Image description
 
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের সময়ে এক লোক তাকে রাস্তায় প্রকাশ্যে গালি দেয়। পুলিশ ধরে নিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়। কোর্ট তাকে ফাসির আদেশ দেয় এবং তার পরনের কাপড়সহ তার যাবতীয় সহায় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রায় দেয়। ভদ্রলোক হাইকোর্টে আপিল করলে তার ফাসির আদেশ মওকুফ হয়, তবে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ বহাল রাখে এবং যথারীতি সব সম্পদ ক্রোক করে তাকে ন্যাংটা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মজার ব্যাপার হলো, লোকটাকে ন্যাংটা করে ছেড়ে দেওয়ার পর মুক্তির আনন্দে সে শ্লোগান দেওয়া শুরু করে "ন্যায়বিচার জিন্দাবাদ"।
মানুষ যখন দীর্ঘদিন তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে তখন আসলে সে ভুলেই যায় ন্যায়বিচার কী। কেউ সামান্য কিছু দিতে চেষ্টা করলেই তাকে বিরাট করুণা ভাবে। সমাজ থেকে যখন নেক কাজ উঠে যায় তখন কেউ ফরজ আদায় করলেই যেমন তাকে আল্লাহওয়ালা ভাবে।
ইসলামী শাসন ও ন্যায়পরায়ণ শাসক না দেখতে দেখতে আমরা আজ সামান্যতম ন্যায্যতার আশা কোথাও দেখতে পেলে যেন ধন্য হয়ে যাই।
.....
গিভেন দ্য এক্সাম্পলস এবভ, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ক্ষমতা গ্রহণ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কারণ, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসক হিসেবে তিনি ব্যপকভাবে পরিচিত।
কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে যেকোনো শাসনকেই প্রথমত ইসলামী মূল্যবোধ ও আদর্শের আলোকে বিশ্লেষণ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমান কেবলমাত্র বৈষয়িক উন্নতির সুযোগ তৈরি কিংবা ব্যক্তিগত সততা ও দক্ষতার কারণে কোনো নেতাকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে পারে না।
আর হ্যাঁ, শাসনামল মুল্যায়নের পদ্ধতির ক্ষেত্রে আমরা যদি শুধু ইউনুসের শাসনকে ইসলামের নীতিতে বিচার করে তাকে তুলোধোনা করি সেটা ভুল হবে। কারণ অন্য যারা শাসন করতেন বা করতে পারতেন তারাও তো আর আমাদের ইসলামি শাসন এনে দিতেন না; সকলের শাসনই তো অনৈসলামিক শাসনই ছিলো বা হত। অতএব ইউনুসের শাসনামল ভালো না মন্দ সে বিচার হবে অন্যান্য শাসকদের সাথে তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার তুলনামূলক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে; ইসলামের মানদণ্ডে পর্যালোচনার মাধ্যমে নয়।
.....
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু শাসক এসেছেন ও গেছেন, কিন্তু খুব কম সংখ্যক নেতা আছেন যারা দক্ষতা, সততা এবং দেশের জনগণের ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনুস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
বাংলাদেশের অধিকাংশ শাসক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রশাসন ও বৃটিশদের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন। আন্তরিকতা সত্ত্বেও দূর্নীতি কমাতে পারেননি এবং কাঠামোগত মৌলিক কোনো সংস্কার করতে পারেননি।
এই দিক থেকেও ড. ইউনুস একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় এসেছেন। তাই তার নেতৃত্বে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রশাসনে দুর্নীতি কমার একটা সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়।
.....
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো সরকারকেই তেমন বাড়তি কিছু করতে হবে না। সরকার যদি কেবল শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো করে দিতে পারে; যদি দূর্নীতি, মাস্তানী, চাঁদাবাজি রুখতে পারে, জাস্ট ফেয়ার এন্ড প্লেইন একটা ফিল্ড প্রোভাইড করতে পারে সবার জন্য, তাহলে বাকিটা দেশের জনগণই করে নিতে পারবে। অন্য যে কোনো শাসকের চেয়ে ইউনুসের কাছ থেকে এইনপ্রত্যাশা একটু বেশি করাই যায়।
দলীয় শাসকদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণ খোদ কেন্দ্রীয় শাসকরা অতটা নয়, যতটা তার দলের নেতাকর্মী ও চ্যালাচামুণ্ডারা। ট্রেডিশনাল এসব পলিটিকাল পার্টির পক্ষে টিপিক্যাল এসব দূর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ দলগুলো তৃণমূল পর্যায়ে এসব চাঁদাবাজ ও দূর্নীতিবাজ স্থানীয় নেতাদের ওপর নির্ভরশীল। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক সময় আন্তরিক হলেও তার দলের এই কাঠামোগত অবক্ষয় তাকে এই লক্ষ্য অর্জন করতে দেয় না। এক্ষেত্রে তারা আন্তরিক হলেও অসহায়।
এক্ষেত্রে ইউনুসের জন্য বেশ ভালো একটা সুবিধা রয়েছে। তার জন্য দলীয় মাস্তান পোষার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ ইউনুসের ক্ষমতা তাদের পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং জুলাই শহীদদের রক্ত আর জনতার ব্যাপক সমর্থনই তার ম্যান্ডেট।
আমরা যদিও জানি যে ইসলাম ছাড়া যত ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে আল্টিমেটলি মানুষের মুক্তির সনদ নেই। তবুও দেখেছি ড. ইউনুস প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে কিছু বাস্তবমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, যা অতীতের সরকারগুলোর চেয়ে কিছুটা বেশি কার্যকর হতে পারে। যদিও এগুলো সবই বস্তুত মন্দের ভালো।
পাশাপাশি ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী রফতানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর আকর্ষণ বাড়াতে পারেন। এক্ষেত্রে তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে ।
....
