Shafquat Rabbee Anik ( শাফকাত রাব্বি অনিক)
৩১৮ পাতার নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট পড়লাম ।
এইটা নিশ্চিত আর দশটা সংস্কার কমিশনের মতো, এই নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কার গুলোর একটাও বাস্তবায়ন না হবার সম্ভাবনা প্রচুর।
এর কারণ হচ্ছে এই কমিশনের রিপোর্ট ভর্তি এমন সব চাওয়া পাওয়া যার অনেক গুলো সারা পৃথিবীতে নতুন, আন-টেস্টেড, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিচিত্র।
এই সব আজাইরা জিনিস ঢুকায় নারীদের সত্যিকারের প্রয়োজনীয় সংস্কার যে গুলো আসলেই করা যাইতো সেই গুলিও এখন করা যাবে না।
যারা এই রিপোর্ট লিখছে , তাদের মধ্যে মূল উৎসাহ যেইটা আমি দেখতে পারতেছি সেইটা হচ্ছে "পয়েন্ট স্কোরিং " , আসলেই ইম্প্লিমেন্ট করার মতো রিফর্ম নিয়ে এরা উৎসাহী ছিল বলে মনে হয় নাই।
যেমন, দেশে মৃত্যু দন্ড থাকবে কি থাকবে না , সংসদের সদস্য কয়জন হবে , রাষ্ট্রের রূপ কি হবে সেকুলার নাকি ধর্মীয় এগুলো নিয়ে এই কমিশন সুপারিশ করে বসেছে। এগুলির জন্যে আলাদা কমিশন আছে মিনিমাম আরো ২ টা।
এরা রাষ্ট্রের প্রকার নির্ধারণ করেছে "ইহ-জাগতিক " --- এই শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্র বিজ্ঞানে একটু অপ্রচলিত বলে আমার ধারণা। এই বিচিত্র শব্দের মাধ্যমে খুব সম্ভবত "ধর্ম নিরপক্ষেতা " শব্দটির নতুন এক অবয়ব তুলে ধরা হয়েছে।
আধুনিক যেই আইনের অধীনে সারা পৃথিবী চলে , সেটা এসেছে জুডিও-ক্রিষ্টিয়ান মোরাল কোড থেকে। যেখানে মানুষের মোরালিটির একটা ফান্ডামেন্টাল নির্ধারক হচ্ছে হেভেন এন্ড হেল । এগুলি পরজগতের জিনিস।
মানুষ নিজে থেকে দোজখে যাওয়ার ভয়ে ভালো ভালো কাজ করে , যার ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুবিধা হয়। এই দোজখে যাওয়ার ভয় না থাকলে , রাষ্ট্র পুরাপুরি ইহজাগতিক হয়ে গেলে, মেয়ের সাথে বাবার যৌনতার আর কোন বাধা থাকে না , উভয়ের সম্মতিতে, আইনগত ভাবে ।
এক জায়গায় বলা আছে সকল ধর্মের মানুষের জন্যে উত্তরাধিকার সমান করা হবে , আবার এক জায়গায় বলা আছে ব্যাপারটা "অপশনাল" রাখা হবে । কোন বাবা চাইলে তার মেয়ে সন্তানকে এখনো সমান সমান সম্পদ লিখে দিয়ে যেতে পারেন । আমার তিন সন্তানকে আমি তাই করবো। কিন্তু কেউ যদি সেইটা না করতে চায় , কেউ যদি ইসলামী আইনে বন্টন করতে চায় , তাকে সেটা করার অধিকার দিতে হবে মুসলিম সখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে । বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছেলে সন্তানের উপরে পরিবারের একটা বাড়তি চাপ থাকে , অন - এভারেজ, যদিও এর ব্যতিক্রম আছে অনেক । কিন্তু অন-এভারেজ ছেলে সন্তানদের উপরে বাড়তি এক্সপেক্টেশনের ব্যাপারটা তার পারিবারিক সম্পত্তির উপরে একটা বাড়তি অধীকার তৈরী করে। স্ত্রীরা আবার স্বামীর সম্পদের অংশ পায়, এসব নানা ধরণের সামাজিক নীতির কারণে সম্পত্তির বন্টনের ধর্মীয় এবং সেকুলার দুইটা তরিকা রাখাই বাংলাদেশের জন্যে বেস্ট। এই কথা ক্লিয়ার করে বলা উচিত ছিল কমিশনের।
কমিশন প্রস্তাব করেছে সংসদে ৬০০ আসন রাখতে হবে , যেটা আলী রিয়াজের সংস্কার কমিশনের ৪৫০ আসনের প্রস্তাবের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
কমিশন প্রস্তাব করেছে ৩০০ পুরুষ ৩০০ নারী সংসদ সদস্য হবেন। আলী রিয়াজের কমিশন চেয়েছে ১০০ , এইখানে ৩০০ মহিলা সংসদ চাওয়া হয়েছে ।
এর বাইরে প্রতিটি ওয়ার্ডে , প্রতিটি কর্পোরেট বোর্ডে, প্রায় ৫০ - ৫০ নারী পুরুষের বিন্যাস রাখতে হবে বলে রেকমেন্ডেশন করা হয়েছে।
এরকম জবরদস্তি মূলক আইনি ভাবে চাপিয়ে দেওয়া সমতার আইডিয়া পৃথিবীর কোথাও নাই। কারণ এটা সমতা না, এইটা আরেক ধরণের বৈষম্য --যেটা মেরিটোক্রেসির বিরোধী।
