বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলতি বছর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদগুলোতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের একচ্ছত্র জয় অন্যতম বলা যায়। যে সংগঠনটি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যেই আসতে পারেনি, তাদের এ ফলাফল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামান্য আগে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বড়সড় একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ৯০ পরবর্তী সময় থেকে প্রায় তিন যুগের বেশি বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দ্বি-দলীয় বা বাইনারি রাজনীতির দ্বৈরথ চলেছে। তবে, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে এখন দীর্ঘদিনের জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে।
এমন রাজনৈতিক আবহে ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতেও বিএনপি সমর্থিত ছাত্রদলের বিপক্ষে জামায়াতের ইসলামীর সঙ্গে আদর্শিক মিল থাকা ছাত্রশিবিরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে দেখা গেছে। যদিও বাংলাদেশের ছাত্রসংসদের ইতিহাসে একসময় বাম সংগঠনগুলো প্রভাবশালী ছিল, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তারা ভোটের অংকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছে, অন্তত ফলাফলের হিসাব তাই প্রমাণ করে। নবগঠিত এনসিপি সমর্থিত ছাত্রশক্তিও (বাগছাস) তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
ঢাকসু ভোটের আগে ছাত্রদল প্রচার-প্রচারণায় শিবিরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলে দেখা গেছে পুরো উলটো চিত্র। একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ছিল জাকসু, রাকসু ও চাকসু নির্বাচনেও। জাকসুর ভিপি, রাকসুর জিএস এবং চাকসুর এজিএস বাদে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদেই ভূমিধস জয় পায় শিবির।
একনজরে ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল দেখে নেওয়া যাক :-
ডাকসু : অভূতপূর্ব জয়ে শিবিরের ইতিহাস
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দ্বিতীয় সংসদ-খ্যাত ডাকসু নির্বাচনের দাবি জোড়ালো হতে থাকে। এ সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানারে মাঝেমধ্যেই ডাকসু সচলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচী হতে দেখা যায়। প্রশাসনও ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করে।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণা হলে চলতি বছরের ৮ আগস্ট শতাধিক ছাত্রছাত্রী সাধারণ শিক্ষার্থী- ব্যানারে ঢাবির হলসমূহ থেকে বেরিয়ে এসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলনকারীরা হলভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলে। পরিস্থিরি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠার আগেই ঢাবি প্রশাসন ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পূর্নাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করে।
ডাকসুতে পূর্ববর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ১১ মার্চ। এ নির্বাচনটিকে ডাকসুর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হিসেবে দেখা হয়। ক্ষমতায় থাকা ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেওয়া হয়নি। যদিও ফলাফলের দিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ) নুরুল হক নুর সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
একই সংগঠনের আখতার হোসেনের সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয় ছাড়া কেন্দ্রীয় সংসদ ও হলসংসদের প্রায় পুরোটাই জিতেছিল বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। এ ডাকসুতে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসেন সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। উক্ত সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মাঝখানে আর কোনো নির্বাচন হয়নি।
শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলন ও দাবির মুখে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে প্রথম নির্বাচনী আয়োজন। নির্বাচনে অংশ নিতে ২৮টি পদে মোট ৬৫৮ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এবং ১০৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভূমিকায় দেখা যায়। একাধিক বাম ও ধর্মীয় সংগঠনের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে, ছাত্রলীগকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করায় সংগঠনটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচনের দিন সকাল থেকে প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুললেও তেমন বড় কোনো সহিংসতা ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে, ভোট গণনার সময় ক্যাম্পাস বাইরে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান উত্তাপ ছড়ায়। পরদিন ভোর বেলা গণনা কার্যক্রম শেষ হলে সকালে সিনেট ভবনে ডাকসু ও হলসংসদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, সকল জরিপ-ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রায় সকল পদে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছে। ছাত্রদল একটি পদেও জয় পায়নি। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ১ জন এবং স্বতন্ত্র ১ জন বাদে সব পদে বিজয়ী হয় একসময় নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রশিবির।
