
খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক পদে ২০১০ সালে সাধারণ কোটায় চাকরির আবেদন করেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেয়েছিলেন মাসুদুর রহমান, শাম্মী আক্তার ও বেগম ফারজানা শাহ। কিন্তু তাঁরা আজ পর্যন্ত সনদ জমা দেননি। একই পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদন করে জাফর ইকবাল, নন্দগোপাল রায়, আব্দুল রহিম হাওলাদারও চাকরি পেয়েছিলেন উপযুক্ত সনদ ছাড়াই। তাঁরাও গত ১৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধার সনদ জমা দিতে পারেননি।
এমনকি এই ছয় কর্মকর্তার চাকরির মূল আবেদনপত্রও খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তাঁরা বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। একইভাবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদে সরকারি চাকরি করছেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত মধ্য ভাটেরচরের বাসিন্দা মৃত রজব আলী দেওয়ানের ছেলে মো. আব্দুল হক। তাঁর তিন সন্তানও ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কোটায় চাকরি করছেন।
এক ছেলে পুলিশে, আরেক ছেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এবং আরেকজন সুপ্রিম কোর্টে চাকরিরত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে উপজেলার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইসংক্রান্ত সভায় আব্দুল হক ও তাঁর তিন সন্তানের বিষয়টি ধরা পড়ে। এ ধরনের অসংখ্য ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি করছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভুয়া সনদে আগে চাকরি দেওয়া হতো। পরে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার চাপে ভুয়া সনদ অনুযায়ী জামুকার সুপারিশের পর গেজেট জারি করত মন্ত্রণালয়। ফলে সেই ভুয়া সনদ পরে প্রকৃত সনদ হয়ে যেত। এ জন্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার প্রয়োজন হতো না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান জনপ্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি করছেন ৮৯ হাজার ২৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নিয়োগ পেয়েছেন আওয়ামী শাসনামলে।
যার বেশির ভাগেরই চাকরি হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ৮৯ হাজার ২৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা জমা পড়েছে। এর মধ্যে অনেকের মুক্তিযোদ্ধার সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষত, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও পুলিশ বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ার সংখ্যা বেশি। নানা জাল-জালিয়াতির অভিযোগও আছে এসব চাকরিজীবীর অনেকের বিরুদ্ধে। গত ১৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ২৯ হাজার ৪৮৫ জন, পুলিশে ২৩ হাজার ৬৩ জন চাকরি পেয়েছেন।
এসব বিষয়ের সত্যতা পাওয়া গেছে জামুকার বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণীতেও। ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত ৭৮তম জামুকার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, দেশের জন্য যুদ্ধ না করেও জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলেন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু। বীর মুক্তিযোদ্ধার সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাগাতে নিজের বাবা জসমতুল্লাহর নাম বদলে মশমতুল্লাহ করেন। ক্ষমতার দাপটে ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি যাচাই-বাছাইকালে আদমদীঘির প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা মজিবরকে বাদ দিয়ে তাঁর লাল মুক্তিবার্তা নম্বর (৩০৬০৯০১২১) ব্যবহার করে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু মুক্তিযোদ্ধা বনে যান। বিষয়টি ধরা পড়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) শুনানিকালে। পরে ২০২২ সালের ১০ মার্চ মজিবর রহমানের (মজনু) ১৮৬৩ নম্বর বেসামরিক গেজেট ও সনদ বাতিল করে মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, সারা দেশে এ ধরনের ৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করে জামুকা। ভুয়া চিহ্নিত হওয়ার পর গেজেট বাতিলের এ ধরনের আরো নজির রয়েছে। এই বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ভুয়া প্রমাণিত হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব ইসরাত চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর-সংস্থা থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৮৯ হাজার ২৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য পেয়েছি। এগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাই চলছে। কারো বিষয়ে অসংগতি পাওয়া গেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফৌজদারি মামলা করা হবে।’ এ পর্যন্ত খুলনার দইজনসহ মোট ১৪ জন স্বেচ্ছায় মুক্তিযোদ্ধার সনদ ‘সারেন্ডার’ করে আবেদন করেছেন বলেও জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব ইসরাত চৌধুরী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভুয়া সনদে চাকরির জনক ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তিনি ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে এক আলোচনাসভায় বলেছিলেন, ‘তোমরা অনেকেই বলো ছাত্রলীগের চাকরির কথা। দেখো, আমার চেয়ে, নেত্রীর চেয়ে অন্য কার দরদ বেশি আছে? আমরা তো জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করি। নেত্রী বলেন, ‘যেভাবেই হোক, আমাদের ছেলেদের একটা ব্যবস্থা করে দাও।’ তোমাদের লিখিত পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। তারপর আমরা দেখব।’
ওই কর্মকর্তাদের একজন জানান, সরকারের শীর্ষমহল থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রার্থীরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরির আবেদন করত। রাজধানীর নীলক্ষেত থেকে সনদ বানিয়ে আবেদনের সঙ্গে জমা দিত। সেটা গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চাপ দেওয়া হতো। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে (জামুকা) বলে দেওয়া হতো আবেদন অনুযায়ী গেজেট জারি করতে। সেভাবে কাজ করত জামুকা। বিশেষ করে ২৮তম বিসিএস থেকে শুরু করে ৩৩তম বিসিএস পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাডারে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যেসব চাকরি হয়েছে তার প্রায় সবই নীলক্ষেতের ভুয়া সনদে নিয়োগ হয়েছে।
এমআইএসের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৯৭ হাজার ৮০০ জন। এর মধ্যে মাসিক ভাতা পান এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৫৪ জন। গত ২০ নভেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) পুনর্গঠন করা হয়।