দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও প্রশাসনিক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের নীতিনির্ধারণী স্তরে ফেরার পথে রয়েছেন একদল পেশাদার কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনে শুরু হওয়া পুনর্মূল্যায়ন ও শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন বঞ্চিত, উপেক্ষিত কিন্তু সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আসন্ন রদবদলে আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, এসবি প্রধান, র্যাব ডিজিসহ গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ইউনিটগুলোর নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার আওতায় অন্তত নয়জন ডিআইজি আলোচনায় রয়েছেন, যাঁরা বিগত সময়ে রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং বাধ্যতামূলক অবসরের মতো সিদ্ধান্তের শিকার হলেও পেশাগত নীতিতে আপস করেননি।
এই কর্মকর্তাদের একজন ডিআইজি ড. মো. আশরাফুর রহমান। দীর্ঘ ১৮ বছর বঞ্চনার পর ২০২৪ সালে ময়মনসিংহ রেঞ্জে দায়িত্ব নিয়ে মাত্র ছয় মাসেই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র ভেঙে দেন তিনি। ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানে শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার এবং জনআস্থা ফেরাতে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়। তবে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার তৎপরতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার প্রভাবে তিনি পুনরায় বৈষম্যের শিকার হয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি হন। সম্প্রতি এই অন্যায্য বদলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষ সহকারী পদত্যাগ করেছেন।
ডিআইজি ড. মো. আক্কাছ উদ্দিন ভূঁইয়া সন্ত্রাস দমন ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। একসময় সুপারনিউমারারি পদে তাকে কোণঠাসা করে রাখা হলেও বর্তমানে এটিইউতে দায়িত্ব পালনকালে তার পেশাগত দক্ষতার স্বাক্ষর মিলছে। শীর্ষ অপারেশনাল পদে তার নাম বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ডিআইজি ড. মো. নাজমুল করিম খান আদালতের রায়ে ফিরে এসে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। ছিনতাই দমন, বিশ্ব ইজতেমার নিরাপত্তা এবং সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত তদন্তে তিনি প্রশংসা অর্জন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তার প্রতি আস্থার প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে।
ডিআইজি ফারুক আহমেদ র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন অপারেশনাল ইউনিটে সন্ত্রাস ও চরমপন্থা দমনে ভূমিকার জন্য আলোচনায় রয়েছেন। আর ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দীর্ঘ ১৮ বছর বঞ্চনার পর পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেয়েছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও প্রশিক্ষণ ইউনিটে শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়নে ভূমিকা রেখে পরিচিতি পাওয়া ডিআইজি আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ এবং ডিএমপিতে অপরাধ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে কার্যকর মডেল গড়ে তোলা ডিআইজি মোহাম্মদ উসমান গনির নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশে দীর্ঘ ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করা ডিআইজি নজমুল হোসেন দিদারও পুনর্মূল্যায়নের আওতায় এসেছেন। ৫ আগস্টের পর তিনি পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং পরবর্তী সময়ে ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার ওপর প্রকাশ্য নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
২০তম ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেও রাজনৈতিক তকমার কারণে দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিলেন ডিআইজি আশিক সাঈদ। বর্তমানে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতির বিষয় নয়; বরং পুলিশের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক আনুগত্যনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে সরে আসার একটি ইঙ্গিত। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ব্যক্তি নয়, এখন মানদণ্ড বদলানোর কথা ভাবা হচ্ছে—যেখানে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দীর্ঘদিন ‘ব্রাত্য’ থাকা কর্মকর্তাদের ফেরার ফলে বাহিনীর ভেতরে যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, তেমনি ধীরে ধীরে জনগণের আস্থাও পুনর্গঠিত হচ্ছে। এখন নজর সরকারের আসন্ন প্রজ্ঞাপনের দিকে—এই পরিবর্তন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব নেতৃত্বে রূপ নেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।