ভোটের ফলাফলে ছাত্রশিবির সমর্থিত সাদিক কায়েম ১৪০৪২ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পান ৫৭০৮ ভোট। জিএস পদে ছাত্রশিবিরের নেতা এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামীমের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫২৮৩। এজিএস পদে ছাত্রশিবিরের নেতা মুহা. মহিউদ্দীন খান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পান ৫ হাজার ৬৪ ভোট।
এছাড়া শুধু জগন্নাথ হল ব্যতীত হল সংসদগুলোতে প্রায় নিরঙ্কুশ জয় পায় শিবির। নবগঠিত এনসিপি সমর্থিত বাগছাসের (বর্তমান ছাত্রশক্তি) ভরাডুবি হতে দেখা গেছে।
শিবিরের এ অভূতপূর্ব ফলাফলের পেছনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কয়েকটি প্রধান বিষয় উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে- প্রচারে শিবিরের ম্যান টু ম্যান কমিউনিকেশন পন্থা গ্রহণ, হলে হলে শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো সরঞ্জাম সরবারহ, ছাত্রলীগের সময়েও কৌশলে হলে থাকার কারণে পরিচিতি ও সখ্যতার সুযোগ এবং বিএনপি ও এনসিপির জাতীয় রাজনীতির নেতিবাচক কর্মকাণ্ড।
জাকসু : নিষিদ্ধের পর সরাসরি মসনদে
ডাকসু নির্বাচনের ফল প্রকাশের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই জাকসু নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি ছিল প্রায় ৩৩ বছর পর জাকসুর প্রথম নির্বাচন। সবশেষ ১৯৯২ সালে জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ছাত্র সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি এবং গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড মো. মনিরুজ্জামান ২৯ জুন জাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ডাকসুর মতো জাকসুতেও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ আনে ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি ও অন্য বাম সংগঠনগুলো।
ভোটগ্রহণের শেষ পর্যায়ে শিবির, স্বতন্ত্র প্যানেল ও ছাত্রশক্তি ছাড়া সবাই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয়। যদিও একটি হলে ভোটার লাইনে থাকায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পর পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
ভোট গণনায় দেখা যায়, ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে। এবারের জাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১১ হাজার ৯১৯। ভোটের ফলাফল ছাপিয়ে জাকসু নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে ভোট গণনার দীর্ঘ সময়। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরে ফলাফল প্রকাশ করা হয় এবং ভোট গণনার সময় অতিরিক্ত গরমে স্ট্রোক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের এক নারী প্রভাষকের মৃত্যু হয়।
ওই সময় জাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, কয়েকটি প্যানেলের দাবির প্রেক্ষিতে ওএমআর পদ্ধতিতে মেশিনে ভোট গণনার পরিবর্তে ম্যানুয়ালি বা হাতে ভোট গণনায় সময় বেশি লেগেছে।
অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে কয়েকজন শিক্ষকের কমিশন থেকে পদত্যাগের ঘটনাও ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করে জাকসু নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া একাধিক গণমাধ্যমকর্মী।
তারা বলছেন, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের এক পক্ষের ভোট বর্জন, অন্য পক্ষের ফল প্রকাশের দাবি, ভোটের দায়িত্ব থেকে কয়েকজন শিক্ষকের সরে দাড়ানো কিংবা এক শিক্ষকের মৃত্যু সব মিলিয়ে এবারের জাকসু নির্বাচনকে ঘটনাবহুলই বলা চলে।
সব বাধা পেরিয়ে ফলাফল ঘোষণায় শুরুতেই ২১টি হল সংসদের ফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তারপর ঘোষণা করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ২৫টি পদে নির্বাচিতদের নাম।
জাকসু নির্বাচনে সহ-সভাপতি বা ভিপি পদে নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের প্রার্থী ও জুলাই আন্দোলনে অন্যতম সক্রিয় সংগঠক আবদুর রশিদ জিতু। তিনি ৩ হাজার ৩৩৪ ভোট পেয়ে শিবিরের ভিপি প্রার্থী আরিফকে পরাজিত করেন। গণঅভ্যুত্থানের আগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আর সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে ৩ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন শিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম।
এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ফেরদৌস আল হাসান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা নির্বাচিত হয়েছেন। দুজনেই শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে খুবই কম ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
সবমিলিয়ে ২৫টি পদের মধ্যে কেন্দ্রের ২০টি পদে জয় পায় শিবির। তবে হল সংসদগুলোতে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তি প্রার্থীরা ডাকসুর চেয়ে তুলনামূলক ভাল করে এখানে।
