ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পর দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারের বাস্তব চিত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সরকারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে মাত্র একটি আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করেই দেশে ৩ কোটি ৯১ লাখের বেশি মোবাইল সংযোগ নেটওয়ার্কে সক্রিয় ছিল।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এমন তথ্য জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
পোস্টে তিনি বলেন, এনইআইআর চালুর পর ‘ক্লোন ফোন’ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যার ভয়াবহতা আগে কল্পনাও করা হয়নি।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে ‘1111111111111’, ‘0000000000000’, ‘9999999999999’-এর মতো অবাস্তব ও প্যাটার্নভিত্তিক আইএমইআই নম্বর বিপুল পরিমাণে সক্রিয় রয়েছে। তবে এই পর্যায়ে এসব আইএমইআই ব্লক করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, লাখ লাখ নাগরিক নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন, যেগুলোর রেডিয়েশন টেস্ট বা এসএআর টেস্টসহ কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা কখনোই হয়নি। দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে এসব ফোন ব্যাপকভাবে সচল রয়েছে। তবে জনজীবনে অসুবিধা সৃষ্টি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ সরকার নেবে না। তাই এসব ফোন বন্ধ না করে ‘গ্রে’ হিসেবে ট্যাগ করা হবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শুধু একটি আইএমইআই নম্বর ‘99999999999999’ ব্যবহার করে মোট ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ শনাক্ত হয়েছে। এসব তথ্য বিভিন্ন কম্বিনেশনে (ডকুমেন্ট আইডি, এমএসআইএসডিএন ও আইএমইআই) পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, স্মার্টফোনের পাশাপাশি এ ধরনের আইএমইআই বিভিন্ন আইওটি ডিভাইসেরও হতে পারে। অপারেটররা মোবাইল ডিভাইস, সিম-সংযুক্ত ডিভাইস ও আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিসিটিভি বা অনুরূপ ডিভাইস একই আইএমইআই নম্বরে আনা হয়ে থাকতে পারে। তবে বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি ডিভাইস আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু হয়েছে।
শীর্ষ কিছু আইএমইআই নম্বর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘৪৪০০১৫২০২০০০’ নম্বরের আইএমইআই দিয়ে ১৯ লাখের বেশি ডিভাইস নেটওয়ার্কে সচল রয়েছে, যেগুলো ডুপ্লিকেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে ‘৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪’ নম্বরে সাড়ে ১৭ লাখের বেশি, ‘৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬’ নম্বরে সোয়া ১৫ লাখের বেশি ডিভাইস শনাক্ত হয়েছে। এমনকি মাত্র একটি অঙ্কের ‘০’ আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ডিভাইস নেটওয়ার্কে সক্রিয় পাওয়া গেছে।
তিনি আরও একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় একাধিক ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরে এক লাখের বেশি ডিভাইস সচল রয়েছে। এসব সংখ্যা দেখে যে কেউ বিস্মিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ক্লোন ও নকল ফোনের বিস্তার সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এর গভীরতা যে এত ভয়াবহ, তা আগে বোঝা যায়নি।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। একইসঙ্গে বিটিআরসি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে সংঘটিত ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই হয়েছে অবৈধ ফোন বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল ফোন চুরির রিপোর্ট করা হয়। তবে রিপোর্ট না হওয়া ফোনের সংখ্যা আরও কয়েক লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চুরি হওয়া ফোনগুলোর অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, আন-অফিশিয়াল নতুন ফোনের নামে দেশের নাগরিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে। এমন প্রতারণা নজিরবিহীন ও অভাবনীয়। এই চক্রের লাগাম টানা এখন জরুরি।
প্রসঙ্গত, দেশের মোবাইল ফোন বাজারে অবৈধ ও আনঅফিশিয়াল হ্যান্ডসেট ব্যবহারে কার্যকর লাগাম টানতে সরকারের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব ফোনের আইএমইআই নম্বর যুক্ত হচ্ছে জাতীয় ডাটাবেজে।