
মনিরুজ্জামান মনির শিক্ষা অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী । অথচ তাঁর বিলাসী জীবন । বর্তমান কর্মস্থল বাগেরহাট হলেও তাঁর ঘুষের যোগাযোগ ’ খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় । এমপিওভুক্তি , বদলি , গ্রেড পাইয়ে দেওয়া — সব কাজই তিনি করে দেন । এই ঘুষ - দুর্নীতির টাকায় তিনি দুই স্ত্রী , স্বজনের নামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ।
যত সম্পত্তি ঢাকায়
অনুসন্ধান করে জানা গেছে , রাজধানী ঢাকায় মনিরের কেনা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী মোসা . রিমা খাতুন । মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদসংলগ্ন এলাকায় ১ হাজার ৭৮০ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটের দাম কোটি টাকার বেশি । অভিযোগ রয়েছে , রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংকে রিমার নামে রয়েছে লাখ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত ( এফডিআর ) ।
চুয়াডাঙ্গা শিক্ষা অফিস
ঢাকার কালশীতে বহুতল ভবন করছেন মনিরুজ্জামান মনির । খোঁজ নিয়ে জানা গেছে , মাউশির সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এই বাড়িতে বিনিয়োগ করেছেন মনির । নিজেই করেন সবকিছুর তদারকি । অনুসন্ধানের একপর্যায়ে এই প্রতিবেদক ইন্টেরিয়র
মনিরুজ্জামান মনির
ডিজাইনারের ছদ্মবেশে যোগাযোগ করলে বাড়িটিতে মনিরের অংশীদারত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেন আব্বাস নামের কেয়ারটেকার । গুঞ্জন রয়েছে , ছোট স্ত্রী সোনিয়া খাতুনের বোনের মেয়ের নামে ঢাকার ডিওএইচএসে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট একটি কিনেছেন মনিরুজ্জামান মনির ( ৪৫ ) । চুয়াডাঙ্গায় সম্পদের পাহাড় : সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে , চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মুসলিমপাড়ায় হোমিওপ্যাথি কলেজের পাশে ১৬ কাঠা জমির ওপর মনিরের রয়েছে নিজস্ব একটি বাগানবাড়ি । এই বাগানবাড়িতে রাখা আছে একজন কেয়ারটেকার ( তত্ত্বাবধায়ক ) । স্থানীয়রা জানান , জমিসহ এ বাড়ির আনুমানিক মূল্য ৮০ লাখ টাকা । ওই জমির ১০ কাঠার মালিকানা প্রথম স্ত্রীর বাবার নামে । বাকি ৬ কাঠা মনিরের নিজের নামে আছে । এই বাগানবাড়ির দক্ষিণ পাশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আছে আরও দুটি প্লট । তার দামও অর্ধকোটির ওপরে । এই বাগানবাড়ির পূর্ব পাশে খানিকটা দূরে আছে আরেকটি বাড়িসহ প্লট । এই বাড়িসহ জমিরও আনুমানিক মূল্য ৪০ লাখ টাকা । মনিরের ছোট স্ত্রী সোনিয়া খাতুন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে সহকারী হিসাবরক্ষক । চুয়াডাঙ্গা শহরের জোলের ধারে চারতলার বাড়িতে তিনি বসবাস করেন । প্রায় ৭০ লাখ টাকা দামের ওই চারতলা বাড়িটি সোনিয়ার নামে । এই বাড়িটির পশ্চিম পাশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্রায় ১০ কাঠার একটি প্লট আছে । সেখানে তিনি সবজি চাষ করেন । শহরের বেলগাছি মুসলিমপাড়ায় আছে ৫ কাঠার একটি বাগান । এই বাগানে কাঠ ও ফলের গাছ আছে । মুসলিমপাড়া মাজারের পাশেই আছে আরেকটি বাগান । শহরের নীলার মোড়েও রয়েছে ৫০ লক্ষাধিক টাকা মূল্যের জমি । এ ছাড়া নীলার মোড়ের পাশেই দুটি দোকানসহ আরেকটি প্লট আছে । সুমিরদিয়া মাঠে রাস্তার পাশেই রয়েছে ১০ কাঠার একটি বাগান । নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে মুসলিমপাড়া ও নীলার মোড় এলাকার কয়েকজন বলেন , মনির মাঝেমধ্যে সম্পত্তির খোঁজখবর নিতে আসেন ।
দর্শনার পুরোনো বাজারপাড়ায় কাঠা জমির ওপরে দুই ইউনিটের একটি বাড়ি আছে । সেই বাড়ির আনুমানিক মূল্য অর্ধকোটি টাকা । দর্শনা পৌরসভায় ওই বাড়িটির হোল্ডিং নম্বর মনিরুজ্জামান মনিরের নামেই । ‘ কপাল খোলে ’ মাউশিতে : ২০০৫ সালে দর্শনা সরকারি কলেজে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের ( তৃতীয় শ্রেণি ) চাকরি হয় মনিরের । পরে তিনি চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে বদলি হয়ে আসেন । এক - এগারোর সময় সারা দেশে সরকারি চাকরিজীবী সংস্কার হলে তিনি ঢাকা শিক্ষা ভবনে মাউশির প্রধান কার্যালয়ে স্কুল শাখায় বদলি হন । সেখান থেকেই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে । ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন বড় নেটওয়ার্ক । মনির ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীর শিক্ষা ভবনে মাউশির প্রধান কার্যালয়ে স্কুল শাখায় চাকরি করেছেন । তখন বেসরকারি শিক্ষক - কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজ কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা ভবন থেকেই হতো । ২০১৪ সালে তা বিকেন্দ্রীকরণ করে মাউশির ৯ টি অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হয় । মনির সে সময় তাঁর নিজের বিভাগ খুলনা আঞ্চলিক অফিসে পদায়ন নেন । প্রথমে কুষ্টিয়া তারপর খুলনা উপপরিচালকের কার্যালয়ে বদলি হন মনির । খুলনা উপপরিচালকের কার্যালয়ে থাকাকালে মনির খুলনা বিভাগের ১০ জেলার শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি , বদলি ও গ্রেড পাইয়ে দেওয়ার তদবিরে জড়ান বলেও অভিযোগ উঠেছে । দুর্নীতি ঢাকতে নানা কৌশল : অবৈধ আয় লুকাতে মনিরের কৌশলের শেষ নেই । সরোজগঞ্জে বাড়ি , দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় থাকেন বিদেশে । তিনি টাকা পাঠান মনিরের অ্যাকাউন্টে । নির্ধারিত দিনে আত্মীয়ের বাড়ির লোকজন টাকা তুলে নেন । আর মনির তদন্তে দেখান স্বজনের রেমিট্যান্সের আয় । নিজে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে স্বজনদের নামেও কিনেছেন সম্পত্তি । গোপনে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে । বর্তমানে এই মনির বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিসে হিসাবরক্ষক কাম ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত । প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার দুপুরেই বের হয়ে যান অফিস থেকে । সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে আসেন চুয়াডাঙ্গা শহরে । এরপর চলে তাঁর লেনদেনের দেখা - সাক্ষাৎ । রাত ৯ টার পর বাগানবাড়িতে বসে ‘ মদের আসর ' । একা নন , ঘুষে সহযোগিতাকারীরাও থাকেন এই ফুর্তিতে — জানান এলাকার কয়েকজন । বাগেরহাটে যাওয়ার আগে মনির ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ( মাউশি ) অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালকের কার্যালয়ে । মনিরের পদ উচ্চমান সহকারী হলেও ক্যাশিয়ারগিরি তাঁর অত্যন্ত পছন্দের । কর্মস্থলে তিনি রীতিমতো ‘ ঘুষযন্ত্র ’ । ‘ তাঁর বাঁ হাতে টাকা উঠলে ডান হাত নিমেষেই কাজ করে’- মন্তব্য একজন শিক্ষকের । আবার মনিরকে টাকা দিলেও কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন শিক্ষক ।
দুদকের জালে মনির : খুলনায় চাকরিকালে সপ্তাহের ছুটির দিন মনির বিভিন্ন জেলায় ঘুষ কালেকশনে বের হতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে । শিক্ষকদের বিভিন্ন কাজ কৌশলে আটকে রেখে তিনি ঘুষ দাবি করতেন । সে সময় বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী শিক্ষক মনিরের বিরুদ্ধে মাউশি ও দুদকে অভিযোগ করেছিলেন । এই খুলনা অফিসে থাকাকালেই মনিরের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে মাউশি । আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সেই অভিযোগটিও খালাস করতে চেয়েছিলেন , তবে তিনি ব্যর্থ হন । বিষয়টি যায় দুদকের নজরে । দুদক এখনো তদন্ত কার্যক্রম চালু রেখেছে বলে জানা গেছে । মাউশির খুলনা অঞ্চলের তৎকালীন উপপরিচালক এস এম আবদুল খালেক বলেন , ‘ মনিরের কোথায় কী সম্পদ আছে , তা জানি না । মনির এতই ক্ষমতাবান , খুলনায় থাকাকালে সে আমাকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত ।' মনিরের বর্তমান কর্মস্থল বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিসের প্রধান তথা জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান বলেন , ‘ আমি শুনেছি মনিরের বিরুদ্ধে দুদকে একটি তদন্ত চলছে । তবে সেটার অগ্রগতির বিষয়ে জানি না । আমার এখানে আসার পর আমি নজরে রেখেছি । এখানে কোনো বাজে কাজ করার সুযোগ নেই । তবে বাড়ি দূরে হওয়ায় সপ্তাহে বৃহস্পতিবার একটু আগে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় । ’ এ বিষয়ে মনিরুজ্জামান মনিরের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি । তবে মনিরের দ্বিতীয় স্ত্রী সোনিয়া খাতুন বলেন , ‘ আমি মেয়েমানুষ , এত কিছু জানি না । আর জানার চেষ্টাও করিনি । আমার স্বামীর নামে কোথায় কোথায় সম্পত্তি আছে , আমি জানি না । আপনারা সাংবাদিক , ভালো করে খোঁজ নিয়ে বের করেন । '