
ঈদের দিন রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে দুই ভাইকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, চোর সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনি দেওয়ার বিষয়ে জানতে বিকালে কুড়াইতলী এলাকায় যান রাকিব-সাকিবসহ কয়েকজন। এ সময় তারা এক অটোরিকশাচালককে মারধর করে ফিরে আসেন। সন্ধ্যার দিকে আবার ৩০-৩৫ জন যুবকসহ রাকিব-সাকিব ওই এলাকায় গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। একপর্যায়ে তাদের আটক করে পিটুনি দেওয়া হয়। পাশাপাশি রাকিব ও সাকিবকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে সাকিব মারা যান।
অন্যদিকে গত ২১ মার্চ ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছিনতাইকালে স্থানীয় জনতার ধাওয়ায় বুড়িগঙ্গা নদী সাঁতরে পালানোর সময় চকবাজার এলাকায় গণধোলাইয়ে একজন নিহত হন। এর আগে ১৮ মার্চ রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগে এক কিশোরকে গণপিটুনি দিয়ে আহত করেন স্থানীয়রা। পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় খিলক্ষেত বাজারে শতাধিক লোক পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। এতে সাত পুলিশ সদস্যও আহত হন।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে ১৮টি। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯টিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৫৭টি। মার্চে এ ঘটনা ঘটে ১৩২টি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দেশে ধর্ষণ ও গণপিটুনি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
এমএসএফ’র হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৪) আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছেন।
আরেক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে গণপিটুনিতে সর্বোচ্চ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৪৬ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিনগুণ। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।
সেই সঙ্গে বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যাও। ফেব্রুয়ারিতে ৪৬টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছিল। মার্চে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৯টি। মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পুলিশ কার্যকর ভূমিকা না রাখায় এই ধরনের ঘটনা বেড়েছে।
মানধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেলিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স কিংবা গণপিটুনির মতো ঘটনা যখন চলে এর মূল কারণ দুটি। প্রথমত ও প্রধানত কারণ হলো অপরাধ নির্ণয় ও নিরূপণ করতে দক্ষতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, অপরাধ হয়ে যাওয়ার পর বিচারালয় অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রদান করতে পারছেন না। তবে মনে রাখা দরকার, দেশে একটি অণঅভ্যুত্থান হয়েছে এবং অণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। যেকোনও অণঅভ্যুত্থান সব সময় আইনের বরখেলাপ করেই হয়ে থাকে। আইনের বরখেলাপ করে গণঅভ্যুত্থান হওয়ার পর রাষ্ট্রকে তখন বিনির্মাণ এবং গণঅভ্যুত্থানকে পুনর্গঠন ও পরিগঠন করতে হয়। যদি এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বিনির্মাণ, পুনর্গঠন ও পরিগঠন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে গণঅভ্যুত্থানও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণ, পুনর্গঠন ও পরিগঠন অনেকাংশে হয়নি, এই ব্যর্থতা আসলে বাংলাদেশ সরকারের ক্ষমতাসীনদের। সেই ব্যর্থতার কারণে এই ধরনের মব ভায়োলেন্স কিংবা গণপিটুনির ঘটনাগুলো বাড়ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি অপরাধের আইনি প্রতিকার থাকে। অপরাধ দমন করার জন্য বাংলাদেশে যে আইনি কাঠামো আছে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের ভূমিকা এখানে বেশি। যেহেতু বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ চালাচ্ছে, সেহেতু এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রেক্ষাপট কাজ করতে পারে। রাজনৈতিক একটা প্রভাব থাকতে পারে, যার উদ্দেশ্য হয়তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই এখনও নিয়মিত কাজে ফেরেনি। আমাদের দেশে এমনিতেই তাদের জনবল কম, ৫ আগস্টের পর সেই সংখ্যা আরও কমেছে। অপরাধের বিরুদ্ধে তারা কতটুকু ব্যবস্থা নিতে পারছে সেটি নিয়েও এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ সব সময়ে হয়ে থাকে, হচ্ছে। কখনও প্রচার কম হয়েছে, আবার এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেক। ফলে সবকিছু প্রচার করতে পারছে। অপরাধ আমাদের সমাজের ভেতরে ছিল, হয়তো সব ঘটনা আমরা জানতাম না। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমাদের বিচার বিভাগে বিচারকের স্বল্পতা। আমাদের পেন্ডিং (ঝুলন্ত) মামলা অনেক। সেগুলোর দ্রুত নিরসনের জন্য যে পরিমাণ বিচারক দরকার সে তুলনায় অনেক কম। বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো এবং বিচারক নিয়োগ করা না হলে শুধু পুলিশ দিয়ে এগুলো সামলানো যাবে না। জনবল না বাড়ালে এই ধরনের মামলা আরও বাড়তে থাকবে। যারা অপরাধী তারা মনে করে অপরাধ করার পর জামিন নিয়ে বেরিয়ে যাবে, মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকবে। আইনের সাজা এড়ানোর এক ধরনের সুযোগ পায় অপরাধীরা, তাতে অপরাধের প্রতি উৎসাহ বাড়ে অনেক ক্ষেত্রে। সুতরাং বিচারিক ব্যবস্থাকে এখানে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য সরকারের উচিত বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, মামলার জট কমানো। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে পুরোদমে কাজ করতে পারে সেটি নিশ্চিত করা দরকার। অপরাধ করলে সাজা হবে– এটি যদি মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করা না যায় তাহলে কিন্তু অপরাধের হার বাড়তে থাকবে।’