আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে দশটি দল আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত সরকার গঠনের লক্ষ্যে এগোতে গিয়ে শরিকদের অনেককেই নিজেদের জনপ্রিয় আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে। এতে জামায়াতের দীর্ঘদিনের গোছানো মাঠে হঠাৎ করে জোটের প্রার্থী কেন্দ্র থেকে নির্ধারণ করে দেওয়ায় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনে ভোট নিয়ে নানা পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
তেমনই একটি সংবেদনশীল আসন হচ্ছে ভোলার বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান আসনটি। সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলার চারটি আসনের মধ্যে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য সব দিক থেকেই এগিয়ে রয়েছে ভোলা-২।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে গত দেড় বছর ধরে ভোলা-২ আসনে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা ফজলুল করিম। সম্প্রতি দলীয় মনোনয়ন জমা দেওয়ার পূর্বে হঠাৎ করে এই প্রার্থীকে জানানো হয়, এই আসনে এলডিপির প্রার্থী নির্বাচন করবেন। যদিও সর্বশেষ মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে কেন্দ্র থেকে পুনরায় জামায়াতের প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস।
ভোলা-২ আসনে জামায়াত জোট এলডিপি থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন মোকফার উদ্দিন চৌধুরী। হঠাৎ করেই তিনি এই আসনে এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়ে আলোচনায় আসেন। তার নির্বাচনী সার্বিক বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
মোকফার উদ্দিন চৌধুরী সাক্ষাৎকারে প্রতিবেদককে বলেন—“জামায়াতের প্রার্থী ফজলুল করিম এমপি হওয়ার মতো শতভাগ চান্সে রয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম যখন জেনেছেন এই আসনে এলডিপি মনোনয়ন পাচ্ছে, তিনি পুরো খুশি হয়ে গেছেন। কারণ দাড়িপাল্লা আউট মানেই তার এমপি হওয়া নিশ্চিত।”
নিচে তার সাক্ষাৎকারটি প্রশ্ন–উত্তর আকারে তুলে ধরা হলো—
প্রতিবেদক: আপনি হঠাৎ করে ভোলা-২ আসনে এলডিপি থেকে মনোনয়ন জমা দিলেন কেন? আপনার মূল পরিকল্পনা কী ছিল?
মোকফার: আমরা আগে বিএনপির জোটে ছিলাম। এখন জোটগত সিদ্ধান্ত হয়েছে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমি দেখছি, ভোলা-২ আসনে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের ফিল্ড ভালো।
আমরা জোটে গিয়েছি কারণ আমরা একটি ছোট দল। এককভাবে নির্বাচন করলে আমাদের এমপি হওয়ার সুযোগ নেই। বিএনপি একক নির্বাচন করার সক্ষমতা রাখে, আওয়ামী লীগ রাখে, জামায়াতও রাখে—হয়তো কম-বেশি। কিন্তু এলডিপি এককভাবে নির্বাচন করার সক্ষমতা রাখে না।
প্রতিবেদক: আপনি কি কখনো এমপি হওয়ার জন্য নির্বাচনে কোনো প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন?
মোকফার: বিএনপি-জামায়াতের যে পরিমাণ জনশক্তি রয়েছে, বোরহানউদ্দিনে এলডিপির তেমন জনশক্তি নেই। তবে আমি যদি নির্বাচন করি, সেটা হবে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে।
ফজলুল করিম হুজুর (জামায়াতের প্রার্থী) ভোলা-২ আসনটি সব দিক থেকে গুছিয়ে রেখেছেন। গত এক বছর তিনি পুরো দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন গুছিয়ে রেখেছেন। বর্তমানে মাঠের অবস্থান অনুযায়ী তিনি হাফিজ ইব্রাহিমকে ওভারটেক করে এমপি হওয়ার জায়গায় রয়েছেন।
আমরা যখন এলডিপি হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, জামায়াত আমাদের পাঁচটি আসন দিয়েছে। তবে জামায়াত আমাদের চাওয়ার মতো আসনই দিতে হবে। তারা যেখানে দিতে চাইবে, সেখানে তো আমরা যেতেই পারি না।
এই পরিস্থিতিতে আমি দেখেছি, এমপি হতে হলে জামায়াতের গোছানো সিট ভোলা-২ সবচেয়ে উপযুক্ত। তাই এই আসনটি চেয়েছি। কারণ এখানে গেলে এমপি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাকে যদি পটুয়াখালী দেওয়া হয়, তাহলে আমি কেন জামায়াতের সঙ্গে যাব?
