Image description
শ্রেণিকক্ষ সংকটে শতাধিক স্কুল-কলেজ। বিল তুলে পলাতক ১৫০ ঠিকাদার।

শ্রেণিকক্ষ সংকটে দেশের শতাধিক স্কুল-কলেজে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন প্রায় ১৫০ জন ঠিকাদার গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। সূত্র মতে, দেড় বছরের কাজ তারা ছয় বছরেও শেষ করতে পারেননি। অথচ তাদের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশে তুলে নিয়েছেন বিলের সমুদয় টাকা। পলাতক এসব ঠিকাদারের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার এবং আসবাব সরবরাহ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, অনিয়মের দায়ে গত ২০ নভেম্বর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তিন জন প্রকৌশলীকে ওএসডি করেছে মন্ত্রণালয়। তারা হলেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) মো. রায়হান বাদশা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আফরোজা বেগম ও সমীর কুমার রজক দাস।

ঐ কর্মকর্তা বলেন, কাজ শেষ না করে বিল তুলে নেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলতাফ হোসেনের সঙ্গে গতকাল যোগাযোগ করা হলে, বিষয়বস্তু শোনার পর তিনি বলেন, ‘আমি ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।’

তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ ঠিকাদাররা অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে যখন যে দায়িত্বে থাকেন, তাদের নানাভাবে ম্যানেজ করে ফেলেন। গত ১৬ বছর এসব ঠিকাদার শাস্তির আওতায় আসেনি। অতীতে তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লে অধিদপ্তর থেকে ঠিকাদারদের কাছে শুধু চিঠি দিয়ে দায়সারা দায়িত্ব পালন করা হয়েছে।’

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রসময় মেমোরিয়াল উচ্চ স্কুলের ছয় তলা ভবন নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)। ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবনটি কার্যাদেশ দেওয়ার দেড় বছর পর কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ কার্যাদেশ পাওয়ার চার বছর পর ৫০ ভাগ কাজও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইহসাক অ্যান্ড সন্স তুলে নিয়ে গেছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ঠিকাদারও পলাতক। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বড় বড় ক্লাসগুলোর মধ্যে আমরা পার্টিশন দিয়ে ক্লাস চালাচ্ছি। এখনো আমরা ভবন পাইনি। জানি না কবে কাজ শেষ হবে।’

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার শান্তিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ শ্রেণিকক্ষবিশিষ্ট পুরোনো পাকা ভবন ভেঙে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। দরপত্রের শর্তানুযায়ী কার্যাদেশ পাওয়ার ৫৪৬ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ ছয় বছর পরও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখানে ৪০০ শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য ১৫টি শ্রেণিকক্ষ থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র চারটি। শ্রেণিকক্ষ সংকটে বেশি বিপাকে পড়েছে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। বিভাগভিত্তিক পাঠদান করাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা।

একই অবস্থা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ফাজিল মাদ্রাসা ভবনের। চার তলা ভবনের তিন তলার ছাদ ঢালাই শেষে পালিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঠিকাদারকে অনেক অনুরোধ করে তিন তলার ছাদ পর্যন্ত করেছিলাম। বাকি কাজ না হওয়ায় ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে।’

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় আতাহারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়েও ঘটেছে একই ঘটনা। বিদ্যালয়টির চার তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো ৩০ শতাংশ কাজ বাকি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসই-এই (জেভি) ইইডির সিলেট অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তা বরাদ্দের ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকার মধ্যে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা তুলে নিয়ে গেছে, যা কাজ করেছে তার থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা বেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তুলে নিয়ে গেছে বলে এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সিলেট জেলার এই রকম অন্তত ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ না করেই গত ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ১৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন ঠিকাদাররা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তাদের অধিকাংশ পলাতক রয়েছেন।

গত পাঁচ বছরে সিলেটে যে নির্মাণকাজ হয়েছে তার অধিকাংশই নিম্নমানের বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সম্প্রতি সিলেট জেলার নির্মাণাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।