Image description

সাতক্ষীরা: সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার লোকালয়ে একের পর এক বন্যপ্রাণী চলে আসার ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে একই এলাকা থেকে একাধিক বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ ও একটি বন্য শূকর উদ্ধার করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার ভোরে গাবুরা ইউনিয়নের চকবার এলাকার কাসেম সরদারের বাড়ির পাশে স্থানীয়রা একটি হরিণ দেখতে পান।

বিষয়টি নজরে আসার পর স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হরিণটিকে আটক করেন এবং বন বিভাগকে অবহিত করেন। এরই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একই ইউনিয়নের সুন্দরবন ঘেঁষা দৃষ্টিনন্দন এলাকা থেকে একটি বন্য শূকর উদ্ধার করে স্থানীয় এলাকাবাসী। পরে বন বিভাগের সহায়তায় উদ্ধারকৃত হরিণ ও বন্য শূকরকে প্রাথমিকভাবে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। পরবর্তীতে সেগুলো সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।
হরিণ উদ্ধারের বিষয়ে স্থানীয় কাশেম সরদার জানান, হঠাৎ তিনি দেখতে পান বাড়ির পাশে একটি কুকুর উদ্ধারকৃত হরিণটিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এসময় স্থানীয়দের সহযোগিতায় তিনি হরিণটি উদ্ধার করেন। পরে বন বিভাগকে খবর দেন।

এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর একই এলাকার লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছিল।

সে সময়ও স্থানীয়দের সহায়তায় বন বিভাগ হরিণটি উদ্ধার করে সুন্দরবনের কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার এলাকায় অবমুক্ত করে।
একই এলাকা থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসায় স্থানীয়দের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে- কেন বনাঞ্চলের প্রাণীরা মানুষের বসতিতে চলে আসছে।

এলাকাবাসীর ধারণা, সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের তৎপরতা বৃদ্ধি, শীত মৌসুমে অবৈধ শিকার বেড়ে যাওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্য সংকট এবং আবাসস্থলের বিঘ্ন ঘটায় বন্যপ্রাণীগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসছে।

গাবুরার ৯ নম্বর সোরা এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আগে এভাবে ঘন ঘন হরিণ বা বন্য শূকর লোকালয়ে আসত না। এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।

এতে মানুষ যেমন আতঙ্কে থাকে, তেমনি বন্যপ্রাণীগুলোর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
গাবুরার দৃষ্টিনন্দন এলাকার সুন্দরবনের নদীতে মাছধরা জেলে কাশেম সরদার বলেন, শীত এলেই সুন্দরবনে চোরা শিকার বেড়ে যায়। হরিণ শিকারীদের তাড়া খেয়ে হরিণ-শূকর লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এটা শুধু দুর্ঘটনা না, এটা বড় বিপদের লক্ষণ।

ডুমুরিয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা বলেন, বন যদি ঠিক থাকত, তাহলে হরিণ আর বন্য শূকর গ্রামে আসত না। খাবার আর নিরাপত্তার অভাবেই ওরা লোকালয়ে চলে আসছে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শীত মৌসুমে সুন্দরবনের নদী-খালে পানি কমে যায়, ফলে বন্যপ্রাণী সাঁতরে লোকালয়ে চলে আসে। অনেক সময় বাঘের তাড়া খেয়েও হরিণ লোকালয়ে চলে আসে। এছাড়াও হরিণ শিকারীদের ধাওয়া খেয়েও বন্যপ্রাণীরা আতঙ্কিত হয়ে বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ের দিকে ছুটে আসে।

এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো প্রাণীর ক্ষতি না করে দ্রুত বন বিভাগকে অবহিত করা জরুরি। 

অন্যদিকে বন্যপ্রাণী শিকারীদের বিষয়ে বনবিভাগ কঠোর নজরদারি রেখেছে বলেও দাবি এই বন কর্মকর্তার।

এদিকে পরিবেশবিদরা মনে করছেন, বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে চলে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার একটি সতর্ক সংকেত। দ্রুত চোরা শিকারীদের দমন, বনাঞ্চলে নিরাপদ আবাস ও খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

স্থানীয় সামাজিক কর্মী কামরুজ্জামান বলেন, এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে সুন্দরবনের পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শুধু উদ্ধার নয়, চোরাশিকার বন্ধ না করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।