১.
মি. তারেক রহমান বাঙলাদেশে আসার পর থেকে বাঙলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ইন্টারেস্টিং ডেভেলপমেন্ট দেখা যাচ্ছে৷
উনি দেশে আসার পরপরই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে বেশ টালমাটাল অবস্থা। একদিকে এনসিপি জোটে গেল; অন্যদিকে চরমোনাই পীর সাহেব ও মাওলানা মামুনুল হকের দল জোটের উপর ভরসা হারানো শুরু করল। শীর্ষস্থানীয় আলেমরা, এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিব পর্যন্ত এই জোটের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন। আবার এনসিপি ও জামায়াতের তৃণমূলের মধ্যে নির্বাচনরে কেন্দ্র করে এক ধরনের রাজনৈতিক অবিশ্বাসও তৈরি হচ্ছে। এনসিপিতেও ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।
ওদিকে তারেক রহমান দেশে আসার পর থেকে তার যাবতীয় পারফরমেন্স, বিশেষত খালেদা জিয়ার জানাজারে কেন্দ্র করে, একজন অবিসংবাদিত নেতা হিশেবে হাজির হইছেন। ডাকসু ও শিবিরের নেতারা যে তারেক রহমানের লগে মিটিং করলেন, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা আজহারি ও শায়খ আহমাদুল্লাহ যে তারেক রহমানের আম্মা বেগম খালেদা জিয়ার খাটিয়া কান্ধে নিলেন, জামায়াত আমির তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন—এগুলা মোটেই কাকতালীয় ঘটনা না। তারেক রহমান দেশে আসার পর এগুলা ঘটারই কথা ছিল। এজন্যেই গত এক বছর যারা আমারে ‘বিএনপির দালাল’ বলছে, আমি তাদের কোনো প্রত্যুত্তর করি নাই। অল্প হাসছি শুধু। সামনে বেশি হাসব।
২.
জামায়াতকে যারা ১২০-৩০ সিটের আশ্বাস দিছিলেন, তারা সেই আশ্বাস এখনও হয়ত দিয়াই যাচ্ছেন৷ তবে জামায়াত হয়ত তাতে পুরাপুরি ঈমান রাখতে পারছে না। ফলে বিপ্লবের মুড থেকে ট্রাডিশনাল অ্যাপ্রোচ, তথা বিএনপির সাথে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা, জামায়াত চালু রাখছে। ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত আন্দোলনের নামে যা কিছুই করছে, সবই আশলে ছিল এই নেগোসিয়েশনের চেষ্টা। মাঝে হয়ত তারা কিছু বিপ্লবী স্বপ্নও দেখছিল। কিন্তু আল্টিমেটলি তারেক রহমানের আগমন ও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়া, জামায়াত তাদের বিপ্লবী অ্যাপ্রোচটারে সম্ভবত রিথিংক করতেছে।
জামায়াত একা বিরোধী দল হইতে চায় না। কখনোই চায় নাই আশলে। খুব শক্তিশালী বিরোধী দল হইতে সে পারবেও না। কারণ যে এজেন্ডার ভিত্তিতে সে বা তার তৃণমূল রাজনীতি করে, সে এজেন্ডা বিপ্লবী; রাজনৈতিক না। আবার জামায়াতের ব্যাপারে একটা জাতীয় ও ধর্মীয় প্রেজুডিস আছে। ফলে স্বভাবতই ইন্টার্নাল পলিসি ও এক্সটার্নাল বিরোধের কারণে, জামায়াত খুব শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল হইতে পারবে না। তাছাড়া জামায়াতের মতো দলের টিকা থাকার জন্য পাওয়ারের সাথে যে ঘনিষ্ঠতা দরকার, শক্তিশালী বিরোধী দল হইলে সে সেইটাও হারাইতে পারে অনেকাংশে।
এমনকি, সে তো একা সরকার হইতেও আশলে ভয় পায় নানা কারণে। জামায়াতের এই ভয়ের আশ্রয় এতদিন ছিল বিএনপি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর সিচুয়েশন পালটে গেছে।
৩.
জামায়াত আমির এর আগে কয়েকবার ‘জাতীয় সরকার’-এর কথা কইছেন। তারেক রহমানের সাথে দেখা করার পর আবার সেই ইঙ্গিত দিলেন। কইলেন: ভোটের পর তারেক রহমানের সাথে আবারো দেখা করবেন। বেশ ইঙ্গিতমূলক আছেন এই আমির সাহেব!
বিএনপিও এর আগে জাতীয় সরকারের কথা কইছে বটে। তবে সেইটা কেমন জাতীয় সরকার হইতে পারে—আমরা তা জানি না।
তারেক রহমান দেশে আসার পর রাজনীতিতে যেসব নতুন নতুন ডেভেলপমেন্ট—সম্ভবত সেই প্রেক্ষিতেই আমির সাহেবের এই রহস্যময় তৎপরতা। তবে আমার মনে হয় না যে, বিএনপি জিতলে জামায়াতরে নিয়া সরকার করবে। বরং জামায়াত যেহেতু এইরকম শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার মুখে কখনো পড়ে নাই, অভিজ্ঞতা নাই, তাই তারা বিরোধী দলে গেলেও যেন কিছু ব্যাপারে (যেমন ধরা যাক, আইসিটিতে জামায়াত নেতাদের বিচারের ইস্যু বা জুলাই সনদে জামায়াতের প্রস্তাবনাগুলা বাস্তবায়ন না হইলে কী হবে বা বিরোধী দলে গেলেও জামায়াতের নানা সরকারি বন্দোবস্ত চালু থাকবে কিনা ইত্যাদি) অন্তত একটা ইন্টার্নাল নেগোসিয়েশন থাকে—সে চেষ্টাটাই সম্ভবত জামায়াত আমির এখন করছেন। আর এর বিনিময়ে বিএনপি সম্ভবত জামায়াতরে বিভিন্ন গ্রুপের বিপ্লবী চক্র থেকে ট্রাডিশনাল মোডে ফিরা আসার সুযোগ দিতে চাচ্ছে; এবং কোনো গ্যাঞ্জাম ছাড়াই নির্বাচনী বৈতরণী পার হইতে চাচ্ছে।
৪.