কমিশনের একটা প্রস্তাব হচ্ছে পতিতা বৃত্তিকে ফরমাল পেশা হিসেবে স্বীকৃত করতে হবে।
আমেরিকায় পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ। এর পরেও মানুষ এই কাজ করে , কিন্তু কাজটা নিষিদ্ধ।
যুক্তরাজ্যে পতিতা বৃত্তি নিষিদ্ধ না , কিন্তু পতিতা বৃত্তির করার স্থাপনা , কিংবা পিমপিং করা , কিংবা দুই জনের বেশি পতিতা এক বাসায় থাকা ইত্যাদি নিষিদ্ধ।
পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি অতি লিবারেল দেশে পতিতাবৃত্তিকে আইনসিদ্ধ করা হয়েছে , তবে কোথাও সেই ভাবে ফর্মাল এমপ্লয়মেন্ট হিসেবে দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই।
ফর্মাল এম্প্লয়মেন্টের ক্ষেত্রে পেনশন , ইন্সুরেন্স , ইনজুরি লায়াবিলিটি , ছুটি , বেতন কাঠামো নির্ধারণ অনেক বেপার সেপার এসে যায়।
পতিতার ছুটি , পেনশন , কিংবা কাজ করার সময় ব্যাথা বেশি পেলে কে কাকে ধরবে এই সব রঙিন ইস্যুতে তামাশা শুরু হবে কমিশনের প্রস্তাবনা সিরিয়াস ভাবে ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে। যেগুলোর জন্যে বাংলাদেশ কেন , পৃথিবীর প্রায় কোন দেশই প্রস্তুত না। এই জিনিসের দাবি বাংলাদেশে জানানোর একটাই মানে হতে পারে ---- যারা এই দাবী জানিয়েছেন তাদের প্রব্লেম সল্ভ করার ইচ্ছা নাই , নতুন নতুন আইডিয়া দিয়ে নতুন প্রব্লেম তৈরির কাজ তারা হাতে নিয়েছেন।
কমিশনের রিপোর্টে বিভিন্ন জায়গায় "নারী - পুরুষ " শব্দ দুটি ব্যবহার হয়েছে , আবার অনেক জায়গায় "জেন্ডার আইডেন্টিটি " "জেন্ডার সমতা " ইত্যাদি বলা হয়েছে । এইগুলি নিয়ে দুনিয়াতে প্রচুর ক্যাচাল আছে , যেগুলো নিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষকে উতলা না হলেও চলে। এই টুক কমন সেন্স কমিশনের মহিলাদের দেখানো উচিত ছিল।
আর এক জায়গায় বলা হয়েছে নারীদের খারাপ ভাবে দেখায় এমন কোন কিছু কোন মিডিয়াতে দেখানো যাবে না , সেই লক্ষ্যে আইন করতে হবে।
এইটা একটা ট্রাপ হবে নারীদের জন্যে।
কারণ, খারাপ ভাবে দেখানোর সংজ্ঞা একেক সরকার একেক ভাবে দেখতে পারবে , এবং পরে এটার কারণে মিডিয়ার বিপদ বাড়বে , কমবে না।
একজায়গায় বিয়ের সর্ব নিম্ন বয়েস ১৮ করার দাবী করা হয়েছে , ডিভোর্স হলে সম্পদের অর্ধেক অর্ধেক ভাগের কথা বলা হয়েছে। লেখনীর মধ্যে এই ইস্যু গুলার নুয়ান্স গুলো ছিল না ক্লিয়ার ভাবে । আমি আর আলোচনা বাড়াচ্ছি না , লেখা লম্বা হবে বলে।
মজার কথা হলো , কমিশনের কমিশনার সব কয়জন মহিলা কেন সেইটা আমি জানি না। কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে পুরুষদের সাথে কাজ করতে হবে , এবং পুরুষদের রাজি করিয়েই এগুতে হবে। ইউনূসের কাছে একটা রিপোর্ট দিয়ে দিলেই তো হবে না, বরং ইউনুস সাহেব বিপদে পড়বেন। খুব সম্ভবত উনি অলরেডি বিপদে পরে গেছেন। কমিশনে কয়েকজন পুরুষ রাখা উচিত ছিল, হুজুর না রাখেন , অন্তত, ইয়ে মানে , আমাদের মতো কাউকে রাখলে হতো না ?
৩১৮ পাতার রিপোর্টে অবশ্যই অনেক গুলো ভালো প্রস্তাব ছিল। নারীদের আইনি সুরক্ষা , চাকরিতে হয়রানি বন্ধ , খেলোয়াড়দের বেতন ভাতার সমতা, প্রসুতিকালীন ছুটি , চাকরিজীবী মহিলাদের জন্যে শিশু ডে কেয়ার সহ অনেক ভালো ভালো দাবি ছিল, শুধু ওগুলো রাখলে কমিশনের প্রস্তাবনা গুলো পাশ করানো যেতো খুব সহজেই। এখন এই গুলির একটাও হবে না, কারণ অনেক গুলো বিচিত্র বিতর্কিত আইডিয়া এই ভালো আইডিয়া গুলোকে ঢেকে রাখবে ।
রিপোর্টের এক জায়গায় কমিশন বড় বড় করে লিখেছে "পুরুষের ক্ষমতা ভেঙে আনো সমতা"
এই ধরণের লাইন বড় করে লিখলে অনেকে মনে করতে পারে এখানে উদ্দেশ্য ছিল সংঘর্ষ --- সমঝোতা নয়। এধরণের এটিচুড পরিহার করা উচিত ছিল।