
দেশের কিশোর-তরুণদের বড় একটা অংশ ‘গ্যাং কালচারে’ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারে ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকেই বেশি ঝুঁকছে তারা। শিক্ষাঙ্গনে পাঠের অনুকূল পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় অনেক কিশোর-তরুণ প্রকৃত শিক্ষালাভ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের বড় একটা অংশ দিগভ্রান্ত হয়ে হতাশা থেকে মাদকে আসক্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করে ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে রাজধানীসহ সারা দেশের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সমস্যা থেকে উত্তরণে কিশোর-তরুণদের বঞ্চনা কমাতে হবে, রাষ্ট্রকে আর্থিক ও শিক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগও করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে।
এই কিশোর গ্যাং সদস্যরা ইভ টিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা—এমনকি খুনের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একসময় কিশোর গ্যাংয়ের নেতা ছিলেন সারোয়ার জাহান (ছদ্ম নাম)। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, বছর তিনেক আগে ক্লাস টেনে পড়ার সময় কাজলা এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হলে তিনি তাঁকে থাপ্পর দেন। এর পর থেকে মাথায় আসে কয়েকজনকে নিয়ে একটি দল তৈরির। অল্প দিনে সম্ভবও হয় সেটি। তিনি বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার্থী, ক্লাস টেন ও নাইনের ১৫-২০ জনকে নিয়ে দল গড়ি। কয়েকজন বখাটেকেও দলে নেওয়া হয়।’
সারোয়ারের ভাষ্য, কিছুদিনের মধ্যে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার নজরে পড়েন তাঁরা। এরপর থেকে তাঁর হয়ে কাজ করতে থাকেন।
তাঁর ভাষ্য, “তাঁকে ‘ভাই’ বলে ডাকতাম। কোথাও কাউকে ধমক দিতে হলেও আমরা ছুটে যেতাম। লোকজন আমাদের ভয় পেত। এই ভয় পাওয়াটাকে আমরা খুব এনজয় করতাম। কেউ সম্মান না দেখালে, গালি দিলে মারামারির ঘটনা ঘটানো হতো। আধিপত্য বিস্তারে কাজে লাগত। এতে আমাদের পাশে থাকতেন ‘বড় ভাই’।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মা-বাবা প্রথম প্রথম বুঝতে পারেননি। পরে যখন অভিযোগ আসতে লাগল, তখনই পরিবার থেকে চাপ সৃষ্টি করা শুরু হলো। এসএসসি পাস করার পর আর ওইসবে যাইনি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় হুমকি সৃষ্টি করছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এসব কারণে সমাজিক অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬৯ শতাংশ কিশোর অপরাধী দারিদ্র্যের কারণে অপরাধ জগতে আসে। পারিবারিক কলহ, বাবা-মায়ের অবহেলা এবং স্নেহ-ভালোবাসার অভাব কিশোরদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং তাদের অপরাধপ্রবণ করে তোলে। শিক্ষার অভাব ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতাকে হ্রাস করে, ফলে কিশোররা সহজেই অপরাধের পথে পা বাড়ায়। এ ছাড়া শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে, যা কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সমাজে বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অসমতা দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ শিক্ষিত তরুণ দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অনাস্থা শৃঙ্খলা তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিশোর-তরুণদের ইমোশন বেশি থাকে। তারা সামাজকে ভাঙতে পারে-গড়তে পারে, বিপ্লব করতে পারে। কোনো বিশৃঙ্খলা দেখলে তরুণদের মাঝে ক্ষোভ জন্মায়।
মানবাধিকারকর্মী এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান কালের কণ্ঠকে বলেন, সামাজিক অবক্ষয়টা শুরু হয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল থেকে। তখন বিচারহীনতার কারণে অনেকে মবের দিকে ঝুঁকেছিল। গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই মব আরো বিস্তৃত হয়েছে। ছাত্ররা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরাতে পারলেও অনেকে দুর্বৃত্তায়নের দিকে হেঁটেছে। কোনো কোনো জায়গায় শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করেছে—যেটা কাম্য ছিল না। আমি মনে করি, সামাজিক অবক্ষয় রোধে ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা সমাজের অবক্ষয় দূর করে একটা সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে পারে।
ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে চলছে অপরাধ : ফেসবুক, টিকটক, লাইকি, মাইস্পেসসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিশোর-তরুণদের বিপথগামী করে তুলছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বেশির ভাগ শিক্ষিত তরুণ ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ব্লগিং করে অর্থ উপার্জনের জন্য নেমে পড়ছে, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে খোলামেলাভাবে মাদক বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত অপব্যবহারের ফলে এ ধরনের সামাজিক অবক্ষয় দিন দিন বাড়ছে।