জামায়াতের যে ট্রাজেক্টরি, বিরোধী দল হইতে পারলে সে বিএনপির, তথা ক্ষমতার, ছায়াতলেই থাকতে চাইবে। এটা আমাদের রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য একটা অশনিসংকেত ও দারুণ সম্ভাবনা।
অশনিসংকেতটা হইল, যদি জামায়াত এই কাজ করে, বা বিএনপিই জামায়াতরে সরকারে নিয়া নেয়—যেহেতু তারাও একটা জাতীয় সরকারের কথা কইছে আগে—তাইলে আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে একটা ‘মধ্য ডান-অতি ডান’ পপুলিজম তৈরি হবে। এই পরস্থিতিতে:
১. একটা ডানপন্থী বাকশাল কায়েমের সম্ভাবনা বাড়বে।
২. বিএনপি আবারো তার ‘তৃণমূল সমস্যা’য় পড়বে।
৩. কোনো কার্যকর বিরোধী দল থাকবে না।
৪. তাই আওয়ামী লীগের ফিরা আসার সম্ভাবনা বাড়বে।
আর এই পরিস্থিতিটাই একটা দারুণ সম্ভাবনাও বটে—একটা শক্তিশালী জনপ্রিয় ধারার সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি তৈরি হওয়ার, যেটা এই পরিস্থিতিরে কাউন্টার করবে। একটা শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে। এছাড়া বাঙলাদেশের আর কোনো গতি নাই।
৫.
এনসিপির সম্ভাবনাটা আশলে সেই জায়গায়ই ছিল। আমরা, ব্যক্তিগতভাবে আমি, বারবার সে-কারণেই এনসিপিকে ওই স্ট্যান্ড নিতে বলছি। ইডিওলজিকাল লিনিং সবারই থাকে, বাট এইটা কেবল ইডিওলজিকাল ডগমার মামলা না; বরং রাজনৈতিক ক্যালকুলেশন।
কিন্তু এনসিপি তো সেই লাইনে যাওয়ার লায়েকই হইতে পারে নাই। এখন সে আছে নানা টানাপড়েনে। আমার ধারণা, নির্বাচনে একটা বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হইয়া এনসিপি নির্বাচনের পর আবারো একটা বিপ্লবী মুডে যাইতে চাবে। কিন্তু ততদিনে মানুশ আর তারে পার্টি আকারে সেভাবে বিশ্বাস করবে কিনা—আমি জানি না।
৬.
তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাঙলাদেশের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। দেশ ও জাতির সকল প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু এখন উনি। ওনারে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নাই। এটা ওনার জন্য তো বটেই, দেশের জন্যও একটা অস্বস্তিকর অবস্থা।
এর ফলে বিএনপির এখন আর ২০০১-০৬’র রাজনীতি ধইরা রাখার সুযোগ নাই। চেঞ্জ লাগবেই। মধ্য-ডান থেকে পুরাপুরি সেন্টারে আসা লাগবে বিএনপির। নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাজনীতির ভিত শক্তিশালী করতে হবে। বুর্জোয়া ডেমোক্রেটিক ভ্যালুজগুলারে গুরুত্ব দিতে হবে। অধিকতর গণবান্ধব অর্থনীতি ও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করা লাগবে। ফরেন পলিসির ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জটিলতাগুলারে আমলে নিতে হবে।
অনেকে ভাবেন, এসব করলে বুঝি তার লীগের মতো অবস্থা হবে। আমি দ্বিমত করি। বিএনপিতে ফ্যাশিবাদী এলিমেন্ট নাই বা খুবই কম—এটা আমি বহু আগ থেকেই বলি। কিচ্ছু না, কেবল ৫ বছর পরপর একটা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নিশ্চিত করতে পারলেই, প্রতিপক্ষদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও, বিএনপির আর আওয়ামী লীগের ভাগ্য বরণ করা লাগবে না।
তবে বিএনপি কদ্দুর কী পারবে—আমি নিশ্চিত না। বিএনপি যদি নিজেরে আইডিওলজিক্যালি রি-ব্র্যান্ডিং না করতে পারে, ‘বাঙলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-রে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাইলে দেশের পলিটিকাল স্প্রেক্ট্রামে মেজর কোনো চেঞ্জ আসবে না। হোয়াটএভার দ্য সিনারিও ইজ, বিএনপির এগেইন্সটে একটা ইফেক্টিভ বিরোধী দলের জায়গাটাও ফাঁকাই থাইকা যাবে হয়ত শেষমেশ।
এই পরিস্থিতিতে, জুলাইয়ের তরুণ শক্তির সামনে আবারো একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এবং এই সম্ভাবনাটা রিয়েল। এই সময়ে জুলাইয়ের পরিবর্তনকামী তরুণদের একটা পরিবর্তনবাদী জনপ্রিয় ধারার সোশাল ডেমোক্রেটিক ব্লক গইড়া তোলা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
-তুহিন খান