প্রতিবেদক: আপনি তো কখনো ভোলায় রাজনীতি মাঠে পরিচিত ছিলেন না। জামায়াত ও সাধারণ মানুষ আপনাকে কেন ভোট দেবে?
মোকফার: আমি তো আগে কখনো জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। জামায়াতের কোনো প্রোগ্রামেও যাইনি। জামায়াত আমাকে চেনে না, তাহলে আমাকে কেমনে ভোট দেবে ভাই?
আমার প্রশ্ন হলো—জামায়াত আমাকে চেনে না, জামায়াতের কোনো সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত না, তাহলে তারা আমাকে চিনবে কিভাবে? তবে আমি জোটের প্রার্থী হলে আশা করি আমাকে সাধারণ মানুষ ভোট দিবে
প্রতিবেদক: আপনি মনোনয়ন পাওয়ার তথ্যে বিএনপি খুশি, কারণটা কি?
মোকফার: আমরা আগে বিএনপির জোটে ছিলাম, তাই আমাদের সম্পর্কও বিএনপির সঙ্গে। বিএনপির বোরহানউদ্দিনের পরিচিত মুখ (ইট কবির, কাজী ফিরোজ এবং হাফিজ ইব্রাহিম আমার আত্মীয়)। উপজেলা নেতা আজম কাজীও আমার আত্মীয়। আমি বিএনপির সঙ্গেই বিলং করি।
ভোলায় ছাতা মার্কার পাঁচ হাজার ভোটও নেই। ভোট আছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের। জামায়াতের ভোট পুরো বাংলাদেশেই কোথাও কম, কোথাও বেশি।
আমি যখন মনোনয়ন পেয়েছি, বিএনপির প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম খুব খুশি হয়েছেন। তিনি মনে করছেন, যেহেতু মোকফার মনোনয়ন পেয়েছে, ফজলুল করিম আউট—তাহলে তিনিই এমপি। দুর্বল প্রার্থী থাকলে এমন ভাবনা আসতেই পারে।
হাফিজ ইব্রাহিম চেয়েছিলেন জামায়াতের প্রার্থী দাড়িপাল্লা নিয়ে মাঠে না থাকুক। যখন আমি এলডিপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছি, তখন তাদের খুশির শেষ নেই।
প্রতিবেদক: এই আসনে ফজলুল করিম জেতার সম্ভাবনা কতটুকু?
আমি চাই ফজলুল করিম থাকুক। কারণ তার এমপি হওয়ার শতভাগ চান্স রয়েছে। তবে আমি হলে শতভাগ চান্স নেই। আমি দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়লেও কোনো আপসোস নেই।
ফজলুল করিম মনোনয়ন পেলে আমি তার সঙ্গেই মাঠে থাকবো। সে এমপি হবে, আমি আফটার হাউজে এমপি হবো। আমার ভোট নেই—তবে জোট থেকে দিলে আমি করবো।
আমি নিজেও অপরিচিত একটি দোকানে গিয়ে জামায়াতের জনসমর্থন পরীক্ষা করেছি। সেখানে ২১ জনের মধ্যে ২০ জনই বলেছেন জামায়াতকে ভোট দেবেন, একজন বলেছেন বিএনপিকে ভোট দেবেন।
প্রতিবেদক: আপনার মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় কি বিলম্ব হয়েছিল?
মোকফার: না, না। আমরা সেদিন পৌনে তিনটায় ডিসি অফিসে পৌঁছাই। আমি মূল কপিই নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন ডিসি অফিস থেকে বলা হয়, আরও চার কপি ফটোকপি লাগবে। আমি বসে থেকে আমাদের একজনকে বাইরে ফটোকপি করতে পাঠাই। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মনোনয়ন জমা দিয়েছি।