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি-উপাসনা ও দলীয় আনুগত্য একটি বড় সমস্যা। জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার শাসনামলে একদলীয় প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। কিন্তু ড. ইউনুস সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা না হওয়ায় তার পক্ষে যেকোনো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দেশ ও জাতির কল্যানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বেশি। তার প্রশাসন তুলনামূলক দলীয় পক্ষপাতহীন থেকে দেশ পরিচালনা করতে পারে বলে আশা করা যায়।
....
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শাসক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তেমন সফল হতে পারেননি। জিয়াউর রহমান এক্ষেত্রে কিছুটা সফল হলেও তিনি বেশিদিন সুযোগ পাননি। এরশাদ সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও আন্তর্জাতিকভাবে সেভাবে স্বীকৃতি পাননি। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করলেও বৈশ্বিক পরিসরে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। কিন্তু ড. ইউনুস আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বব্যাপি তার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে।
গ্লোবাল স্কেলের বিভিন্ন কর্পোরেশনের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় তুলনামূলক ভালো করতে পারেন। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা হিসেবে নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে তা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।
....
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ইউনুস সরকারের অবস্থান অন্য সকল সরকারের মতোই। মৌলিকভাবে এটা অনৈসলামিক সেক্যুলার শাসন। এটা আলাদা করে বলার কিছু নেই। সেক্যুলারদের মধ্যে ইসলামের দৃষ্টিতে তুলনামূলক কে কতটা ভালো বা মন্দ তার বিচার হবে কে কতটা ইসলামবিদ্বেষী, মুসলিম তাহজিব তামাদ্দুনের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন, মুসলিমদের প্রতি কে কতটা দমনপীড়নমূলক আচরণ করে তার উপর।
ইউনুস সরকার মাত্রই ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। আমরা তার সরকারকে পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আমরা তাকে কতটুকু সমর্থন দেবো সেটা তাদের আচরণের ওপরই নির্ভর করবে।
প্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক সংস্কারগুলো হয়ে গেলে এরপর রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো তেমন বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারবে না; কিংবা এই মৌলিক সংস্কার রাজনীতিতেও একটা গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, গতানুগতিক রাজনীতি ও বিগত প্রায় ২ দশকের স্বৈরাচারী শাসন দেশকে যে খাঁদে ফেলেছে সেখান থেকে এনে একে লাইনে তুলতে এবং এই মৌলিক সংস্কারগুলো করতে অন্তত আরও বেশ খানিকটা সময় প্রয়োজন। এই কাজগুলো সমাপ্ত করার জন্য ইউনুস সরকারকে পর্যাপ্ত দেওয়া দরকার। কত সময়ই তো আমাদের নষ্ট হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমরা এমন কী অর্জন করেছি? এক ফ্যাসিনাই তো ১৬ বছর খেয়ে দিলো, সেখানে ২০ কোটি মানুষের জাতীয় জীবনে এমন আমূল পরিবর্তনের জন্য কিছু বাড়তি সময় আসলে তেমন কিছুই না। লুটেরা রাজনীতির চাপে জাতি যদি এই সময়টা দিতে ভুল করে তবে এর খেসারত তাকে আজীবন দিতে হবে।
আশঙ্কা:
একজন মুসলিম হিসেবে আশংকার যে জায়গাটা সবচেয়ে ভয়ংকর বলে অনুভব করি সেটা হলো অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তিনি ৯০% মুসলমানের একটি রক্ষণশীল দেশকে অতিমাত্রায় পশ্চিমিকরণ করে ফেলার দিকে যেতে পারেন। তিনি এনজিও পরিচালনা করে এসেছেন। এই সেক্টরের লোকেরা তার সরকারে প্রভাবশালী। এই সুযোগ নিয়ে এনজিওরা সংস্কারের নামে যদি ইসলামবিরোধী, মুসলিম সৃংস্কৃতি বিরোধী এজেন্ডাগুলো সরকারি নীতিতে ঢুকিয়ে দিয়ে যায় তাহলে সেটা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি যদি ভুল করেন তবে তাকে তার খেসারত দিতে হবে। এদেশের মুসলমানরা ধার্মিক। দেশের জনসংখ্যার ৯০% এর বেশি মুসলমান। ইসলামী মুল্যবোধকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ডমিনেন্ট রেখেও যে বৈষয়িক উন্নতি করা যায়, বরং আরও ভালোভাবে করা যায় তার বেশ ভালো উদাহরণই রয়েছে। তিনি যদি সে উদাহরণ অনুসরণ না করে একটি রক্ষণশীল মুসলিম দেশে পশ্চিমা নোংরা সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে সুযোগ করে দেন তাহলে এই সমাজের সামাজিক বুনন নষ্ট হয়ে যাবে এবং এটা তার সকল অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে এবং তাকেও হাসিনার মতো ঘুণিত হয়ে বিদায় নেওয়া লাগতে পারে।