প্রসঙ্গত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে ছাত্রশিবিরের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় বা তাদের প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি।
নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪২তম সিন্ডিকেট সভায় ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করা হয় বলে দাবি করে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্টসহ কমপক্ষে ২২টি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।
যদিও ওই সময় ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়নি দাবি করে এক বিবৃতি দেয় সংগঠনটির নেতারা।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছাত্রশিবিরকে আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে নিষিদ্ধের একটি বয়ান তৈরি করে এসেছে। আদতে এই বয়ানের কোনো সত্যতা নেই। ১৯৮৯ সালের ১৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ১৪২তম সভায় শিবির নিষিদ্ধের প্রস্তাবনা এলেও এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। বরং সভার সিদ্ধান্ত ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাবহির্ভূত বিধায় এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়’ উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
রাকসু : দুর্গে ভূমিধস জয়
ছাত্রশিবিরের গড় হিসেবে পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ১৬ অক্টোবর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্য দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৮ হাজার ৯০১ জন যোগ্য ভোটারের মধ্যে মোট ২০ হাজার ১৮৭ জন শিক্ষার্থী ভোট দেয়।
ফলাফলে দেখা যায়, ডাকসু ও জাকসুর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিবির-সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেল ২৩টি কেন্দ্রীয় পদের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করে। এর মধ্যে সহ-সভাপতি এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদকের পদও রয়েছে।
শিবির-সমর্থিত প্যানেলের মুস্তাকুর রহমান জাহিদ ১২ হাজার ৮৮৭ ভোট পেয়ে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম প্যানেলের শেখ নূর উদ্দিন আবির পেয়েছেন ৩৩৯৭ ভোট।
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদটি পেয়েছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক এবং আধিপত্য বিরোধী ঐক্য প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তিনি ১১ হাজার ৫৩৭ ভোট পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ফাহিম রেজাকে পরাজিত করেন। ফাহিম ৫ হাজার ৭২৯ ভোট পেয়েছেন। ফাহিম রেজাও একজন সমন্বয়ক।
এজিএস পদে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের এসএম সালমান সাব্বির ৬ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের জাহিন বিশ্বাস এশাকে পরাজিত করেন।
এ বছরের রাকসু নির্বাচনে মোট ৯০৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২৩টি কেন্দ্রীয় পদের জন্য ২৪৮ জন, ১৭টি হল পরিষদের জন্য ৫৯৭ জন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে পাঁচটি ছাত্র-প্রতিনিধি পদের জন্য ৫৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
চাকসু : ‘যথারীতি’ শিবিরের জয়, ছাত্রদলের ব্রেকথ্রু
দীর্ঘ ৩৬ বছর পর চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২৬ টি পদ ও হল সংসদের মোট ২৩২ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১ হাজার ৮৮ জন প্রার্থী। যার মধ্যে চাকসুর ২৬টি পদে লড়েন ৪৮৮ জন প্রার্থী, আর ১৪টি হল ও একটি হোস্টেলের ২০৬টি পদে লড়েন ৬০০ জন।
বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া বেশ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। পূর্ববর্তী ছাত্রসংসদগুলোর ভরাডুবির পর চাকসুতে এজিএসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জয়ের দেখা পায় ছাত্রদল। এছাড়া অন্য পদগুলোতে শিবির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখে।
চাকসুতে মোট ভোটার সংখ্যা ছিলো ২৭ হাজার ৫১৬ জন। এরমধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ভিপি পদে শিবির সমর্থিত ইব্রাহীম হোসেন রনি মোট ৭ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম ছাত্রদলের প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় পান ৪ হাজার ৩৭৪ ভোট। জিএস পদেও শিবিরের সাঈদ বিন হাবিব মোট ৮ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল প্যানেলের প্রার্থী শাফায়াত হোসেনকে পরাজিত করেন। তিনি পান ২ হাজার ৭২৪ ভোট। এজিএস পদে ছাত্রদলের আইয়ুবুর রহমান তৌফিক মোট ৭ হাজার ১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাজ্জাত হোছন মুন্না পান ৫ হাজার ৪৫ ভোট। সবমিলিয়ে কেন্দ্রে ২৬ পদের মধ্যে ২৪ পদেই জয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
জকসু : বেগম জিয়ার মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত
৩০ ডিসেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের পর এটি হতো প্রথম নির্বাচন। কিন্তু ওই দিন ভোরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে ভোট স্থগিত করা হয়। পরে ৬ জানুযারি পুনরায় ভোটের দিন হিসেবে ঘোষণা করেন জবির ভিসি।