বিগত ১৬ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতসহ বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে চীন। চীনের নেতা শি জিন পিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিসি) বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিতে বিশ্বাসী। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক বা আসুক না কেন, তার সঙ্গে কাজ করে এবং করতে চায় বেইজিং।
যদিও বাংলাদেশে চীনের এই নীতির সমালোচনা আছে। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টি বেশ সমালোচিত হয়েছে। অপরদিকে, শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানাতেও চীন দেরি করেনি।
কূটনৈতিক অঙ্গন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পক্ষপাতের চেয়ে চীন বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। সেজন্য চীন কোনো দলকে আলাদা গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়; অর্থাৎ সরকারে যারা থাকে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগটা বেশি করে থাকে।

বাংলাদেশে চীনের কূটনীতি হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি চীন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও (ইইউ) একই কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশল এক্ষেত্রে ভিন্ন। চীন তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারলেই হলো। কে বা কোন দল ক্ষমতায় এল বা না এল সেটা তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। ক্ষমতায় যে দলই আসুক, চীন তার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, চীনের বাংলাদেশে কূটনীতিটা হলো মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের। বাংলাদেশে তাদের অনেক প্রকল্প আছে। এখনো কিছু কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তেরি করার চেষ্টা করেছে, তেমনি আগামীর চিন্তাও তারা করছে। সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। ক্ষমতায় যে দলই আসুক, চীন স্বাগত জানাতে দ্বিধাবোধ করবে না।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শুরু থেকেই নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী ছিল বেইজিং। তবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার কিছুদিন ‘ধীরে চলো নীতিতে’ ছিল। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে মরিয়া চীন অতি আগ্রহ নিয়ে সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিল। কিছুদিন পর দিল্লির সঙ্গে দূরত্বসহ নানা দিক বিবেচনা করে বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে সরকার।
বিএনপি-জামায়াতসহ সব দলের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সিরিজ বৈঠক
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যান। তার ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনে সরকারি সফরে যান। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি চীন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

ঢাকার চীনা দূতাবাসের তথ্যমতে, রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মাসখানেক পরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের এটি ছিল প্রথম সাক্ষাৎ।
এই দুই সাক্ষাতের মধ্যে জামায়াতে আমিরের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে সেদিন আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। রাষ্ট্রদূত তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীকে একটি সুশৃঙ্খল দল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
চীনা দূতাবাসের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে একবার, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তিনবার এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেছেন।

অন্যদিকে, এই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে তিনি দুইবার সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়া, গাজীপুরে জামায়াতের আমিরের উপস্থিতিতে কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেন ইয়াও ওয়েন।
চলতি বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে রাষ্ট্রদূত বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। দুই দলের বাইরে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একবার করে সাক্ষাৎ করেন রাষ্ট্রদূত।

চীনা দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন লিউ ইউয়িন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া, চলতি বছরের জুনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিনিধিরা চীন সফর করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলীয় প্রতিনিধি দল চীনে যায়। সেখানে উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়, রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

পরের মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি দল চীন সফর করেন। তারা চীনা থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করে ইসলামী অর্থনীতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। পরের মাস আগস্টে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করেন।
যে দলই ক্ষমতায় আসুক, কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘চীনের ধরনই হলো— যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তার সঙ্গে কাজ করা। তাদের এমন কোনো ‘অ্যালার্জি’ নেই যে, অমুক দল আসলে তার সঙ্গে কাজ করব না। চীন আসলে ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। সেজন্য তারা বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করেছে, আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও ভালো যোগাযোগ রক্ষা করতে দেখা গেছে।’’
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, ‘চীন ভালো করে জানে অন্তর্বর্তী সরকার চলে যাবে, নতুন সরকার আসবে। চীন সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এটা নতুনত্ব নয়। বিশেষ করে চীনের পরিবর্তন যখন হয়েছে আশির দশকে, তখন থেকে তারা এই বিষয়টা বড় আকারে শুরু করেছে। কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে তারা সম্পর্ক আগেও করেনি, এখনো করার কথা নয়। সেই জায়গায় আমার মনে হয়, ভবিষ্যতেও চীন সব দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দল ছাড়া অন্য দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব না, এটা কখনো চীনের মধ্যে ছিল না। শুধু বাংলাদেশের ব্যাপারে নয়, অন্য দেশেও যখন তারা কাজ করে, তারা চেষ্টা করে সব দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে।’
হাসিনাকে বৈধতা দিতে একরকম প্রতিযোগিতা করে চীন-ভারত
২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারকে বৈধতা দিতে চীন ও ভারত কেউ দেরি করেনি। কে কার আগে নতুন সরকারকে স্বাগত জানাবে, তা নিয়েও তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে দিল্লি ও বেইজিং প্রতিযোগিতা করে। পরে অবশ্য শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুনে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর দিল্লি দিয়ে শুরু করেন।
পরের মাসে (জুলাই) তিনি বেইজিং সফর করেন। তিনি যখন চীন সফরে ছিলেন, তখন দেশে কোটা আন্দোলন চলছিল। বেইজিং সফর শেষে ঢাকায় ফিরে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেদিন কোটা আন্দোলনকারীদের নিয়ে দেওয়া তার ‘তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা কোটা পাবে’— এমন বক্তব্য আন্দোলনকারীরা মেনে নিতে পারেননি। সেই বক্তব্যই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। চীন সফরের ২৬ দিনের মাথায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে বেইজিং
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘বিগত সময়ে যখন বিএনপি সরকারে ছিল, তখন চীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। আবার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তারা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। চীনের এই আদান-প্রদান নতুন কিছু নয়। চীন বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন অংশীদার। কিন্তু তারা সাধারণত, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আমাদের অনেক বন্ধু আছে, যাদের ব্যাপারে এ কথা খাটে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করার জন্য আসতে চায়, তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়; ভারতও তাই।’
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ আরও বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে অনেক দেশই চেষ্টা করে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে যেটা হয়ে থাকে, তারা এটা অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে করে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে কাকে (রাজনৈতিক দল) সে তার মনমতো পাবে, সেই দলকে তারা গুরুত্ব দেয়। অন্যদের (রাজনৈতিক দলগুলো) নিয়ে এত ভাবে না।’