলে দেশের ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি জ্বালানি খাত। বিশেষ করে গ্যাস খাতের ওপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। বিগত সরকারের সময়ে গ্যাস খাত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই দরকার ছিল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা। কিন্তু সেটা তারা করতে পারেনি। দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বড় যে কাজটি করার সুযোগ ছিল তা হলো ডিপ সিতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া। গ্যাসের মজুদ ব্যবস্থাপনা তৈরি করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের সস্তার গ্যাস ব্যবহারের বড় সুযোগ নেয়া যেত। এলপি গ্যাস নিয়ে এখন সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট যে হবে সেটা সরকার জানত। স্যাংশনভুক্ত দেশ থেকে এলপিজির কার্গো এসেছে দেশে, বিষয়টি জানানোর পরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন বলা হচ্ছে, জাহাজের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি খাতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যে পরিস্থিতি এখন চলছে, তা পরবর্তী সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।’
যদিও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট কাটাতে বাপেক্সকে অনুসন্ধান কার্যক্রমে পুরোপুরি নিয়োজিত করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ কূপ খনন করা হবে। এ খাতের প্রতিযোগিতা বাড়াতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ আইন বাতিল করা হয়েছে। স্পট থেকে এলএনজি আমদানি কমাতে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ চুক্তিতে যাওয়া হচ্ছে। এছাড়া দুটি গ্যাস কূপ খননে রিগ কেনা হচ্ছে। স্থলভাগে বিদেশী কোম্পানি দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান করতে পিএসসি হালনাগাদ করাসহ আরো বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।