মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদটিকে শিক্ষা ক্যাডারের সবচেয়ে শীর্ষ পদ এবং পরিচালক, কলেজ ও প্রশাসনকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। শিক্ষা খাতের সর্বোচ্চ এই দুটি পদে একই সঙ্গে এমন একজন দায়িত্ব পালন করছেন- যিনি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিজেকে আওয়ামী ক্যাডার হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি হলেন অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান। এমনকি তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। গত ৬ এপ্রিল, ২০২৫ তাকে যখন পরিচালক, কলেজ ও প্রশাসন পদে পদায়ন দেওয়া হয় ওই সময় তিনি ওএসডি ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী ফ্যাসিস্ট হিসেবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রতিরোধে প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখার কারণে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের দাবির মুখে তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। বৈষম্য বিরোধী ছাত্ররা এই আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগও দেয় তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর তদন্ত চলছিল। তারমধ্যেই আব্দুল হান্নান সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিক্ষা খাতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ পরিচালক, কলেজ ও প্রশাসন পদে আসীন হলেন। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতির তদন্তসহ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভেস্তে যায়। শুধু তাই নয়, এরপরে এক পর্যায়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব শিক্ষা খাতের এক নম্বর শীর্ষ পদও বাগিয়ে নেন তিনি। গত কয়েক মাস ধরে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা এভাবে একই সঙ্গে দখল করে আছেন শিক্ষা ক্যাডারের সবচেয়ে শীর্ষ দুটি পদ। যা নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এর জন্য পুরোপুরি দায়ী করছেন সাবেক শিক্ষা সচিব, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদকে, যিনি জামায়াতের রুকন হিসেবে পরিচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং এর পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে গোটা প্রশাসনে জামায়াতের আমীরের ভূমিকায় রয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসনে তিনি বরাবর মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। গত এপ্রিলে বি এম আব্দুল হান্নানকে ওএসডি থেকে এনে শিক্ষা ক্যাডারের দ্বিতীয় শীর্ষ পদ- অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেন এই আব্দুর রশীদই। তখন শিক্ষা সচিব ছিলেন সিদ্দিক জোবায়ের। শিক্ষা সচিবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তিনিই আব্দুল হান্নানকে এই পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেন।
তবে এ প্রসঙ্গে সিদ্দিক জোবায়ের শীর্ষকাগজ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বি এম আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে তখন দুর্নীতির যে তদন্ত চলছিল তা জানতেন না। নথিতে এ বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। তদন্ত সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র নথি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সিদ্দিক জোবায়ের এ প্রতিবেদককে বলেছেন, নথিতে দুর্নীতির তদন্তের কথা উল্লেখ থাকলে আব্দুল হান্নানের পদায়নের প্রস্তাব তিনি অনুমোদন করতেন না। শেখ আব্দুর রশীদই মূলতঃ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের অধঃস্থন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নথি থেকে তদন্তের কাগজগুলো সরিয়ে ফেলেছেন, দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এদিকে গত ৬ অক্টোবর মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয় ‘আগ্রহী প্রার্থীকে সৎ, দায়িত্বপরায়ণ এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হতে হবে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক’। কিন্তু একদিকে এই পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রশাসনে আওয়ামী-জামায়াত লীগ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠে। অন্যদিকে কৌশলে উক্ত পদে আওয়ামী দোসর দুর্নীতিবাজ আব্দুল হান্নানকে বহাল রাখার জন্যও চেষ্টা চালানো হয়।
অধিদপ্তরের ডিজি পদে নিয়োগের জন্য যখন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ওই সময় ডিজি পদে ছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ আজাদ খান। অতীতে কখনো প্রজ্ঞাপন জারি করে মাউশির ডিজি পদে নিয়োগ হয়নি। এই প্রথম এমন নজির স্থাপন করলো মন্ত্রণালয়। নতুন ডিজি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হবে- একথা প্রফেসর আজাদ খান আগে থেকে জানতেন না। প্রজ্ঞাপন জারির পর তিনি চরমভাবে বিব্রত হন। পরদিনই মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। ডিজি পদের রুটিন দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন পরিচালক (প্রশাসন ও কলেজ) বি এম আব্দুল হান্নানের কাছে। সেই থেকে আব্দুল হান্নান একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের এই দুই শীর্ষ পদের দায়িত্বে রয়েছেন। নতুন কাউকে ডিজি পদে নিয়োগও এ মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আব্দুল হান্নানই বহাল থেকে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এর নেপথ্যেও রয়েছে ড. শেখ আব্দুর রশীদের কূটকৌশল এবং কারসাজি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তিনি নতুন ডিজি নিয়োগে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করেছেন। যাতে দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিস্ট আব্দুল হান্নানকেই ডিজি পদে রেখে দেওয়া যায়। শেখ আব্দুর রশীদের এসব কারসাজিতে পূর্ণমাত্রায় সহযোগিতা করছেন শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীন। আওয়ামী দোসর, চরম বাম ঘরানার এই কর্মকর্তা এখন জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘আগ্রহী প্রার্থীকে সৎ, দায়িত্বপরায়ণ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হতে হবে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর থাকতে হবে।’ কিন্তু মৌখিক সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে যে আটজনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয় এদের অধিকাংশই বিতর্কিত এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, পরিকল্পিতভাবেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করে অধ্যাপক হান্নানকে পদে বহাল রাখার চেষ্টা চলছে, যা ইতোমধ্যে প্রায় সফলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি চেষ্টা চালানো হয়েছিল, বি এম আব্দুল হান্নানকে পূর্ণাঙ্গ ডিজি হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে। প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হতে পারেননি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার কারণে।
শীর্ষনিউজ