জানাজায় জনতার মহাসমুদ্র কেবল মানুষের উপস্থিতিই নয়, এটা মহান আল্লাহর দরবারে একদল সাক্ষীর দাঁড়িয়ে যাওয়া। যখন লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ একসাথে দোয়া করেন— ‘‘হে আল্লাহ, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন’’, সেই মুহূর্তটাই হয়তো একজন মুসলিমের নাজাতের উসিলা হয়ে যায়। আর যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ও হক্কানি আলেম-উলামা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয়ের ভালোবাসা থেকে এসে এক কাঁতারে দাঁড়িয়ে জানাজায় সামিল হন তখন তার চাইতে আর বড় সৌভাগ্যবান মুসলিম কে আছেন!
ইসলাম ও আলেম সমাজের প্রতি সর্বদা দরদ দেখানো সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন সৌভাগ্যবান মহীয়সী নারী। দেশের কোনো স্বনামধন্য ইসলামি স্কলারের জানাজায়ও কখনও হয়তো এত হাক্কানি আলেম-উলামা ও দ্বীনদার মানুষকে একত্রে দেখা যায়নি, যেটা দেখা গেল আপসহীন এই নেত্রীর শেষ বিদায়ে। এটা কেবল বাংলাদেশ নয়, রেকর্ড তৈরি করেছে গোটা বিশ্বে।
জানাজা ও দাফনে শীর্ষস্থানীয় আলেমদের উপস্থিতি
খালেদা জিয়ার জানাজা কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি পরিণত হয়েছিল ধর্মীয় ও জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য সমাবেশে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রীর শেষ বিদায়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক আবেগঘন পরিবেশ। তার জানাজায় শরিক হতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা দলে দলে যোগ দেন। এটিকে তাঁর সাথে আলেম সমাজের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
দেশের মানুষের কল্যাণে আপসহীনভাবে ত্যাগ শিকার করা, কারানির্যাতিত এই নেত্রীর জানাজা পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি আবদুল মালেক, যিনি কেবল দেশের পরিধিতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এক অনন্য নাম। হাদিস, ফিকহ এবং ইসলামি আইন শাস্ত্রের গবেষণায় তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত হিসেবে স্বীকৃত।
দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, শায়খুল হাদিস এবং পীর-মাশায়েখরা জানাজায় কাতারবন্দি হন। জানাজা শেষে এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, আস-সুন্নাহ ফাউণ্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক প্রিয় নেত্রীর কফিন নিজের কাঁধে তুলে নেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। আরও অংশ নেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, শায়েখে চরমোনাই।
জানাজায় আরও অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্ট) স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদ।
ইসলাম ও আলেম-সমাজকে যেভাবে দরদ করতেন খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন এবং আলেম-সমাজের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। মৃত্যুর পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশিষ্ট আলেমদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ধর্মপ্রাণ ছিলেন, আলেম সমাজের প্রতি দরদ করতেন- তেমনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের প্রসারেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন।
ধর্মীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণে বেগম খালেদা জিয়া যে রাজনৈতিক ধারা বজায় রেখেছিলেন, তাতে আলেম সমাজের সাথে তার সম্পর্ক একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। খালেদা জিয়ার শাসনামলগুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে তিনি শীর্ষ আলেমদের পরামর্শ নিতেন। আলেম সমাজকে তিনি জাতির দিশারি হিসেবে গণ্য করতেন এবং সে অনুযায়ী তাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও সম্মান নিশ্চিত করতেন।
দেশের দ্বীনি শিক্ষা তথা মাদরাসা শিক্ষা উন্নয়নে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনিস্টিউট। অবহেলিত ও বঞ্চিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা ও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সমপর্যায়ের ঘোষণা দিয়ে বেতনভাতা চালু করেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনাচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সর্বদা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেন। নিয়মিত নামাজ আদায় এবং পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি তার মধ্যে ইসলামের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তিনি ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করেছেন।
সঙ্গত কারণেই মরহুমা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ছিল শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা থেকে শুরু করে মাদরাসা পড়ুয়ারা। শেষ বিদায় তথা জানাজায় এত দ্বীনদার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণকে মমতাময়ী এই মায়ের জন্য সৌভাগ্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এরআগে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার খবরেও দেশের অগণিত আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ তার সুস্থতা কামনায় দোয়া করেছেন। বহু ইসলামী চিন্তাবিদ তাকে ‘ইসলামী মূল্যবোধের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে অভিহিত করেন। মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে তার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে আলেমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছেন।
শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি আলেম-উলামাদের সঙ্গে কেবল রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখেননি, বরং তাদের প্রতি তার ছিল আত্মিক শ্রদ্ধা। ইসলামের অবমাননা রুখতে তিনি সব সময় কঠোর অবস্থান নিতেন।’’
তারা স্মৃতিচারণ করে আরও বলেন, ‘‘বেগম জিয়া আলেমদের ভালোবাসতেন, আজ আলেম সমাজ তাদের দোয়া দিয়ে সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিচ্ছেন। তিনি ছিলেন ইসলামের এক অকৃত্রিম সেবক। খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করা, মসজিদ-মাদ্রাসা সংস্কার এবং হজ ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের মতো অনেক প্রশংসনীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি ছিলেন সোচ্চার।’’
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাদ্রাসায় ও এতিমখানায় তার মাগফেরাত কামনায় খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। আলেম সমাজ তাদের বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, দেশের ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নে খালেদা জিয়ার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রেজাউল করিম নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘‘কি সৌভাগ্য তার। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ালেন মুফতী আব্দুল মালেক হাফি.। কফিন কাঁধে নিলেন ড. মিজানুর রহমান আজহারী ও আল্লামা মামুনুল হক। এছাড়াও চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম সাহেব সহ আরো বহু হক্কানী আলেমরা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।খালেদা জিয়া যেমন আলেমদের ভালবাসতেন তেমনি আলেমরাও বেগম খালেদা জিয়াকে খুব ভালবাসতেন।’’