পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে বছরে পাঁচ-সাত হাজার কোটি টাকা করে খরচ হবে বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মোহসিনুল করিম।
তিনি বলেছেন, নদীতে ১৬০ কিলোমিটার জায়গা সোজা ড্রেজিং করা হবে পানি রিজার্ভ করার জন্য।
ঐতিহাসিক ১৬ মে ‘ফারাক্কা লংমার্চ দিবস’ উপলক্ষে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের নিয়মিত আয়োজন ‘এডিটরস চয়েস’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে মোহসিনুল করিম এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ফারাক্কা বাঁধ ও সম্ভাব্য পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ ও মতামত তুলে ধরেন তিনি।
বাংলানিউজের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব আলম ও ফকির শওকত।
মোহসিনুল করিম বলেন, নদী হলো একটা জীবন্ত সত্তা এবং এই নদী কিভাবে প্রবাহিত হবে, কোথা দিয়ে প্রবাহিত হবে—এগুলো কিন্তু হাইড্রোলজিক্যাল ট্রেন্ড, গ্র্যাভিটেশনাল পুল, তারপরে মাটির গঠন, ওই জায়গার ভূমির গঠন—এইগুলোর ওপর ভিত্তি করে নদী প্রবাহিত হয়।
ফারাক্কার বাঁধের প্রভাব প্রত্যক্ষ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার বাড়িটাই হলো পদ্মার পাড়ে। পাবনা জেলায়। ওইখানে আমার গ্রামেই প্রায় এক থেকে দেড়শো জেলে পরিবার ছিল। একজনও নাই আর এখন। সবাই চলে গেছে ভারত। ওই দিকে মাছ মারছে। এখানে তো মাছ মারার পানি নাই, কোথায় মারবে? যারা ছিল তারা পেশা পরিবর্তন করে ফেলছে। আর একটা আছে যে, আসলে কী হতো? পলি পড়ত। আমি তো আমার গ্রামে আশেপাশে কোথাও দেখিনি বর্ষা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই কাউকে হাল চাষ করতে। জাস্ট রবিশস্য মাসকলাই অন্যান্য কালাই বুনে দিত এবং ওই মাটিটা আমরা বলি জো আসা, মানে নাঙল চালানোর মতো হইতেই একটা শস্য তুলে ফেলতে পারত মানুষ। আপনি দেখেন, ওইখানে কিন্তু লেবার লাগে না, কিচ্ছু লাগে না। এটা তো আমি নিজে দেখছি।
‘...ফারাক্কার ইফেক্ট আমি আমার গ্রামে দেখছি, এখন মরুভূমির মতন হয়ে যাওয়াতে কী হইছে? এই যে বাতাস আসে, আমার গ্রামের বাড়িঘরের মধ্যে পর্যন্ত এই বালু। আমি মরুভূমিতে ছিলাম প্রায় আড়াই বছর তিন বছর। ওই সময় যেরকম দেখছি যে বাতাস উঠলে গাড়ি বন্ধ করে এমনভাবে থাকতে হয় যে...’
ব্যারেজের পরিকল্পনা অনেক পুরনো উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন যেটা বলছে, এখন পেপারেই তো আসতেছে যে হ্যাঁ, ঠিক আছে টাকা যেটা খরচ করছ এটা কিন্তু ১০ পার্সেন্টও না, এই ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এটা তো একটা বেড়া দেওয়া। কিন্তু এটা ম্যানেজমেন্ট, ওনারা তো চাচ্ছে এই নদীর এখান থেকে ১৬০ কিলোমিটার জায়গা সোজা অনেক ড্রেজিং করবে পানি রিজার্ভ করার জন্য। কিন্তু যখন ওপর থেকে পানি আসবে, তখন তো ওই ড্রেজিংটা ওই অবস্থায় আর থাকবে না। তার মানে মেইনটেনেন্স কস্ট প্রতি বছর যে পরিমাণ লোড হবে, কৃষি দিয়ে সেটা ভরণ মানে পোষাবে কিনা আমি জানি না। কৃষক পর্যায়ে হয়তো...
মোহসিনুল করিম বলেন, পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে পরিকল্পনা শুনেছি, সেখানে পলি ম্যানেজ করার বিষয়ে বলা হয়েছে, যখন ওদের গেট ছেড়ে দেবে ফারাক্কা, এ গেটও ছাড়া থাকবে। আর এই ব্যারেজটা করা হচ্ছে নদীর থেকে অনেক বড় করে। ওই সময় যদি ছেড়ে দেওয়া হয় যে সিল্টটা আসবে ওপর থেকে, সেটা পানির সাথে চলে যাবে। তারপরে আরেকটা জিনিস যেটা সেটা হলো যে, অন্যান্য নদীতে যে পানিগুলো ছাড়া হবে, নদীতে ছাড়ার আগে এটাকে বলে ‘সিল্ট ট্রাপ’। একটা জায়গায় ওটা একটা রিজার্ভারে ওখানে থাকবে, সেডিমেন্টেশন হয়ে ফ্রেশ ওয়াটারটা শুধু ওই সমস্ত নদীতে যাবে। এটা হলো সাইন্টিফিক যে ম্যানেজমেন্টটা, আমরা যে পরিকল্পনাই নিয়ে করি না কেন আসলে বাস্তবতায় যে অনেক কিছুই আসবে যেগুলো এই পরিকল্পনায় তো ধরাই হয় নাই। সেজন্যই বলা হচ্ছে যে এটার ম্যানেজমেন্টে খরচ হবে এর থেকে অনেক অনেক বেশি এবং এটা প্রতি বছরে হবে।
‘ব্যারেজ করার খরচ পাঁচ-ছয় হাজার কোটি করে করে সাত বছরে হবে। তারপরে প্রতি বছরেও ওইরকম পাঁচ হাজার সাত হাজার কোটি করে খরচ করতে হবে, তা না হলে নদীকে জীবিত রাখা যাবে না। শুধু তাই না, এই ব্যারেজের আট-দশ কিলোমিটার দূরেই হলো যমুনা নদী। এই জায়গাটা মরুভূমি হয়ে গেলে ওই নদীর কী হবে?’ প্রশ্ন রাখেন এই বিশেষজ্ঞ।